ঢাকার মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর চার দিন পেরিয়ে গেলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ময়নাতদন্ত না হওয়ায় ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা
গত ২৭ মে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘটে। ঘটনার পর নানা ধরনের আলোচনা সামনে এলেও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা যায়নি। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
প্রাথমিকভাবে ওয়ার্ডটিকে একটি বদ্ধ পরিবেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে সেখানে কোনো গ্যাস, বায়ু চলাচলের সমস্যা বা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল কি না, তা নির্ধারণে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ময়নাতদন্ত না হওয়াই বড় বাধা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন অস্বাভাবিক ও একযোগে মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান পদ্ধতি। কিন্তু নবজাতকদের পরিবার ময়নাতদন্তে সম্মতি না দেওয়ায় তদন্তকারীরা সেই সুযোগ পাননি।
ফলে এখন তদন্ত অনেকাংশে পরিবেশগত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং অন্যান্য পরোক্ষ প্রমাণের ওপর নির্ভর করছে। চিকিৎসকদের মতে, এতে ঘটনার সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এসি বন্ধের ব্যাখ্যায় প্রশ্ন

ঘটনার পর একটি ধারণা সামনে আসে যে, ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। তবে নবজাতক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র এসি বন্ধ থাকার কারণে একসঙ্গে ছয়টি সুস্থ নবজাতকের মৃত্যু হওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না।
তাদের মতে, অন্য কোনো গ্যাস, বায়ুচলাচলজনিত সমস্যা বা পরিবেশগত কারণ ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গন্ধের উৎস এখনো অজানা
তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট ইউনিট ওয়ার্ডের বায়ুর নমুনা পরীক্ষা করেছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কোনো গ্যাস বা রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
তবে ওয়ার্ডে একটি তীব্র গন্ধ ছিল বলে বিভিন্ন পক্ষ দাবি করেছে। তদন্তকারীরাও গন্ধের বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন, কিন্তু এর উৎস এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালকে জরিমানা
ঘটনার মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত তিন লাখ টাকা জরিমানা করেছে। যৌথ অভিযানে এই জরিমানা করা হয়।
স্বজনদের আহাজারি, জবাবদিহির দাবি
ঘটনায় সন্তান হারানো পরিবারগুলোর শোক এখনো কাটেনি। বিশেষ করে যমজ সন্তান হারানো এক মা দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, ঘটনার রাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়নি এবং ওয়ার্ডে অসহনীয় গরম ও অস্বাভাবিক গন্ধ ছিল।

তিনি বলেন, তার সন্তানরা ঘটনার আগে পুরোপুরি সুস্থ ছিল। যদি কোনো অবহেলা থেকে থাকে, তবে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে না হয়।
এদিকে তদন্ত কমিটি আরও কিছু সময় নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। সেই প্রতিবেদনেই হয়তো মিলতে পারে ঢাকার সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এই রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনার উত্তর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















