মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের তীব্রতার কারণে বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত কয়েক দিনে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং লক্ষাধিক যাত্রী বিমানবন্দর ও হোটেলে আটকা পড়েছেন। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হওয়ায় অধিকাংশ আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনস মধ্যপ্রাচ্যগামী এবং সেখান থেকে পরিচালিত ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটা পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে তিন হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং প্রায় আঠারো হাজার ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে।
এদিকে কিছু বিমান সংস্থা সীমিত পরিসরে আবারও ফ্লাইট চালু করার চেষ্টা শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় বিমান সংস্থা এমিরেটস সোমবার থেকে অল্পসংখ্যক ফ্লাইট চালু করেছে। ভারতের ইন্ডিগোও মঙ্গলবার জেদ্দা থেকে চারটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট বাতিল করা এয়ারলাইনস
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েকটি বড় বিমান সংস্থা। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে এমিরেটস, যার সংখ্যা প্রায় ৪৯০টি। এরপর রয়েছে কাতার এয়ারওয়েজ, তাদের ৪২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফ্লাইদুবাই ৩৪৫টি ফ্লাইট বাতিল করেছে।
এছাড়া এতিহাদ এয়ারওয়েজের ১৯৩টি, গালফ এয়ারের ১৩৬টি এবং ভারতের ইন্ডিগোর ১৩৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ইসরায়েলের এল আল ৯৩টি, স্পিরিট এয়ারলাইন্স ৬০টি, রয়্যাল জর্ডানিয়ান ৪৯টি এবং সৌদিয়া ৪৭টি ফ্লাইট বাতিল করেছে।
সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট বাতিল হওয়া বিমানবন্দর
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। মঙ্গলবার পর্যন্ত এই বিমানবন্দর থেকে ছাড়ার কথা ছিল এমন ৫৭১টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। একই সময়ে সেখানে অবতরণের কথা ছিল এমন আরও ৫৪২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেও ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এই বিমানবন্দর থেকে ২৭৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে এবং সেখানে অবতরণের কথা ছিল এমন আরও ২১৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
এছাড়া আবুধাবি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
![]()
ইন্ডিগোর সীমিত ফ্লাইট পরিচালনা
ইন্ডিগো জানিয়েছে, সৌদি আরব ও ভারতের মধ্যে ধীরে ধীরে ফ্লাইট পরিষেবা স্বাভাবিক করার অংশ হিসেবে ৩ মার্চ জেদ্দা থেকে মুম্বাই, হায়দরাবাদ ও আহমেদাবাদে চারটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ফ্লাইট মূলত সেই যাত্রীদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে, যারা আগে থেকেই টিকিট কেটেছিলেন কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ভ্রমণ করতে পারেননি।
বিমান সংস্থাটি যাত্রীদের প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য তাদের যোগাযোগ কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে। পাশাপাশি যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ধীরে ধীরে পরিষেবা পুনরায় চালু করা হবে।
আকাসা এয়ারের আংশিক পরিষেবা
আকাসা এয়ারও মঙ্গলবার থেকে জেদ্দাগামী এবং জেদ্দা থেকে ফেরত কিছু নির্বাচিত ফ্লাইট চালু করেছে।
৩ মার্চ মুম্বাই থেকে জেদ্দা এবং জেদ্দা থেকে মুম্বাইয়ের ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে। ৪ মার্চ মুম্বাই-জেদ্দা ও জেদ্দা-মুম্বাই ফ্লাইটের পাশাপাশি আহমেদাবাদ থেকে জেদ্দা এবং জেদ্দা থেকে আহমেদাবাদ ফ্লাইটও নির্ধারিত রয়েছে।
তবে বিমান সংস্থাটি জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এসব ফ্লাইট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে আবুধাবি, দোহা, কুয়েত এবং রিয়াদগামী ফ্লাইট আপাতত ৪ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।
যাত্রীদের ভ্রমণের আগে অনলাইনে ফ্লাইটের অবস্থা যাচাই করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এয়ার ইন্ডিয়ার সিদ্ধান্ত
এয়ার ইন্ডিয়া মধ্যপ্রাচ্যগামী সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যের গন্তব্যে তাদের নির্ধারিত ফ্লাইট চালু রয়েছে।
বিমান সংস্থাটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইট স্থগিত থাকার কারণে যেসব যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন তাদের জন্য বিকল্প ভ্রমণ ব্যবস্থা, পূর্ণ অর্থ ফেরত অথবা বিনামূল্যে নতুন সময় নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হবে।
যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা তাদের ওয়েবসাইটে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছে এয়ার ইন্ডিয়া।
স্পাইসজেটের বাতিল ফ্লাইট
স্পাইসজেটও ৩ মার্চ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া ও সেখান থেকে আসা কয়েকটি ফ্লাইট বাতিলের তালিকা প্রকাশ করেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















