ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলা সামরিক অভিযান নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে—তাইওয়ানকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কি দ্রুত কমে যাচ্ছে? বিশ্লেষকদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর বড় চাপ পড়তে পারে, যা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও মার্কিন সামরিক সম্পদের চাপ
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বাওয়ারগ্রুপএশিয়া এক বিশ্লেষণে সতর্ক করে বলেছে, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সম্পদ ও শিল্প উৎপাদনকে অন্যদিকে সরিয়ে দিতে পারে। এর ফলে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফেরানোর পরিকল্পনা বিলম্বিত হতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দীর্ঘ যুদ্ধ চললে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিরোধমূলক সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর আঘাত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল ও অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংসে অভিযান চালাতে হয়েছে।
থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২,৬০০টি গোলাবারুদ ব্যবহার করে প্রায় ২,০০০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।

চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি
এদিকে চীনও তার সামরিক শক্তি বাড়াতে অব্যাহতভাবে বিনিয়োগ করছে। বেইজিংয়ে চলমান জাতীয় গণকংগ্রেসে চীনের সামরিক বাজেট আরও ৭ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বহুদিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে সেটি দখল করার কথাও প্রকাশ্যে বলেছে। যদিও তাইওয়ানের সরকার ও অধিকাংশ জনগণ সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
মার্কিন মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা
টোকিওভিত্তিক সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের কৌশল ও প্রতিরোধ কর্মসূচির পরিচালক কাতসুয়া ইয়ামামতো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে চলমান সামরিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে।
তার মতে, ভারত মহাসাগরে মোতায়েন থাকা অনেক মার্কিন সামরিক ইউনিট ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের অধীন, যা তাইওয়ান সংকট দেখা দিলে মূল ভূমিকা পালন করবে।
জাপানের সামুদ্রিক আত্মরক্ষা বাহিনীর সাবেক রিয়ার অ্যাডমিরাল ইয়ামামতো সতর্ক করে বলেন, যদি এই অভিযান দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তবে ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডসহ পুরো মার্কিন সামরিক বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে যেতে পারে। তাই দ্রুত নতুন উৎপাদন বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠবে।
মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবি মার্কিন সিনেটে এক শুনানিতে এই উদ্বেগকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করতে কাজ করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রভাণ্ডার এই অভিযান দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, তীব্র সামরিক অভিযান চলতে থাকলে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদন ও সরবরাহে বিলম্ব ঘটতে পারে।

তাইওয়ানের অস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব
তাইওয়ানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্ডার করা অস্ত্রের একটি বড় তালিকা ইতিমধ্যে জমে রয়েছে, যার মূল্য ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মূলত মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে এই বিলম্ব হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত থাকলেও অস্ত্র সরবরাহের সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তাইওয়ানের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে জ্বালানি ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ওপর চাপও বাড়বে—যা তাইওয়ানের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
তাইওয়ানের রাজনীতিতে প্রভাব
এই পরিস্থিতি তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব তাইওয়ানের রাজনীতিতে একটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের প্রস্তাবিত ৪০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিরোধী দলগুলো। লাইয়ের ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি তাইওয়ানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিলেও বিরোধী কুওমিনতাং দল সাধারণত চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেয়।
একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, তাইওয়ানের কিছু রাজনীতিবিদ যুক্তি দিচ্ছেন—যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র সরবরাহের দীর্ঘ তালিকা আগেই জমে আছে, তখন নতুন করে বেশি অর্থ খরচ করার প্রয়োজন কী?
তাইওয়ানের সরকারি অবস্থান
তাইওয়ান সরকার প্রকাশ্যে ইরান সংকট নিয়ে খুব সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের নির্বিচার হামলার নিন্দা করেছে এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী চো জুং-তাই জানিয়েছেন, সরকার জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা চালু করেছে এবং কাতার উৎপাদন বন্ধ করার পরও মার্চ মাসের জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির আইনপ্রণেতা চেন কুয়ান-তিং বলেন, তাদের আশা পরিস্থিতি সীমিত থাকবে যাতে এশিয়ার নিরাপত্তা সম্পদ অন্যদিকে সরে না যায়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাইওয়ানকেও নিজস্ব প্রস্তুতি বাড়াতে হবে, বিশেষ করে গোলাবারুদের মজুত বাড়াতে হবে।
মিত্রদের জন্য বড় শিক্ষা
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট যুক্তরাষ্ট্রের এশীয় মিত্রদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে—নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এখন অপরিহার্য।
কাতসুয়া ইয়ামামতো বলেন, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোকে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদন বাড়াতে হবে। এতে জোটের সামগ্রিক প্রতিরোধ শক্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ফিলিপ শেটলার-জোনসও একই মত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত সীমিত এবং দ্রুত প্রতিস্থাপন করা কঠিন।
ফলে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো মিত্র দেশগুলো এখন ক্রমেই নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে নতুন অনিশ্চয়তা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্চের শেষ দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের জন্য বেইজিং সফর করতে পারেন। তার আগে তাইওয়ানের জন্য নতুন একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদনও নাকি স্থগিত রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিরোধ সক্ষমতা কতটা প্রভাবিত হয়েছে, সেটি তখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস করতে পারে, তাহলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেটিই ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশ্লেষকদের মতে, এটি এখন সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
Sarakhon Report 



















