তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সাবেক ইস্তাম্বুল মেয়র একরেম ইমামওলুর বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিচার ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকার বলছে এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ, কিন্তু বিরোধীরা দাবি করছে—এটি আসলে একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্বাচনের আগে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা।
ইস্তাম্বুলে সোমবার শুরু হওয়া এই বিচারকে ঘিরে দেশটির রাজনীতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
এরদোয়ানের ইঙ্গিতপূর্ণ সতর্কবার্তা
গত বছরের শুরুতে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশে রহস্যময় সতর্কবার্তা দেন। তিনি দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এক বিরোধী নেতার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “থলেতে আরও বড় মুলা আছে।” তুর্কি ভাষায় ব্যবহৃত এই প্রবাদটির অর্থ—এর চেয়েও বড় ঘটনা সামনে আসতে পারে।
এর কিছুদিন পরই ইস্তাম্বুলের তৎকালীন মেয়র একরেম ইমামওলুকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তদন্তের অংশ হিসেবে বিরোধী দলের শতাধিক কর্মকর্তা ও সহযোগীকেও আটক করা হয়।
সরকারের দাবি, ইমামওলু ইস্তাম্বুল সিটি করপোরেশনকে কেন্দ্র করে একটি অপরাধী চক্র পরিচালনা করতেন।
৩৮০০ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র
প্রসিকিউটরদের দাখিল করা প্রায় ৩৮০০ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ইমামওলু মেয়র থাকাকালে সিটি করপোরেশনকে ব্যবহার করে একটি বিশাল অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছেন। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করে নিজের সম্পদ বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য অর্থ জোগাড় করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
এই মামলায় ইমামওলুসহ মোট ৪০২ জন অভিযুক্ত। তাঁদের বিরুদ্ধে ঘুষ, চাঁদাবাজি এবং অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইমামওলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর ২০০০ বছরের বেশি কারাদণ্ড হতে পারে বলে প্রসিকিউটররা দাবি করেছেন।
তবে ইমামওলু সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যদিও তাঁর কয়েকজন সহঅভিযুক্ত তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যা সরকারের মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিরোধীদের অভিযোগ: রাজনৈতিক প্রতিহিংসা
সরকার বলছে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং রাজনৈতিক চাপমুক্ত। কিন্তু বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠন ও আইনবিদদের অনেকেই ভিন্ন মত পোষণ করেন।
তাদের মতে, এই বিচার মূলত ইমামওলুকে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা।
বার্লিনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর অ্যাপ্লাইড তুরস্ক স্টাডিজের পরিচালক সিনেম আদার বলেন, এই বিচার মূলত একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা।
বিতর্কিত সময় ও তদন্তকারীর ভূমিকা
সমালোচকরা বলছেন, এই মামলার সময় নির্বাচনও সন্দেহ তৈরি করেছে। ইমামওলুর দল তাঁকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ঘোষণা করার মাত্র কয়েকদিন আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়া মামলার প্রধান তদন্তকারী প্রসিকিউটর আগে এরদোয়ানের ডেপুটি বিচারমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। অভিযোগপত্র প্রস্তুত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তাঁকেই বিচারমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন।
তদন্ত চলাকালে মামলার নানা তথ্য নিয়মিতভাবে সরকারপন্থী গণমাধ্যমে ফাঁস হয়। এমনকি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান নিজেও প্রকাশ্যে তদন্তের প্রশংসা করেন।
এক ভাষণে তিনি বলেন, ইমামওলুর সহকর্মীরাই তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছেন এবং এই তদন্ত তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ করে দেবে।
দুর্নীতি নাকি রাজনৈতিক লক্ষ্য?
তুরস্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় সরকারগুলোতে দুর্নীতির কিছু ঘটনা সাধারণভাবে ঘটে থাকে। তবে ইমামওলুকে ঘিরে যে তীব্র তদন্ত চলছে তা কেবল সুশাসন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নয় বলেই মনে হচ্ছে।
সিনেম আদার বলেন, যদি অভিযোগের কিছু সত্যতাও থাকে, তবুও একজন অভিযুক্তকে আদালতে দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই নীতি অনুসরণ করা হয়নি।
বিচারমন্ত্রী আকিন গুরলেক অবশ্য বলেছেন, অভিযোগের গুরুত্বের কারণেই তদন্ত শুরু করা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের রাজনৈতিক অবস্থান তদন্তকে প্রভাবিত করেনি।
তিনি বলেন, প্রসিকিউটররা কারও পদ বা পরিচয় দেখে বিচার করেন না, তারা কেবল অপরাধ খোঁজেন।
ইমামওলুর অভিযোগ: ন্যায্য বিচার পাব না
কারাগার থেকে পাঠানো লিখিত বক্তব্যে ইমামওলু বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো দেখে তিনি বিশ্বাস করেন না যে তিনি ন্যায্য বিচার পাবেন।
তিনি বলেন, তাঁর প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা আইনগতভাবে এখনো বৈধ এবং জনগণের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য।
আন্তর্জাতিক সমর্থন, দেশের ভেতরে চাপ
এই বিচার শুরু হয়েছে এমন সময়ে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এরদোয়ান শক্ত অবস্থানে রয়েছেন, কিন্তু দেশের ভেতরে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরদোয়ানকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখেন এবং তুরস্কের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগ দেখাননি।
ইউরোপীয় নেতারাও এখন ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান ইস্যু মোকাবিলায় তুরস্কের সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
অন্যদিকে তুরস্কে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালের স্থানীয় নির্বাচনে এরদোয়ানের দল বড় ধাক্কা খায় এবং বিরোধী রিপাবলিকান পিপলস পার্টি দেশের বড় বড় শহরগুলোতে জয়ী হয়।
ইমামওলুর উত্থান
এই নির্বাচনে ইমামওলু তৃতীয়বারের মতো ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। ইস্তাম্বুল তুরস্কের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায় এই বিজয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে।
২০১৯ সালে প্রথমবার এরদোয়ানের প্রার্থীর বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত জয় পেয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আসেন। পরে পুনর্নির্বাচনেও আরও বড় ব্যবধানে জয়ী হন।
সমর্থকদের মতে, তাঁর এই জনপ্রিয়তাই তাঁকে সরকারের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।
আরও আইনি বাধা
গ্রেপ্তারের আগের দিন হঠাৎ করে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১ বছর আগের স্নাতক ডিগ্রি বাতিল করা হয়। তুরস্কের আইনে প্রেসিডেন্ট হতে হলে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন হওয়া বাধ্যতামূলক।
এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচন কর্মকর্তাদের অপমান, নথি জালিয়াতি এবং দরপত্র কারসাজির মতো আরও কয়েকটি মামলা চলছে। এসব মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে সাময়িকভাবে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হতে পারে।
ইমামওলু সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক
ইমামওলুর আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এসব মামলার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া একাধিক বিচারককে বিভিন্ন সময় বদলি করা হয়েছে। কখনও রায় দেওয়ার আগে, আবার কখনও ইমামওলুর পক্ষে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইস্তাম্বুলের আলতিনবাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফৌজদারি আইন অধ্যাপক হাসান সিনার বলেন, এ ধরনের বদলি খুবই অস্বাভাবিক।
তার মতে, এটি স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার মতো মনে হয় না এবং এতে রাজনৈতিক প্রভাব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
কারাগার থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন
বর্তমানে ইমামওলুকে প্রায় ১৩০ বর্গফুটের একটি কক্ষে একা রাখা হয়েছে। তিনি প্রতিদিন ব্যায়াম করেন ও নিজেই দাড়ি কামান। সপ্তাহে এক ঘণ্টা বাইরে হাঁটার সুযোগ পান এবং আরেক ঘণ্টা পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
কম্পিউটার বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করার সুযোগ নেই। সপ্তাহে মাত্র ১০ মিনিট ফোনে কথা বলতে পারেন।
তবে তিনি প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ করেন বলে জানিয়েছেন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ অনুসরণ করেন, বই ও নথি পড়েন এবং আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
একই সঙ্গে তিনি তাঁর নির্বাচনী দলের সঙ্গে কাজ করে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রস্তুত করছেন।
কারাগার থেকেই তিনি লিখেছেন, তাঁকে আটক রেখে বা ডিগ্রি বাতিল করে হয়তো তাঁর পথ বন্ধ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু নির্বাচনের ময়দানে শুধু তাঁর নয়, জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার মুখোমুখি হতে হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















