বিশ্বস্বাস্থ্য গবেষণায় অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘জন ডির্কস কানাডা গার্ডনার গ্লোবাল হেলথ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ যৌথভাবে পেয়েছেন অধ্যাপক জন ডি. ক্লেমেন্স এবং অধ্যাপক জান হলমগ্রেন। কলেরা রোগ, প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং কার্যকর মুখে খাওয়ার ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে তাঁদের দীর্ঘদিনের গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। এই অর্জনের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি-এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
গবেষণার পটভূমি ও স্বীকৃতির কারণ
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্লেমেন্স ও হলমগ্রেন একসঙ্গে কলেরা প্রতিরোধে কাজ করেছেন। তাঁদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ইনজেকশনের তুলনায় মুখে খাওয়ার ভ্যাকসিন বেশি কার্যকর। এই কাজের ভিত্তিতেই তৈরি হয় বিশ্বে প্রথম অনুমোদিত ও ডব্লিউএইচও-স্বীকৃত ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন ‘ডুকোরাল’। পরে আরও সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন ‘শানকোল’ তৈরি করা হয়, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভূমিকা
বাংলাদেশে আইসিডিডিআর,বি-তে কাজ করার সময় অধ্যাপক ক্লেমেন্স ১৯৮৫ সালে মতলবে ৯০ হাজার মানুষের ওপর একটি বড় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করেন। এই গবেষণায় প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয়, মৃত জীবাণুভিত্তিক ওরাল ভ্যাকসিন নিরাপদ ও কার্যকর। পাশাপাশি এটি শুধু টিকা নেওয়া ব্যক্তিকেই নয়, পুরো সম্প্রদায়কে সুরক্ষা দেয়।
এছাড়া কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে আগাম টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে সম্ভাব্য বড় মানবিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। দেশে উৎপাদিত ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনের উন্নয়ন ও পরীক্ষাতেও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও বর্তমান ব্যবহার
বাংলাদেশে সংগৃহীত গবেষণা তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বজুড়ে কলেরা মোকাবিলার কৌশল বদলে গেছে। বর্তমানে ডব্লিউএইচও কলেরা-প্রবণ এলাকা ও প্রাদুর্ভাব উভয় ক্ষেত্রেই ওরাল ভ্যাকসিন ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। ২০১৩ সালে গঠিত বৈশ্বিক ভ্যাকসিন মজুত থেকে ইতোমধ্যে ২০টির বেশি দেশে ১০০টিরও বেশি কর্মসূচির মাধ্যমে ৮ কোটির বেশি ডোজ সরবরাহ করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরা মৃত্যুহার ৯০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যে এই ভ্যাকসিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গবেষকদের প্রতিক্রিয়া
অধ্যাপক জান হলমগ্রেন বলেন, বহু বছর আগে তৈরি এই ভ্যাকসিন এখন বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন রক্ষা করছে—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
অধ্যাপক জন ক্লেমেন্স জানান, এই পথচলা সহজ ছিল না। বৈজ্ঞানিক, বাস্তব ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে এই সাফল্য এসেছে। তিনি এটিকে সহকর্মী ও অংশীদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল হিসেবে উল্লেখ করেন।
আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমীদ আহমেদ বলেন, উন্নত বিশ্বে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেলেও কলেরা এখনো একটি বড় বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। এই স্বীকৃতি শুধু দুই গবেষকের নয়, বরং বাংলাদেশের অবদানকেও তুলে ধরে।

গার্ডনার ফাউন্ডেশন সম্পর্কে
১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত গার্ডনার ফাউন্ডেশন বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ উদযাপন ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। প্রতিবছর এই সংস্থা অসামান্য গবেষণার জন্য পুরস্কার প্রদান করে থাকে। এখন পর্যন্ত ৪০টির বেশি দেশের গবেষকরা এই সম্মান পেয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন।
এই স্বীকৃতি আবারও প্রমাণ করল, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য গবেষণায় বাংলাদেশের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতেও এ অবদান আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
Sarakhon Report 


















