দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পর আচমকা ভয়ংকর সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে উগান্ডার একটি শিম্পাঞ্জি গোষ্ঠী। গবেষকরা বলছেন, বন্য শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে এই ধরনের বিভক্তি ও সংঘবদ্ধ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এভাবে স্পষ্টভাবে আগে কখনও দেখা যায়নি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, উগান্ডার কিবালে ন্যাশনাল পার্কের নগোগো শিম্পাঞ্জি গোষ্ঠী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং একটি দল অন্যটির ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে এখন পর্যন্ত ২৮টি শিম্পাঞ্জিকে হত্যা করেছে।
গবেষণার পটভূমি
১৯৯৫ সাল থেকে গবেষকরা এই শিম্পাঞ্জি গোষ্ঠীটি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। প্রায় ২০০ সদস্যের এই দলটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় বন্য শিম্পাঞ্জি গোষ্ঠীগুলোর একটি। সাধারণত একটি গোষ্ঠীতে প্রায় ৫০টি শিম্পাঞ্জি থাকে।
দুই দশক ধরে তারা শান্তিপূর্ণভাবে ফল খাওয়া, বিশ্রাম নেওয়া, চলাফেরা এবং একে অপরের পরিচর্যার মধ্যে সময় কাটাত। কিন্তু হঠাৎ করেই এই স্থিতিশীল সমাজ ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।
বিভক্তি ও সংঘর্ষের শুরু
গবেষকদের মতে, ২০১৫ সালের দিকে গোষ্ঠীর ভেতরে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। সদস্যরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে একে অপরকে এড়িয়ে চলতে থাকে। ২০১৭ সালের দিকে অসুস্থতায় অনেক শিম্পাঞ্জির মৃত্যু হলে সামাজিক সম্পর্ক আরও ভেঙে পড়ে।
এরপর ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ গোষ্ঠীটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়—পশ্চিমাঞ্চলীয় দল এবং কেন্দ্রীয় দল। ২০১৮ সাল থেকে পশ্চিমাঞ্চলীয় দলটি কেন্দ্রীয় দলের ওপর ধারাবাহিক হামলা শুরু করে।
সহিংসতার ধরন
গবেষকদের বর্ণনায়, হামলাগুলো ছিল অত্যন্ত সংগঠিত ও নৃশংস। শিম্পাঞ্জিরা তাদের শিকারকে কামড়ানো, মারধর, টেনে নেওয়া এবং লাথি মারার মতো আচরণ করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের লক্ষ্যবস্তু করা হলেও শিশু শিম্পাঞ্জিরাও রেহাই পায়নি।
অনেক সময় আক্রমণ ১৫ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। গবেষকদের ধারণা, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক শিম্পাঞ্জি বাহ্যিক আঘাতে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ আঘাতের কারণে মারা গেছে। অন্যদিকে, শিশু শিম্পাঞ্জিদের খুব দ্রুত হত্যা করা হয়েছে।
মোট প্রাণহানি ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৪ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অন্তত ২৪টি শিম্পাঞ্জি নিহত হয়েছে। এরপর আরও চারটি মৃত্যুর ঘটনা যোগ হয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮-এ। এছাড়া অনেক শিম্পাঞ্জি নিখোঁজ হয়েছে, যা আরও অজানা হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়।
পশ্চিমাঞ্চলীয় দলটি শুরুতে ছোট হলেও পরে সদস্যসংখ্যা ও এলাকা—দুই ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় দলকে ছাড়িয়ে যায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সংঘর্ষে পশ্চিমাঞ্চলীয় দলের কোনো সদস্য নিহত হয়নি।

বিভক্তির সম্ভাব্য কারণ
গবেষকদের মতে, গোষ্ঠীর অস্বাভাবিক বড় আকারই এই বিভক্তির অন্যতম কারণ হতে পারে। এতে খাদ্য ও প্রজনন নিয়ে প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়। এছাড়া নেতৃত্ব পরিবর্তন এবং রোগে মৃত্যু—এসব বিষয় সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।
মানব সমাজের সঙ্গে তুলনা
গবেষকরা এই ঘটনাকে সরাসরি মানব সমাজের গৃহযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করতে চান না। তবে কিছু মিল তারা স্বীকার করেছেন। তবুও তারা সতর্ক করেছেন, মানুষের সঙ্গে শিম্পাঞ্জির আচরণের সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়, কারণ দীর্ঘ বিবর্তনের ফলে মানুষ ভিন্ন পথে এগিয়েছে।
গবেষণার তাৎপর্য
এই ঘটনা বন্য প্রাণীদের সামাজিক আচরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কীভাবে হঠাৎ করে শত্রুতায় পরিণত হতে পারে—তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন আরও গভীরভাবে গবেষণা করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















