সারাদেশজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় যখন বেড়েই চলেছে, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন বাজেটে প্রতিরক্ষার জন্য ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, আর পরিবারকে সহায়তা করে এমন নানা কর্মসূচিতে বড় কাটছাঁটের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত এক ইস্টার মধ্যাহ্নভোজে তিনি বলেছেন, যুদ্ধ চলছে, তাই শিশু পরিচর্যার দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ নেই।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতিজনিত সংকটকেই কখনও ‘প্রতারণা’, কখনও ‘ভাঁওতা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ বাবা-মায়ের কাছে এই চাপ একেবারেই বাস্তব। প্রেসিডেন্টের উদাসীনতার মূল্য শেষ পর্যন্ত দেবে তাদের সন্তানরাই।
জাতীয় পর্যায়ের রিপাবলিকানদের কাছে চাপে থাকা পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর কোনো উত্তর নেই। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মতো নেতারা এবং ডানপন্থী চিন্তাকেন্দ্রগুলো কমে যাওয়া জন্মহারের প্রশ্নে আচ্ছন্ন। অথচ তারা সেই আর্থিক বোঝা নিয়ে কথা বলে না, যা সন্তান লালন-পালন করতে চাওয়া পরিবারগুলোকে চেপে ধরেছে। নিরাপদ, সুস্থ, মধ্যবিত্ত জীবনের স্বপ্ন এখন অনেক পরিবারের কাছেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
তাদের সমাধান অনেক সময়ই নস্টালজিয়া আর নারীবিদ্বেষে ভরা। যেন নারীরা ঘরে ফিরে গেলে, পুরোনো সামাজিক কাঠামো ফিরিয়ে আনলেই অর্থনীতি আবার শক্তিশালী হবে, পরিবারও সুখী হবে। বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এই ভাবনা নীতিগত দিক থেকেও দুর্বল, রাজনৈতিক দিক থেকেও অচল।
এখনকার যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান লালন-পালন হচ্ছে এমন এক অর্থনীতিতে, যেখানে সংসার টিকিয়ে রাখতে মা-বাবা দুজনকেই কাজ করতে হয়। শিশু পরিচর্যার খরচ অনেক জায়গায় বাড়িভাড়ার সমান। জাতীয়ভাবে বেতনসহ ছুটির কোনো ব্যবস্থা নেই। এর সঙ্গে রয়েছে এমন এক ডিজিটাল দুনিয়া, যেটি অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিবারগুলোর দরকার ভাষণ নয়, বাস্তব পরিবর্তন।
এখানেই বড় এক বিদ্রূপ আছে। গর্ভপাতের সাংবিধানিক সুরক্ষা বাতিলের পর মায়েদের পাশে থাকার কথা বলা রিপাবলিকানরাই আবার এমন নীতির বিরোধিতা করে, যা সন্তান নেওয়াকে সহজতর ও সাশ্রয়ী করতে পারে।
পরিবারের নীরব আতঙ্ক
আমি জীবনের বড় অংশজুড়ে শিশু ও পরিবার নিয়ে কাজ করেছি। অসংখ্য বাবা-মায়ের মুখে একই ধরনের নীরব আতঙ্কের কথা শুনেছি। তাদের কাছ থেকে আরও বেশি কিছু চাওয়া হচ্ছে, কিন্তু সহায়তা দেওয়া হচ্ছে ক্রমেই কম। ২০২৪ সালের এক পরামর্শপত্রে, বাবা-মায়েদের মানসিক চাপ ও উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরে তৎকালীন সার্জন জেনারেল ড. বিবেক মার্থি জানান, কয়েক দশক আগের তুলনায় আজকের বাবা-মায়েরা একদিকে বেশি সময় কাজ করছেন, অন্যদিকে সন্তানদের পেছনেও বেশি সময় দিচ্ছেন।
তাই বিস্ময়ের কিছু নেই যে প্রায় অর্ধেক বাবা-মা প্রতিদিন তীব্র মানসিক চাপে থাকার কথা জানান। অন্য প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় এই হার প্রায় দ্বিগুণ। একটি শিশুকে বড় করে তোলার খরচ অনেক পরিবারকে বিপর্যয়ের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। আবার অনেকেই ভাবছেন, সন্তান নেওয়াই তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়।
ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করছে। শুধু তা-ই নয়, ইরান যুদ্ধের খরচ জোগাতে খাদ্য, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবায় পরিবারকে দেওয়া সহায়তা কমানো হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তবে একই সঙ্গে লাল ও নীল—উভয় ধরনের অঙ্গরাজ্যেই কিছু অর্থবহ অগ্রগতি হচ্ছে। সেসব উদাহরণ দেখায়, রাজনীতি যখন ঠিকভাবে কাজ করে, তখন পরিবারও এগিয়ে যায়।

পরিবারকে বাঁচাতে কী করা দরকার
প্রথম কাজ হলো সাশ্রয়ী জীবন নিশ্চিত করা। আজকের বাবা-মায়েরা এক প্রজন্মের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যয়ের চাপের মুখে আছেন। শিশু পরিচর্যা অধিকাংশ পরিবারের সবচেয়ে বড় ব্যয়গুলোর একটি। বাড়িভাড়া, ডায়াপার, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস—সবই আয়কে দ্রুত ক্ষয় করে দিচ্ছে। বহু মায়ের আয় সন্তান জন্মের ঠিক আগে ও পরে হঠাৎ কমে যায়, অথচ একই সময়ে খরচ বেড়ে যায় দ্রুত। তার ওপর ইরান যুদ্ধ জ্বালানি, খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে এই চাপ আরও বাড়াচ্ছে।
সমাধান আমাদের জানা আছে। ২০২১ সালে শিশু কর-ছাড় বাড়ানো হয়েছিল, আর তার ফলে এক বছরের মধ্যে শিশু দারিদ্র্য সবচেয়ে বড় হারে কমে আসে। কয়েকটি অঙ্গরাজ্য সেই পথেই এগোচ্ছে। তারা ফেরতযোগ্য কর-ছাড় দিচ্ছে, গর্ভাবস্থা ও শিশুর শুরুর সময়ে পরিবারকে সরাসরি নগদ সহায়তাও দিচ্ছে।
ইলিনয়ে শিশু কর-ছাড় বাড়িয়ে আরও বেশি নিম্নআয়ের পরিবার ও ছোট শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মিশিগানে চিকিৎসক মোনা হান্না ও লুক শেফারের উদ্যোগে চালু হওয়া ‘আরএক্সকিডস’ কর্মসূচির আওতায় গর্ভবতী মা ও নবজাতকের পরিবারকে সরাসরি অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। এতে উচ্ছেদ কমেছে, নবজাতকের স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে, বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থাও উন্নত হয়েছে।
এ ধরনের কর্মসূচি আরও অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। পরিবারকে শক্তিশালী করতে চাইলে, সন্তান জন্মের সময় বাবা-মাকে ভাসিয়ে না রেখে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থাই প্রথম পদক্ষেপ।
দ্বিতীয়ত, বাবা-মায়েদের সময় দরকার। সন্তানের জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহে পরিবারগুলো এক কঠিন হিসাবের মুখে পড়ে—কত দ্রুত কাজে ফিরতে হবে, আর কত দিন আয় ছাড়া থাকা সম্ভব? প্রয়োজনের তাগিদে অনেক মা-বাবাকেই জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই কাজে ফিরে যেতে হয়।
বেতনসহ পারিবারিক ছুটি এই অসম্ভব সমীকরণটি দূর করতে পারে। এতে বাবা-মা আয় বা চাকরির নিরাপত্তা হারানো ছাড়া নবজাতকের যত্ন নিতে পারেন। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনও প্রায় একাই জাতীয় পর্যায়ে এমন কোনো কর্মসূচি ছাড়াই দাঁড়িয়ে আছে। এক ডজনের বেশি অঙ্গরাজ্য এখন নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নিচ্ছে, আর ফলাফল স্পষ্ট—সুস্থতর শিশু, বেশি আর্থিক স্থিতি এবং কর্মজীবনে বেশি স্থায়িত্ব।
তৃতীয়ত, প্রারম্ভিক শৈশবের পরিচর্যা ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নিউ মেক্সিকো প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ শৈশবের শিক্ষায় ব্যয় করে প্রায় সর্বজনীন শিশু পরিচর্যার নিশ্চয়তা দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক শিশু পরিচর্যা ভর্তুকি বাড়াচ্ছে, যাতে মা-বাবা কাজও করতে পারেন, সন্তানও মানসম্মত যত্ন পায়। রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করেই ইলিনয়, ওকলাহোমা, ফ্লোরিডাসহ নানা অঙ্গরাজ্যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদেরা বহু দশক ধরেই একমত যে, মানসম্মত প্রারম্ভিক শিক্ষা সমাজের সবচেয়ে ফলদায়ক বিনিয়োগগুলোর একটি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।
চতুর্থত, শিশুদের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হবে। ১৯৯৭ সালে শিশু স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি চালু করার কারণ ছিল খুবই স্পষ্ট—অসংখ্য শিশু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছিল না। আজও লাখো শিশু সরকারি স্বাস্থ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অথচ ট্রাম্পের প্রস্তাবিত অর্থছাঁটাই সেই নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
কিছু অঙ্গরাজ্য এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তারা স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াচ্ছে এবং শারীরিক ও মানসিক—উভয় স্বাস্থ্যেই বিনিয়োগ করছে। শৈশবের মানসিক আঘাত শনাক্ত ও চিকিৎসার কর্মসূচি, যা ক্যালিফোর্নিয়ায় শুরু হয়েছিল এবং এখন টেনেসি ও আলাস্কার মতো অঙ্গরাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থার গতিপথ বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয়ও কমাতে পারে।

ডিজিটাল যুগের নতুন বিপদ
সবশেষে, দ্রুত বদলে যাওয়া ডিজিটাল বিশ্বের ভেতর দিয়ে পরিবারকে পথ দেখাতে হবে। গত মাসে সান ফ্রান্সিসকোতে এক সম্মেলনে আমি অভিভাবক ও অধিকারকর্মীদের কাছ থেকে স্পষ্টভাবে শুনেছি—এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবারগুলো নেতৃত্ব চায়, কিন্তু ওয়াশিংটন প্রায় অনুপস্থিত।
অভিভাবকেরা সন্তান বড় করছেন এমন এক পরিবেশে, যার অভিজ্ঞতা আগের কোনো প্রজন্মের ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শৈশবকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার আগেই পরিবর্তনগুলো এসে যাচ্ছে। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত চাকরির অস্থিরতা পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ আরও বাড়াতে পারে।
স্পষ্ট নিয়ম তৈরির বদলে ট্রাম্প প্রশাসন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দিকেই তাকিয়ে আছে। অথচ ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ মেক্সিকোর সাম্প্রতিক কয়েকটি জুরি রায়ে দেখা গেছে, শিশুদের আসক্ত করে তোলা ও শোষণের দায়ে বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায়ী করা হয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ইতিমধ্যে নেশাসৃষ্টিকারী নকশা সীমিত করা, বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা, অনিরাপদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যালয়ে মোবাইলমুক্ত নীতি গ্রহণের মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে। পরিবারগুলোর প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে একটি ন্যূনতম সুরক্ষা কাঠামো, পাশাপাশি এই প্রযুক্তি নিরাপদে ব্যবহারের জ্ঞান ও সক্ষমতা।
নির্বাচনের রাজনীতিতে শিশুদের সামনে আনতে হবে
ট্রাম্প আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ এসব নিয়ে ভাববেন, এমন আশা করার কারণ নেই। তিনি মনে করেন, আমেরিকান বাবা-মায়েরা যেন এক নতুন সোনালি যুগে সন্তান বড় করছেন—যদি তিনি আদৌ তাদের কথা ভেবে থাকেন।
মার-আ-লাগোর ঝলমলে দেয়ালের বাইরে বাস্তবতা আলাদা। অসংখ্য পরিবার টিকে থাকার লড়াই লড়ছে। নভেম্বরে তারা এমন প্রার্থী খুঁজবে, যারা তাদের কথা শুনবে এবং সব শিশুর পক্ষ হয়ে নেতৃত্ব দেবে। ডেমোক্র্যাটদের সেই প্রস্তুতি থাকতে হবে। কী কাজ করে, আমরা জানি। পরিবারকে কীভাবে সহায়তা করতে হয়, তাও জানি। যদি সত্যিই এই নির্বাচনকে সাশ্রয়ী জীবনযাপনের প্রশ্নে দাঁড় করাতে চাই, তবে শিশুদেরই আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে।
Sarakhon Report 


















