কাম্বোডিয়ার ঐতিহাসিক অংকোর ওয়াটে হাজারো মূর্তির ভিড়ে এবার যুক্ত হয়েছে এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। দেবদেবী বা অপ্সরা নয়, এই মূর্তিটি এক ইঁদুরের—নাম তার মাগাওয়া। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মাটিতে লুকিয়ে থাকা মরণফাঁদ খুঁজে বের করে যে ইঁদুর অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করেছে, তাকে ঘিরেই এই বিশেষ সম্মান।
মাইন শনাক্তকরণে অনন্য দক্ষতা
তানজানিয়ায় জন্ম নেওয়া মাগাওয়া ছয় বছর কাটিয়েছে কাম্বোডিয়ায়। এই সময়েই সে হয়ে ওঠে এক নীরব নায়ক। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে দেশটির গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য স্থলমাইন ও অবিস্ফোরিত অস্ত্র। সাধারণ মানুষের জন্য এসব এলাকা পরিষ্কার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ। একটি টেনিস কোর্টের সমান জায়গা পরিষ্কার করতেও মানুষের চার দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
এখানেই পার্থক্য গড়ে দেয় মাগাওয়ার মতো প্রশিক্ষিত ইঁদুর। হালকা ওজনের কারণে তারা নিরাপদে মাটির উপর দিয়ে চলাচল করতে পারে। তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করে তারা সহজেই মাটির নিচে লুকানো বিস্ফোরক শনাক্ত করতে পারে।

‘হিরো র্যাট’দের অবদান
একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগে ২০১৫ সাল থেকে কাম্বোডিয়ায় এসব প্রশিক্ষিত ইঁদুর ব্যবহার করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা প্রায় ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা পরিষ্কার করেছে এবং আট হাজারের বেশি স্থলমাইন শনাক্ত করেছে।
তবে সবার মধ্যে মাগাওয়াই ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। ছয় বছরে সে একাই শতাধিক মাইন শনাক্ত করে, যা প্রায় ২০টি ফুটবল মাঠের সমান এলাকা নিরাপদ করতে সহায়তা করেছে।
জীবনের শেষ ও বিরল সম্মান
২০২২ সালে শান্তিপূর্ণভাবে মৃত্যু হয় মাগাওয়ার। প্রাণীদের বীরত্বের জন্য দেওয়া একটি বিশেষ স্বর্ণপদকও পেয়েছিল সে—যা এর আগে কোনো ইঁদুর পায়নি।

সম্প্রতি অংকোর ওয়াটে উন্মোচন করা হয়েছে তার ২.২ মিটার উচ্চতার মূর্তি। ধারণা করা হচ্ছে, এটি বিশ্বের প্রথম কোনো জীবনরক্ষাকারী ইঁদুরের জন্য নির্মিত জনসম্মুখে স্থাপিত স্মারক।
সম্মানের আড়ালে সতর্কবার্তা
তবে এই সম্মান কেবল অতীতের সাফল্যের গল্প নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তাও। এখনও কাম্বোডিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে লাখ লাখ স্থলমাইন মাটির নিচে লুকিয়ে আছে। এসব এলাকা মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বসবাসস্থল, যেখানে মাইন কৃষিকাজ বাধাগ্রস্ত করছে এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।
১৯৭৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এসব মাইনের কারণে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে। একই সঙ্গে সতর্ক করা হচ্ছে যে, মাইন অপসারণ কার্যক্রমের জন্য অর্থায়ন ক্রমেই কমে আসছে। ফলে এই সংকট মোকাবিলায় মানুষের আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















