ভারতের অন্যতম নির্মল নদী ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত চম্বল নদী আজ ভয়াবহ সংকটে। অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্য ক্রমেই ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবু থামছে না বালু মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য।
সম্প্রতি চম্বল অঞ্চলে দুই বনকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি আমলে নেয়। আদালত মন্তব্য করে, প্রয়োজন হলে বিচারিক পর্যবেক্ষণের গণ্ডি ছাড়িয়ে আইন প্রয়োগের দিকেও যেতে হতে পারে। আদালতের ভাষায়, এরা আধুনিক যুগের ‘দস্যু’। তবে আগের যুগের চম্বলের ঘোড়সওয়ার ডাকাতদের মতো নয়, এখনকার এই দস্যুরা কাজ করে বিশাল যন্ত্রপাতি নিয়ে, নদীর বুক চিরে।
নদীর বালুচর ও শুকনো তীর জুড়ে চলছে বুলডোজার ও জেসিবি মেশিনের ব্যবহার। বালুর সঙ্গে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে ঘড়িয়াল ও কচ্ছপের বাসা। নদীর তলদেশ থেকে ডিজেলচালিত ড্রেজার দিয়ে তোলা হচ্ছে টনের পর টন বালু। সেই বালু রাতের অন্ধকারে ট্রাক্টর-ট্রলিতে করে চলে যাচ্ছে নির্মাণশিল্পে ব্যবহারের জন্য।
সংরক্ষিত অঞ্চল নিয়েও বিতর্ক
গত ডিসেম্বরে রাজস্থান সরকার ন্যাশনাল চম্বল স্যাংচুয়ারির ৭৩২ হেক্টর এলাকা সংরক্ষিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এপ্রিলের শুরুতে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানায়, বেপরোয়া বালু উত্তোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী আবাসস্থল উৎসর্গ করা যায় না।
কিন্তু আদালতের নির্দেশের পরও মাঠপর্যায়ে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। এখনো প্রতিদিন শত শত ট্রাক অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু বহন করছে। এতে প্রশাসনের একাংশের যোগসাজশের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন কর্মীরা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজস্থানের ধোলপুরে বনরক্ষী জিতেন্দ্র সিং শেখাওয়াত একটি ট্রাক্টর-ট্রলি থামানোর চেষ্টা করলে তাকে চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। একই ধরনের ঘটনা ঘটে ৮ এপ্রিল মধ্যপ্রদেশের মোরেনায়। সেখানে বনকর্মী হারিকেশ গুর্জর ভোরের অভিযানে নিহত হন।
এরপর ১৭ এপ্রিলের শুনানিতে বিচারপতি বিক্রম নাথ ও সন্দীপ মেহতা মন্তব্য করেন, রাজ্য সরকারগুলো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হবে।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরছে না
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে পুনর্গঠনের সময় দিতে হয়। একটি অঞ্চল থেকে বালু তোলার পর অন্তত পাঁচ বছর সেটিকে অব্যবহৃত রাখা প্রয়োজন, যাতে প্রাকৃতিকভাবে বালুর স্তর পুনরুদ্ধার হয়। এই নীতির ভিত্তিতে চলতি বছর রাজস্থান হাইকোর্ট ৯৩টি খনি লিজ বাতিল করেছিল। তবে বাস্তবে অবৈধ উত্তোলন বন্ধ হয়নি।
বিকল্প পথও আছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সম্ভব। রাজস্থানের বানাস নদীর বিসালপুর বাঁধে চালু হওয়া একটি প্রকল্পে পলি ও ব্যবহারযোগ্য বালু আলাদা করে জিপিএসের মাধ্যমে পরিবহন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। এতে একদিকে বাঁধের ধারণক্ষমতা বাড়ানো গেছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক নদীতীরের ওপর চাপও কমেছে।
তবে এমন স্বচ্ছ ব্যবস্থা চালু হলে অবৈধ ব্যবসা ও দুর্নীতির সুযোগ কমে যায়। আর সেই কারণেই প্রভাবশালী চক্রগুলো এসব উদ্যোগকে বড় পরিসরে বাস্তবায়ন হতে দিতে চায় না।
চম্বল নদীর বর্তমান সংকট শুধু একটি নদীর গল্প নয়, এটি পরিবেশ, প্রশাসন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছারও কঠিন পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
চম্বল নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে, উদ্বেগ জানিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















