রংপুরের আলু চাষিদের জন্য এবারের বাম্পার ফলন পরিণত হয়েছে দুর্ভোগের মৌসুমে। দাম পড়ে যাওয়া এবং সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে তাদের উৎপাদিত আলু রাস্তার পাশে ফেলে দিচ্ছেন। কৃষকরা জানান, এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ১৮ টাকা, কিন্তু বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৫-৬ টাকা কেজি দরে। হিমাগারগুলো আগেই পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় এবং বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় অনেকের সামনে ফসল ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা এবং লালমনিরহাটের নয়টি উপজেলার কৃষকরা তাদের উৎপাদিত আলু সংরক্ষণে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি জানান, সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬ কোটি টাকা। সংকট সবচেয়ে তীব্র রংপুরের গংগাচড়া উপজেলায়, যেখানে বাম্পার ফলন রূপ নিয়েছে লোকসানের মৌসুমে। বৃহস্পতিবার গংগাচড়ার চেংমারী ও কুরিয়ার মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে শত শত বস্তা পচা আলু স্তূপ করে রাখা। কয়েকটি জায়গায় পচতে থাকা আলু থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল।

হিমাগার সংকট ও বৃষ্টিতে ঘরে রাখা আলুও পচে যাচ্ছে
ডিএইর তথ্য অনুযায়ী এ মৌসুমে গংগাচড়া উপজেলায় ৫ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ২০৭ টন, যা স্থানীয় চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে পাইকারি বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬-৭ টাকায়, আর কৃষকরা ক্ষেত পর্যায়ে পাচ্ছেন মাত্র ৪-৫ টাকা, যা উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম। এ বছরের ক্ষতি গত বছরের চেয়েও বেশি, কেজিপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত। উপজেলার একমাত্র হিমাগারটির ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বস্তা, যা ইতোমধ্যে প্রায় পূর্ণ। অনেক কৃষক বাড়িতে আলু সংরক্ষণ করলেও টানা বৃষ্টি ও আর্দ্রতার কারণে সেই মজুদও দ্রুত পচে যাচ্ছে।
চেংমারী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ৩০০ শতক জমিতে আলু চাষ করেছিলেন তিনি। প্রথমে ব্যবসায়ীরা ৩-৪ টাকা কেজি দাম দিতে চাওয়ায় তিনি বাড়িতে আলু সংরক্ষণ করেন, কিন্তু সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলো পচতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় ৫০ বস্তা ফেলে দিতে হয়। একই গ্রামের ৫০ বছর বয়সী পারভীন আক্তার আরও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি লিজ নেওয়া জমিসহ প্রায় ৫০০ শতকে আলু চাষ করেন, যার অর্থায়নে দেড় লাখ টাকার গরু বিক্রি ও বাকিতে কৃষি উপকরণ সংগ্রহ করেছিলেন। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের কৃষক সোলায়মান আলী জানান, হিমাগারে জায়গা না পেয়ে তাকে প্রায় ৭০ বস্তা আলু ফেলে দিতে হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এ অঞ্চলে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ কৃষক একই ধরনের দুর্দশায় পড়েছেন। গংগাচড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবেল হোসেন বলেন, অতিরিক্ত উৎপাদন এবং দেরিতে ফসল তোলাই এ সংকটের মূল কারণ; তবে অবিলম্বে বাজার হস্তক্ষেপ ও সংরক্ষণ সক্ষমতা না বাড়ালে এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে বলে কৃষকরা আশঙ্কা করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















