জার্মানির শীর্ষস্থানীয় ড্রোন নির্মাতা কোয়ান্টাম সিস্টেমস যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্রুত প্রবেশের ক্ষেত্রে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইন-কিউ-টেলের সহায়তা পেয়েছে। কোম্পানিটির সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সভেন ক্রুকের বক্তব্যে প্রথমবারের মতো এই সহযোগিতার বিস্তারিত প্রকাশ পেয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার দরজা খুলে দেয় বিনিয়োগ
ক্রুক জানিয়েছেন, ইন-কিউ-টেলসহ কয়েকজন মার্কিন বিনিয়োগকারী কোয়ান্টাম সিস্টেমসকে ওয়াশিংটনে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ তৈরি করতে সহায়তা করেন। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার সঙ্গে কাজ পাওয়ার সুযোগ পায়।
ক্রুকের ভাষায়, এই বিনিয়োগকারীদের যোগাযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা শুরু করা তুলনামূলক সহজ হয়েছিল। বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কোয়ান্টাম সিস্টেমস বর্তমানে নজরদারি, আক্রমণ এবং শত্রুপক্ষের ড্রোন প্রতিহত করার কাজে ব্যবহৃত ড্রোন তৈরি করে। ইউক্রেন ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের কাছে তাদের প্রযুক্তি সরবরাহ করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রেই আগে শক্ত অবস্থান
ক্রুক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য করা একটি নজরদারি চুক্তি আর্থিকভাবে খুব বড় না হলেও কোম্পানিটির বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এর ফলে ইউরোপের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোয়ান্টাম সিস্টেমসের অবস্থান শক্ত হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলার।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্রযুক্তি অন্য দেশে বিক্রি করতে হলে মার্কিন অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। ফলে বিদেশি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে মার্কিন বিনিয়োগের প্রভাব শুধু অর্থায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
ইন-কিউ-টেলের বাড়তে থাকা প্রভাব
ইন-কিউ-টেল এমন একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, যা মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি শনাক্ত করে সেখানে বিনিয়োগ করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রতিষ্ঠানটি সাইবার নিরাপত্তা, জ্বালানি, উপগ্রহসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করে। এর বিনিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি পালান্টির এবং সামরিক প্রযুক্তি ও ড্রোন নির্মাতা অ্যান্ডুরিলও রয়েছে।
জার্মানির প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্টার্কেও ইন-কিউ-টেলের অংশীদারত্ব রয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো সামরিক ব্যয় বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে তাদের বিনিয়োগও বাড়ছে।
প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জেনিফার নেলসন বলেছেন, জার্মানি ইউরোপের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং কৌশলগত মিত্র।
ইউরোপের স্বাধীনতার লক্ষ্যেই নতুন প্রশ্ন
রাশিয়ার হুমকির মুখে ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ন্যাটো নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা হুমকির পর ইউরোপ নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মার্কিন অর্থ ও বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে কৌশলগত স্বাধীনতার লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ার মারি-আগনেস স্ট্রাক-জিমারম্যান মনে করেন, ইন-কিউ-টেলকে সাধারণ বিনিয়োগকারীর মতো দেখলে বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়।
তার মতে, প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। ফলে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বাইরেও কৌশলগত প্রভাব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সঙ্গে প্রভাবও বাড়ছে
ইন-কিউ-টেলের বিনিয়োগ সাধারণত তুলনামূলক ছোট—অনেক ক্ষেত্রে ৩০ লাখ ডলারেরও কম। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মূল্য শুধু অর্থের পরিমাণে নয়, বরং মার্কিন প্রতিরক্ষা ও সরকারি ক্রেতাদের সঙ্গে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর যোগাযোগ তৈরি করে দেওয়ার সক্ষমতায়।
কোয়ান্টাম সিস্টেমসের ক্রুকও বলেছেন, প্রতিটি বিনিয়োগকারীর পেছনে একটি যোগাযোগের নেটওয়ার্ক থাকে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সময় কোম্পানিগুলো স্বাভাবিকভাবেই সেই নেটওয়ার্ক কাজে লাগানোর চেষ্টা করে।
তবে তিনি জানান, গত দুই বছরে ইন-কিউ-টেল সরাসরি কোনো নতুন প্রস্তাব নিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কোম্পানির পণ্য শেষ পর্যন্ত ভালো না হলে শুধু বিনিয়োগকারীর যোগাযোগ দিয়ে সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপনের বাধ্যবাধকতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজারে বিদেশি সরবরাহকারীদের স্থানীয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয়তাও কোয়ান্টাম সিস্টেমসকে দেশটিতে কারখানা ও কর্মী স্থাপনে উৎসাহিত করেছে।
ক্রুক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা ও কর্মী রাখার অন্যতম কারণ হলো দেশটির এই নীতি। অর্থাৎ মার্কিন প্রতিরক্ষা বাজারে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপর স্থানীয় উপস্থিতি তৈরির চাপও তৈরি হয়।
জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগকারীদের প্রভাবের বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। তবে কোনো কোম্পানির কার্যক্রম, প্রযুক্তি বা গবেষণায় শেয়ারহোল্ডারদের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয় বলেও তারা মত দিয়েছে।
ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, মহাদেশটির নিজস্ব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও বেশি অর্থায়নের ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ইন-কিউ-টেলের মতো ইউরোপজুড়ে সমতুল্য কোনো প্রতিষ্ঠান এখনো নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















