০৭:১৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার পরের পরীক্ষা: নেতৃত্ব কি নির্ভরতার বদলে পারস্পরিক সমৃদ্ধি আনবে? তারেক রহমানকে ট্রাম্পের চিঠি: কিছু কথা রাজনীতির নতুন সূত্র: ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মাংসের জোগান বইয়ের পাতার মতোই মুগ্ধতা ছড়ায় বিশ্বের ৭ অপূর্ব গ্রন্থাগার লুলুলেমন আনল ‘বিগ-অ্যাস ব্যাগ’, ৮০ লিটারের বিশাল টোট ব্যাগে ঢুকবে যেন পুরো সংসার শিশুদের মুখে নতুন হাসি, মিশিগানে ম্যাগির উইগস ৪ কিডস-এর ২৩তম বার্ষিক গালা নাসার রোমান টেলিস্কোপের নতুন ঠিকানার পথে তিন মাসের মহাকাশযাত্রা মাত্র ১০ সেন্টিমিটার উচ্চতার ‘কিউটি পাই’ গোলাপ, ছোট বাগান সাজাতে দারুণ প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে স্বনির্ভর করতে অভিভাবকের যে ৬টি পদক্ষেপ জরুরি বাড়িতে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান থাকলে সম্পর্ক ভালো রাখার উপায়

ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার পরের পরীক্ষা: নেতৃত্ব কি নির্ভরতার বদলে পারস্পরিক সমৃদ্ধি আনবে?

ভারতের স্বাধীনতার আট দশক পূর্তিতে দেশটির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত তার অর্জিত কৌশলগত স্বাধীনতা নিয়ে নয়, বরং এই স্বাধীনতা দিয়ে আগামী দিনে সে কী করতে চায় তা নিয়ে। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কাঠামো দ্রুত বদলেছে। একদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, পুঁজি ও সরবরাহব্যবস্থা ক্রমেই ভূরাজনীতির অংশ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় ভারতের জন্য শুধু কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন এমন এক অর্থনৈতিক সম্পর্কব্যবস্থা, যেখানে কোনো একটি দেশ বা শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভারতের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত না হয়।

গত এক দশকে ভারত সেই পথেই এগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক ধরে রেখেছে নয়াদিল্লি। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৃহত্তর ভূমিকার দাবিও জোরালো করেছে ভারত।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নতুন অর্থ

একসময় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলতে মূলত এমন পররাষ্ট্রনীতি বোঝানো হতো, যেখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগোষ্ঠীর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়া হবে না যে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা হারাতে হয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সেই স্বাধীনতার ভিত্তি কেবল কূটনীতিতে নেই। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বাধীনতা প্রয়োজন।

এখানে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হতে পারে কৌশলগত পারস্পরিক নির্ভরতা। অর্থাৎ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এতটাই বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাতে কোনো একক অংশীদার, বাজার বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জাতীয় দুর্বলতায় পরিণত না হয়। বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং বহুমুখী সংযোগই হতে পারে ভারতের শক্তি।

ভূগোলও এ ক্ষেত্রে ভারতের বড় সম্পদ। দেশটির অবস্থান তাকে উপসাগরীয় ও পশ্চিম এশিয়া, এশিয়ার উৎপাদনকেন্দ্র, ভারত মহাসাগর পেরিয়ে আফ্রিকা এবং রাশিয়াকেন্দ্রিক ইউরেশীয় অঞ্চলের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সংযোগস্থলে পরিণত করেছে। বিশ্ব যখন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে ক্রমশ খণ্ডিত হচ্ছে, তখন ভারত চাইলে সেই বিভাজনের আরেকটি পক্ষ না হয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সেতুবন্ধনের ভূমিকা নিতে পারে।

India, Japan set to expand AI and semiconductor partnership |  Communications Today

সম্পর্কের বৈচিত্র্যই ভারতের শক্তি

জাপানের সঙ্গে ভারতের সহযোগিতা এখন আর কেবল কূটনৈতিক অংশীদারত্বে সীমাবদ্ধ নেই। উন্নত উৎপাদন, প্রযুক্তি, জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মতো ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক বিস্তৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, উন্নত উৎপাদন, জ্বালানি ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ছে। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কেও অর্থনীতি ও প্রযুক্তির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক জ্বালানি সম্পর্কও এখন বিনিয়োগ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক পরিসরে নতুন মাত্রা যোগ করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আবার ভারতকে এশিয়ার বৃহত্তর উৎপাদন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করছে।

এই বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যে রাশিয়ার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেও ওয়াশিংটন, টোকিও, ইউরোপ ও উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া দেখায় যে ভারত এখনো বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করতে সক্ষম। এটাই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বাস্তব মূল্য।

চীনকে ঘিরে ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষা

এই সমীকরণে চীন স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে জটিল বিষয়। ভারতের জন্য অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার নীতিও বাস্তবসম্মত নয়। তাই নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা এবং বিকল্প অংশীদার তৈরি করার পাশাপাশি যেখানে স্বার্থের মিল রয়েছে সেখানে যোগাযোগের সুযোগও ধরে রাখতে হবে।

ভারতের আরেকটি বড় শক্তি তার বৈশ্বিক প্রবাসী জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী অর্থনীতি, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি করতে পারে। তবে প্রবাসী সমাজের রাজনৈতিক অবস্থান সবসময় ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে অভিন্ন হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কখনো কখনো তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রবণতা সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও সংবেদনশীলতা তৈরি করতে পারে। ফলে প্রবাসীদের প্রভাবকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীন করার পরিবর্তে তাদের বহুমাত্রিক সংযোগ ও স্বাধীনতাকে সম্মান করেই অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো বেশি ফলপ্রসূ।

খোলা নেটওয়ার্ক, নতুন প্রভাব

আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দেশগুলো একক উৎসের ওপর নির্ভর করতে চাইবে না। জ্বালানি, প্রযুক্তি, মূলধন, খনিজ ও বাজার—সব ক্ষেত্রেই একাধিক বিকল্পের প্রয়োজন বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে একটি বড় সুযোগ হলো নতুন কোনো একচেটিয়া জোট গড়ে তোলার পরিবর্তে একটি উন্মুক্ত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গঠনে ভূমিকা নেওয়া।

India To Get 23 Waterways & Ports Worth ₹6 Lakh Crores In Future | Curly  Tales

বন্দর, নৌপথ, জ্বালানি করিডর, ডিজিটাল অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্য চুক্তি এখন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এগুলোও কৌশলগত প্রভাবের উৎস। কিন্তু এসব সংযোগকে যদি একটি বন্ধ প্রভাববলয়ে পরিণত করা হয়, তাহলে ভারতের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা কমতে পারে। বরং অন্য দেশগুলোকে ভারতের উত্থানের অংশীদার করে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।

এখানেই ভারতের অর্থনৈতিক উত্থানের স্থায়িত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যদি অন্য দেশগুলোর কাছে শুধু একটি বিশাল বাজার হিসেবে উপস্থিত হয়, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে অসমতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি অংশীদার দেশগুলো ভারতের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে নিজেদের শিল্প, বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা ও বিনিয়োগের সুযোগকে যুক্ত করতে পারে, তাহলে সেই সম্পর্ক অনেক বেশি টেকসই হবে।

গ্লোবাল সাউথে ভারতের পরবর্তী ভূমিকা

গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও ভারতের সামনে একই ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব আন্তর্জাতিক ফোরামে বাড়ানোর দাবি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই শেষ লক্ষ্য হতে পারে না। ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, সরবরাহব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে গড়ে উঠবে—সেখানেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তব অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।

ভারতের নিজের অর্থনৈতিক ইতিহাস এ ক্ষেত্রে একটি শিক্ষা দেয়। তুলনামূলকভাবে বন্ধ অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে দেশটি ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে গভীরতর সংযোগ তৈরি করেছে, একই সঙ্গে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছে। অর্থাৎ উন্মুক্ততা এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতা পরস্পরবিরোধী নয়। সঠিক নীতিতে একটিকে অন্যটির ভিত্তি বানানো সম্ভব।

ডিসেম্বরে মিয়ামিতে জি২০ বৈঠক হলে ভারত এই বিতর্ককে আরও এগিয়ে নিতে পারে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর দাবি শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বেশি প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণে তাদের অংশীদারত্বের প্রশ্নে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

ভারত মহাসাগর ঘিরে আঞ্চলিক অর্থনীতির সম্ভাবনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো যদি আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা, লজিস্টিকস, জ্বালানি, পর্যটন, প্রযুক্তি ও সেবাখাতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে, তাহলে পুরো অঞ্চলই লাভবান হবে।

শেষ পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুযোগ হয়তো অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা নয়, বরং অন্যদের নিজেদের সমৃদ্ধির সঙ্গে ভারতের উত্থানকে যুক্ত করার মতো একটি ব্যবস্থা তৈরি করা। নির্ভরতা থেকে জন্ম নেওয়া প্রভাবের চেয়ে অভিন্ন সমৃদ্ধির ওপর দাঁড়ানো প্রভাব অনেক বেশি স্থায়ী। আগামী পর্বে ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা তাই কতগুলো জোটে সে আছে, তা নয়; বরং কতগুলো দেশের জন্য সে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, সেটিই।

— মিলিন্দা মরাগোদা, পাথফাইন্ডার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও কৌশলগত বিষয়ক থিংক ট্যাংকের সঙ্গে যুক্ত।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার পরের পরীক্ষা: নেতৃত্ব কি নির্ভরতার বদলে পারস্পরিক সমৃদ্ধি আনবে?

ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার পরের পরীক্ষা: নেতৃত্ব কি নির্ভরতার বদলে পারস্পরিক সমৃদ্ধি আনবে?

০৭:০৯:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের স্বাধীনতার আট দশক পূর্তিতে দেশটির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত তার অর্জিত কৌশলগত স্বাধীনতা নিয়ে নয়, বরং এই স্বাধীনতা দিয়ে আগামী দিনে সে কী করতে চায় তা নিয়ে। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কাঠামো দ্রুত বদলেছে। একদিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি, পুঁজি ও সরবরাহব্যবস্থা ক্রমেই ভূরাজনীতির অংশ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় ভারতের জন্য শুধু কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন এমন এক অর্থনৈতিক সম্পর্কব্যবস্থা, যেখানে কোনো একটি দেশ বা শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভারতের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত না হয়।

গত এক দশকে ভারত সেই পথেই এগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক ধরে রেখেছে নয়াদিল্লি। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৃহত্তর ভূমিকার দাবিও জোরালো করেছে ভারত।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নতুন অর্থ

একসময় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বলতে মূলত এমন পররাষ্ট্রনীতি বোঝানো হতো, যেখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগোষ্ঠীর সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়া হবে না যে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা হারাতে হয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সেই স্বাধীনতার ভিত্তি কেবল কূটনীতিতে নেই। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বাধীনতা প্রয়োজন।

এখানে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হতে পারে কৌশলগত পারস্পরিক নির্ভরতা। অর্থাৎ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এতটাই বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাতে কোনো একক অংশীদার, বাজার বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জাতীয় দুর্বলতায় পরিণত না হয়। বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং বহুমুখী সংযোগই হতে পারে ভারতের শক্তি।

ভূগোলও এ ক্ষেত্রে ভারতের বড় সম্পদ। দেশটির অবস্থান তাকে উপসাগরীয় ও পশ্চিম এশিয়া, এশিয়ার উৎপাদনকেন্দ্র, ভারত মহাসাগর পেরিয়ে আফ্রিকা এবং রাশিয়াকেন্দ্রিক ইউরেশীয় অঞ্চলের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সংযোগস্থলে পরিণত করেছে। বিশ্ব যখন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে ক্রমশ খণ্ডিত হচ্ছে, তখন ভারত চাইলে সেই বিভাজনের আরেকটি পক্ষ না হয়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সেতুবন্ধনের ভূমিকা নিতে পারে।

India, Japan set to expand AI and semiconductor partnership |  Communications Today

সম্পর্কের বৈচিত্র্যই ভারতের শক্তি

জাপানের সঙ্গে ভারতের সহযোগিতা এখন আর কেবল কূটনৈতিক অংশীদারত্বে সীমাবদ্ধ নেই। উন্নত উৎপাদন, প্রযুক্তি, জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মতো ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক বিস্তৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, উন্নত উৎপাদন, জ্বালানি ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ছে। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কেও অর্থনীতি ও প্রযুক্তির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক জ্বালানি সম্পর্কও এখন বিনিয়োগ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক পরিসরে নতুন মাত্রা যোগ করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আবার ভারতকে এশিয়ার বৃহত্তর উৎপাদন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করছে।

এই বহুমুখী সম্পর্কের মধ্যে রাশিয়ার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেও ওয়াশিংটন, টোকিও, ইউরোপ ও উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া দেখায় যে ভারত এখনো বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে নিজের জন্য জায়গা তৈরি করতে সক্ষম। এটাই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বাস্তব মূল্য।

চীনকে ঘিরে ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষা

এই সমীকরণে চীন স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে জটিল বিষয়। ভারতের জন্য অতিরিক্ত নির্ভরতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার নীতিও বাস্তবসম্মত নয়। তাই নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা এবং বিকল্প অংশীদার তৈরি করার পাশাপাশি যেখানে স্বার্থের মিল রয়েছে সেখানে যোগাযোগের সুযোগও ধরে রাখতে হবে।

ভারতের আরেকটি বড় শক্তি তার বৈশ্বিক প্রবাসী জনগোষ্ঠী। বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী অর্থনীতি, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি করতে পারে। তবে প্রবাসী সমাজের রাজনৈতিক অবস্থান সবসময় ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে অভিন্ন হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কখনো কখনো তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রবণতা সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও সংবেদনশীলতা তৈরি করতে পারে। ফলে প্রবাসীদের প্রভাবকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীন করার পরিবর্তে তাদের বহুমাত্রিক সংযোগ ও স্বাধীনতাকে সম্মান করেই অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো বেশি ফলপ্রসূ।

খোলা নেটওয়ার্ক, নতুন প্রভাব

আগামী দিনের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দেশগুলো একক উৎসের ওপর নির্ভর করতে চাইবে না। জ্বালানি, প্রযুক্তি, মূলধন, খনিজ ও বাজার—সব ক্ষেত্রেই একাধিক বিকল্পের প্রয়োজন বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে একটি বড় সুযোগ হলো নতুন কোনো একচেটিয়া জোট গড়ে তোলার পরিবর্তে একটি উন্মুক্ত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গঠনে ভূমিকা নেওয়া।

India To Get 23 Waterways & Ports Worth ₹6 Lakh Crores In Future | Curly  Tales

বন্দর, নৌপথ, জ্বালানি করিডর, ডিজিটাল অবকাঠামো, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্য চুক্তি এখন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এগুলোও কৌশলগত প্রভাবের উৎস। কিন্তু এসব সংযোগকে যদি একটি বন্ধ প্রভাববলয়ে পরিণত করা হয়, তাহলে ভারতের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা কমতে পারে। বরং অন্য দেশগুলোকে ভারতের উত্থানের অংশীদার করে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর।

এখানেই ভারতের অর্থনৈতিক উত্থানের স্থায়িত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যদি অন্য দেশগুলোর কাছে শুধু একটি বিশাল বাজার হিসেবে উপস্থিত হয়, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে অসমতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু যদি অংশীদার দেশগুলো ভারতের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে নিজেদের শিল্প, বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা ও বিনিয়োগের সুযোগকে যুক্ত করতে পারে, তাহলে সেই সম্পর্ক অনেক বেশি টেকসই হবে।

গ্লোবাল সাউথে ভারতের পরবর্তী ভূমিকা

গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও ভারতের সামনে একই ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব আন্তর্জাতিক ফোরামে বাড়ানোর দাবি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই শেষ লক্ষ্য হতে পারে না। ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, সরবরাহব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে গড়ে উঠবে—সেখানেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তব অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।

ভারতের নিজের অর্থনৈতিক ইতিহাস এ ক্ষেত্রে একটি শিক্ষা দেয়। তুলনামূলকভাবে বন্ধ অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে দেশটি ধীরে ধীরে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে গভীরতর সংযোগ তৈরি করেছে, একই সঙ্গে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছে। অর্থাৎ উন্মুক্ততা এবং কৌশলগত স্বনির্ভরতা পরস্পরবিরোধী নয়। সঠিক নীতিতে একটিকে অন্যটির ভিত্তি বানানো সম্ভব।

ডিসেম্বরে মিয়ামিতে জি২০ বৈঠক হলে ভারত এই বিতর্ককে আরও এগিয়ে নিতে পারে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর দাবি শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বেশি প্রতিনিধিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণে তাদের অংশীদারত্বের প্রশ্নে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

ভারত মহাসাগর ঘিরে আঞ্চলিক অর্থনীতির সম্ভাবনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো যদি আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা, লজিস্টিকস, জ্বালানি, পর্যটন, প্রযুক্তি ও সেবাখাতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে, তাহলে পুরো অঞ্চলই লাভবান হবে।

শেষ পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুযোগ হয়তো অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা নয়, বরং অন্যদের নিজেদের সমৃদ্ধির সঙ্গে ভারতের উত্থানকে যুক্ত করার মতো একটি ব্যবস্থা তৈরি করা। নির্ভরতা থেকে জন্ম নেওয়া প্রভাবের চেয়ে অভিন্ন সমৃদ্ধির ওপর দাঁড়ানো প্রভাব অনেক বেশি স্থায়ী। আগামী পর্বে ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা তাই কতগুলো জোটে সে আছে, তা নয়; বরং কতগুলো দেশের জন্য সে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে, সেটিই।

— মিলিন্দা মরাগোদা, পাথফাইন্ডার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও কৌশলগত বিষয়ক থিংক ট্যাংকের সঙ্গে যুক্ত।