মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ জোরদার করেছে চীন। মিসর সফরে গিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অঞ্চলটির দেশগুলোকে বাইরের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করার পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
চার বছর পর মধ্যপ্রাচ্যে শি জিনপিংয়ের এই সফর এমন এক সময়ে হলো, যখন দীর্ঘ সংঘাতের কারণে অঞ্চলটির বাণিজ্য ও অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে ভাবছে।
নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণের আহ্বান
কায়রোতে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠকের পর শি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ভাবার আহ্বান জানান।
চীন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে নৌপথের নিরাপত্তা রক্ষায়ও কাজ করতে প্রস্তুত বলে জানান তিনি। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এই বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দুই দেশের নেতারা নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সন্ত্রাসবিরোধী সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। পাশাপাশি তথ্যকেন্দ্র, অর্ধপরিবাহী শিল্প, গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর সরবরাহব্যবস্থা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগে পরস্পরের মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে মিসরের কৌশল
মিসর দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার। ওয়াশিংটনের কাছ থেকে দেশটি প্রতিবছর প্রায় ১৩০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা পায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিসর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতাও দ্রুত বাড়িয়েছে।
শি জিনপিংয়ের সফরকে সেই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট সিসি জানিয়েছেন, বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে থাকায় মিসর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করছে।
চীনের জন্যও মিসরের গুরুত্ব অনেক। দেশটির বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ, মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক প্রভাব এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভূমিকা—সব মিলিয়ে মিসর বেইজিংয়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
সামরিক সহযোগিতাতেও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে দুই দেশ
চীন ও মিসরের সামরিক সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। গত মাসে দুই দেশ যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নেয়। সেখানে চীনের তৈরি যুদ্ধবিমান এবং ফ্রান্সের তৈরি যুদ্ধবিমানের মধ্যে বিরল আকাশযুদ্ধের মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়।
শি জিনপিংয়ের সফরকে ঘিরে কায়রোতেও ছিল ব্যাপক প্রস্তুতি। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক চীনের পতাকা এবং মিসর ও চীনের ঐতিহাসিক স্থাপনার ছবি দিয়ে সাজানো হয়।
সুয়েজ খাল ঘিরে বাড়ছে চীনা বিনিয়োগ
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। সুয়েজ খালের কারণে ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিসর চীনের জন্য বড় একটি বাজার। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই মিসর প্রায় ১০০ কোটি ডলারের নয়, বরং প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য আমদানি করেছে।
২০১৪ সালে সিসির চীন সফর এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির পর মিসরে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশটির বন্দর, সবুজ জ্বালানি, লোহার পাইপ, গাড়ির টায়ার ও উপগ্রহ উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে।

মিসর সরকারের হিসাবে, শুধু সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলেই চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। ওই অঞ্চলে চীনের তৈরি শিল্প এলাকা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি চীনের একটি টায়ার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে একটি বড় উৎপাদন কমপ্লেক্স স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে প্রাথমিক চুক্তি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্যের ইঙ্গিত
শি জিনপিংয়ের মিসর সফর শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ঘটনা নয়; এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই চীন এখন অঞ্চলটিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে।
অন্যদিকে মিসরও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীনসহ অন্যান্য বিশ্বশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করে নিজের কৌশলগত বিকল্প বাড়াতে চাইছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে চীন-মিসর সম্পর্ক আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো ও চীনের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর আহ্বান জানিয়েছেন শি জিনপিং। মিসরের সঙ্গে চীনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কও দ্রুত বাড়ছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















