০১:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হিমালয়ের হিমবাহে দূষণের কালো আস্তরণ, বাড়ছে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রাশিয়ার কারাগার থেকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে তিউনিসীয় তরুণরা, নিয়োগের নেপথ্যে কী? নেপালে ভয়াবহ বন্যায় টেলিযোগাযোগ বিপর্যয়, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের পুরোনো কৌশলই কি ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি? নেপালের বন্যা শুধু দুর্যোগ নয়, জলবায়ু ন্যায়ের কঠিন পরীক্ষা আশির কোঠাতেও মানুষের পাশে, সেবাকেই তারুণ্যের রহস্য বলছেন দুই স্বেচ্ছাসেবী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় কাজ বাড়ছে, কিন্তু বেতন নয়—এশিয়ার তরুণ কর্মীদের নতুন দুশ্চিন্তা গুদামে সার, মাঠে সংকট: বাংলাদেশের বোরো কি বৈশ্বিক সার-যুদ্ধের নতুন ঝুঁকিতে? প্রচলিত পুরুষত্বের ধারণায় বদল, তরুণদের মধ্যে বাড়ছে রক্ষণশীল মানসিকতা হাঁটুন একটু বেশি, বদলে যাবে শহর-জীবন: শুধু শরীর নয়, উপকার হবে মন ও সমাজেরও

ক্যানসারজয়ীদের চিকিৎসা শেষ হলেও কর্মক্ষেত্রে শুরু হয় নতুন লড়াই

ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ হওয়া মানেই সবকিছু আগের মতো হয়ে যাওয়া নয়। অনেক ক্যানসারজয়ীর জন্য চিকিৎসার পর কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসাই হয়ে ওঠে নতুন এক পরীক্ষা। শরীরের ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সহকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কা—সব মিলিয়ে কর্মজীবনে ফেরার পথ অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে।

সিঙ্গাপুরের কয়েকজন ক্যানসারজয়ীর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কর্মক্ষেত্রে সহানুভূতি, খোলামেলা যোগাযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের নমনীয়তা একজন রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কতটা সাহায্য করতে পারে।

চিকিৎসা শেষ, কিন্তু ক্লান্তি থেকে যায়

৪৬ বছর বয়সী প্যাট্রিসিয়া মালাই স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার ও স্তন পুনর্গঠন করান। অস্ত্রোপচারের মাত্র আট সপ্তাহ পর তিনি কাজে ফিরতে চাইলেও দ্রুত বুঝতে পারেন, আগের মতো টানা বৈঠক করা বা একই গতিতে কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

একটি আন্তর্জাতিক জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হিসেবে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, অসুস্থতার কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকা তার নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সহকর্মীদের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই দ্রুত স্বাভাবিক গতিতে ফেরার চাপ অনুভব করছিলেন তিনি।

তবে তার কর্মস্থল বিষয়টি ভিন্নভাবে নেয়। কাজ দেওয়ার আগে সহকর্মীরা জানতে চাইতেন তিনি সেটি করতে পারবেন কি না এবং কত সময় প্রয়োজন। এমনকি অস্ত্রোপচারের পর নিজের চেহারা নিয়ে অস্বস্তি থাকায় অনলাইন বৈঠকে ক্যামেরা চালু করার জন্যও তাকে চাপ দেওয়া হয়নি।

ধীরে ধীরে কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে আগস্ট নাগাদ তিনি প্রায় পুরোপুরি স্বাভাবিক কর্মগতিতে ফিরতে সক্ষম হন।

Cancer treatment brings its own trauma and can cause PTSD | Aeon Essays

সবার অভিজ্ঞতা অবশ্য এতটা ইতিবাচক নয়

১৭ বছর বয়সে দ্বিতীয় পর্যায়ের হজকিন লিম্ফোমায় আক্রান্ত হন ফারিদাহ আহমাদ। চিকিৎসা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশের সময় তিনি দেখেন, ক্যানসারের ইতিহাস অনেক নিয়োগদাতার কাছে তার যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে।

চাকরির সাক্ষাৎকারে তাকে তার দক্ষতা বা অভিজ্ঞতার পাশাপাশি জিজ্ঞেস করা হতো, চিকিৎসার জন্য কত দিন ছুটি লাগবে এবং তিনি কাজের চাপ সামলাতে পারবেন কি না।

চাকরি পাওয়ার পরও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। এক কর্মস্থলে পদোন্নতি থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়, কারণ ব্যবস্থাপনার ধারণা ছিল তিনি হয়তো মানসিক চাপ সামলাতে পারবেন না বা চিকিৎসার কারণে ছুটিতে যেতে পারেন।

বর্তমানে ২৯ বছর বয়সী ফারিদাহ চিকিৎসার পরও ক্লান্তি, স্মৃতির সাময়িক দুর্বলতা এবং হাত-পায়ে অবশভাবের মতো সমস্যায় ভোগেন। তবে তিনি মনে করেন, তাকে আগে থেকেই সীমিত সক্ষমতার মানুষ হিসেবে বিবেচনা করাই তার সবচেয়ে বড় বাধা।

তার ভাষায়, কেউ যদি ধরে নেয় তিনি মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষম, তাহলে ৮০ বা ৯০ শতাংশ সক্ষমতা দেখানোর সুযোগও তিনি পান না।

কর্মস্থলে ফিরে আসা মানেই পুরোপুরি সুস্থ হওয়া নয়

সিঙ্গাপুরের ক্যানসার নিবন্ধনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৪০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ৪ হাজার ৯৯৫টি ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ৩৪ শতাংশ বেশি।

এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, কর্মক্ষম বয়সে ক্যানসার থেকে বেঁচে ফেরা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে চিকিৎসা শেষে তাদের কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

৩৩ বছর বয়সে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন নুরহানা আবদুল গনি। অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার পর কাজে ফেরার অভিজ্ঞতা তার কাছে ছিল অদ্ভুত। কর্মস্থলটি একই ছিল, কিন্তু তিনি নিজেই বদলে গিয়েছিলেন।

Inoperable Cancer and Surgery: What Doctors Check First

আগের মতো শক্তি ও কর্মক্ষমতা ছিল না। চিকিৎসার কারণে তার মনোযোগও কমে গিয়েছিল। কাজ সামলাতে তিনি দায়িত্ব ও সময়সীমার হিসাব লিখে রাখতেন। তবে তার সহকর্মীরা তাকে কম সক্ষম ধরে নিয়ে দায়িত্ব কমিয়ে দেননি। বরং তার ওপর আগের মতো আস্থা রেখেছিলেন।

নুরহানার কাছে বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কারণে একজন মানুষ কী করতে পারবেন না—সেটি ধরে নেওয়ার বদলে তিনি কী করতে পারবেন, সেটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ধীরে ধীরে কাজের সক্ষমতা ফিরে আসে

কনি সেং ২০২০ সালে ৩৬ বছর বয়সে তৃতীয় পর্যায়ের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসা স্থিতিশীল করার জন্য তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষকতার চাকরি থেকে নয় মাস বিনা বেতনে ছুটি নেন।

চিকিৎসার পর সিঙ্গাপুরে ফিরে কর্মজীবন নতুন করে শুরু করার সময় তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, নিয়োগদাতারা তার ক্যানসারের ইতিহাস এবং চলমান চিকিৎসার কথা জানলে চাকরি দেবেন না। তাই চাকরির আবেদনে তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন।

শুরুতে তিনি দিনে মাত্র তিন ঘণ্টা কাজ করতেন। কারণ শরীরের শক্তি তখনও স্বাভাবিক হয়নি। পুরো দিন কাজ করতে পারলেও বাড়ি ফিরে সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব পালনের মতো শক্তি থাকত না।

পরবর্তীতে নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সফটওয়্যার প্রকৌশল বিষয়ে কাজ শুরু করেন। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণকালীন অবস্থায় আবার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দুই স্তন অপসারণের অস্ত্রোপচার করাতে হলেও প্রতিষ্ঠানটি তাকে সহযোগিতা করে।

পরে তিনি নতুন চাকরি পান এবং কর্মক্ষেত্রে ভালো মূল্যায়নও অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন।

ছোট ছোট ব্যবস্থা বড় পার্থক্য গড়ে দেয়

৬৭ বছর বয়সী এলিল মাথিয়ান লক্ষ্মণন মলদ্বার ও অণ্ডকোষের ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছেন। অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও বিকিরণ চিকিৎসার পর তার শরীরে স্থায়ীভাবে মলত্যাগের জন্য কৃত্রিম পথ তৈরি করতে হয়েছে।

কর্মস্থলে ফেরার পর তাকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন হলে বাড়ি থেকে কাজ করার অনুমতিও ছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ছিল কর্মস্থলে তার বিশেষ চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া।

নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন জায়গায় কৃত্রিম পথের ব্যাগ পরিবর্তনের জন্য তাকে বিশেষ ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এই সামান্য ব্যবস্থা তার কর্মস্থলে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।

এ অভিজ্ঞতা দেখায়, ক্যানসারজয়ীদের জন্য সবসময় বড় কোনো সুবিধার প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে নেওয়া ছোট ছোট সিদ্ধান্তই তাদের কাজে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট সহায়তা দিতে পারে।

Life after cancer treatment is different. So are the health needs. |  Knowable Magazine

‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফেরার অর্থ বদলে যায়

২৮ বছর বয়সী এক শিক্ষিকা, যিনি ভিক্টোরিয়া নামে পরিচিত হতে চেয়েছেন, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ত্রিনেত্রীয় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার পর চলতি বছরের জুলাইয়ে তিনি কাজে ফেরেন।

চিকিৎসকের পরামর্শে শুরুতে তাকে অপেক্ষাকৃত কম শারীরিক চাপের কাজ দেওয়া হয়। কারণ তার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং কর্মশক্তি নিয়ে উদ্বেগ ছিল।

কাজে ফেরার আট সপ্তাহ পরও তিনি নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন। কোনো কোনো দিন নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মনে হলেও বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে যেতে পারে।

তার মতে, বাইরে থেকে একজন ক্যানসারজয়ীকে সুস্থ দেখালেও তার চিকিৎসা, ওষুধ, রক্ত পরীক্ষা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চলতে পারে। তাই কাজে ফিরে আসাকে আগের জীবনে ফিরে যাওয়া হিসেবে দেখা ঠিক নয়; এটি বরং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

নিয়োগদাতাদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে

কর্মীদের ক্যানসারের পর কাজে ফেরাতে অনেক প্রতিষ্ঠান বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

এক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী রোনাল্ড সোহ জানান, তার ১৫ বছর ধরে কাজ করা একজন বিক্রয় পরিচালকের চতুর্থ পর্যায়ের নাকের ক্যানসার ধরা পড়ার পর প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসার সময়ও তাকে বেতন দিয়েছে। এমনকি চিকিৎসার প্রাথমিক খরচ সামলাতে সুদমুক্ত ঋণও দিয়েছে।

চিকিৎসার কারণে ওই কর্মী দিনের পর দিন কাজ করতে পারতেন না। ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি হলেও তাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা কখনো বিবেচনা করেননি সোহ।

তার মতে, প্রতিষ্ঠান কর্মীদের যখন কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ায়, তখন কর্মীরাও সুস্থ হয়ে প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।

অন্যদিকে প্যাট্রিসিয়া মালাইয়ের কর্মস্থল তাকে নির্দিষ্ট অফিস সময়ের বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী দূর থেকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। অসুস্থ বোধ করলে বৈঠক বা কাজের সময়ও পরিবর্তন করা যেত।

Menopause & Breast Cancer | Midi Health

এক্ষেত্রে কোনো কঠোর পরিকল্পনা চাপিয়ে না দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তার কী প্রয়োজন। তার শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে কাজের গতি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

আইনি সুরক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে

সিঙ্গাপুরে গুরুতর অসুস্থতার পর কাজে ফেরা কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র-সুবিধা নিশ্চিত করে এমন পূর্ণাঙ্গ আইন বর্তমানে নেই। কর্মীদের অধিকার বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও নির্দেশনার মধ্যে ছড়িয়ে আছে।

সম্প্রতি একটি মামলায় গুরুতর অসুস্থতার পর কর্মস্থলে বাসা থেকে কাজ করার ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধের জেরে এক ক্যানসারজয়ী নারীকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনাল তাকে ২০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়।

এই ঘটনা গুরুতর অসুস্থতার পর কর্মীদের কাজে ফেরানোর ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা ও কর্মীদের দায়িত্ব কতটা স্পষ্ট—সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মীর শারীরিক অবস্থা, কাজের ধরন এবং বাস্তবে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব—এসব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। শুধু কর্মীর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেই সমস্যা নয়; বরং তার চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন ও বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে প্রকৃত আলোচনা না করাই বড় সমস্যা হতে পারে।

নতুন আইনে কিছু সুরক্ষা বাড়তে পারে

সিঙ্গাপুরের কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতার নতুন আইন ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা বাড়বে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন করলেই ক্যানসারজয়ীদের কর্মক্ষেত্রের সব সমস্যা সমাধান হবে না।

কারণ কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসার বিষয়টি শুধু আইনি অধিকারের নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আস্থা, যোগাযোগ, সহানুভূতি, কর্মসংস্কৃতি এবং একজন মানুষের সুস্থ হয়ে ওঠার নিজস্ব গতি।

একজন ক্যানসারজয়ী কোনো দিন ভালো থাকতে পারেন, আবার পরের দিন প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। তাই কাজের সময়, দায়িত্ব ও কর্মদক্ষতার প্রত্যাশায় কিছুটা নমনীয়তা প্রয়োজন হতে পারে।

Who we are - Breast Cancer Foundation (BCF)

কাজ অনেকের কাছে পুনরুদ্ধারের অংশ

স্তন ক্যানসার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহীর মতে, ক্যানসারের পর কাজ একজন মানুষের জীবনে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়। এটি আত্মনির্ভরতা, পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগ, নিয়মিত জীবনযাপন এবং স্বাভাবিকতার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

চিকিৎসা শেষে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসা তাই অনেকের কাছে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পুনরুদ্ধারের মতো।

৩০ বছর বয়সী এক চিকিৎসক, যিনি শুধু ওয়াং নামে পরিচিত হতে চেয়েছেন, স্তন ক্যানসারের অস্ত্রোপচার ও বিকিরণ চিকিৎসার পরও নানা শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়ছেন। তার সরাসরি নিয়োগদাতা কাজে ফেরার সময় নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন এবং তিনি শারীরিকভাবে কতটা কাজ করতে পারেন, তা বোঝার চেষ্টা করেছেন।

তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিভাগের মধ্যে একই ধরনের সহানুভূতি তিনি সবসময় পাননি। পেশাগত যোগ্যতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়াও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার কাছে কাজে ফেরা শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়। ক্যানসারের কারণে থেমে যাওয়া জীবনের একটি অংশ আবার নিজের করে নেওয়ার উপায়।

তিনি মনে করেন, ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়ার সময় কাজ করতে চাওয়াকে অসুবিধা হিসেবে নয়, বরং ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি হিসেবে দেখা উচিত।

ক্যানসারজয়ীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নয়, বরং প্রয়োজন বোঝা, খোলামেলা আলোচনা এবং সম্ভব হলে কিছুটা নমনীয়তাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ চিকিৎসা শেষ হলেও তাদের সুস্থ হয়ে ওঠার পথ অনেক সময় তখনও চলমান থাকে।

ক্যানসার একজন মানুষের জীবনের একটি অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু তার পরিচয় নয়। কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত সেই মানুষটি আর কী করতে পারেন, সেটিকে সামনে আনা—তিনি কী রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেটিকে নয়।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হিমালয়ের হিমবাহে দূষণের কালো আস্তরণ, বাড়ছে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি

ক্যানসারজয়ীদের চিকিৎসা শেষ হলেও কর্মক্ষেত্রে শুরু হয় নতুন লড়াই

১১:৩০:৫৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ হওয়া মানেই সবকিছু আগের মতো হয়ে যাওয়া নয়। অনেক ক্যানসারজয়ীর জন্য চিকিৎসার পর কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসাই হয়ে ওঠে নতুন এক পরীক্ষা। শরীরের ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সহকর্মীদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কা—সব মিলিয়ে কর্মজীবনে ফেরার পথ অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে।

সিঙ্গাপুরের কয়েকজন ক্যানসারজয়ীর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কর্মক্ষেত্রে সহানুভূতি, খোলামেলা যোগাযোগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের নমনীয়তা একজন রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কতটা সাহায্য করতে পারে।

চিকিৎসা শেষ, কিন্তু ক্লান্তি থেকে যায়

৪৬ বছর বয়সী প্যাট্রিসিয়া মালাই স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার ও স্তন পুনর্গঠন করান। অস্ত্রোপচারের মাত্র আট সপ্তাহ পর তিনি কাজে ফিরতে চাইলেও দ্রুত বুঝতে পারেন, আগের মতো টানা বৈঠক করা বা একই গতিতে কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

একটি আন্তর্জাতিক জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হিসেবে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, অসুস্থতার কারণে কাজে অনুপস্থিত থাকা তার নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সহকর্মীদের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই দ্রুত স্বাভাবিক গতিতে ফেরার চাপ অনুভব করছিলেন তিনি।

তবে তার কর্মস্থল বিষয়টি ভিন্নভাবে নেয়। কাজ দেওয়ার আগে সহকর্মীরা জানতে চাইতেন তিনি সেটি করতে পারবেন কি না এবং কত সময় প্রয়োজন। এমনকি অস্ত্রোপচারের পর নিজের চেহারা নিয়ে অস্বস্তি থাকায় অনলাইন বৈঠকে ক্যামেরা চালু করার জন্যও তাকে চাপ দেওয়া হয়নি।

ধীরে ধীরে কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে আগস্ট নাগাদ তিনি প্রায় পুরোপুরি স্বাভাবিক কর্মগতিতে ফিরতে সক্ষম হন।

Cancer treatment brings its own trauma and can cause PTSD | Aeon Essays

সবার অভিজ্ঞতা অবশ্য এতটা ইতিবাচক নয়

১৭ বছর বয়সে দ্বিতীয় পর্যায়ের হজকিন লিম্ফোমায় আক্রান্ত হন ফারিদাহ আহমাদ। চিকিৎসা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশের সময় তিনি দেখেন, ক্যানসারের ইতিহাস অনেক নিয়োগদাতার কাছে তার যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে।

চাকরির সাক্ষাৎকারে তাকে তার দক্ষতা বা অভিজ্ঞতার পাশাপাশি জিজ্ঞেস করা হতো, চিকিৎসার জন্য কত দিন ছুটি লাগবে এবং তিনি কাজের চাপ সামলাতে পারবেন কি না।

চাকরি পাওয়ার পরও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। এক কর্মস্থলে পদোন্নতি থেকে তাকে বাদ দেওয়া হয়, কারণ ব্যবস্থাপনার ধারণা ছিল তিনি হয়তো মানসিক চাপ সামলাতে পারবেন না বা চিকিৎসার কারণে ছুটিতে যেতে পারেন।

বর্তমানে ২৯ বছর বয়সী ফারিদাহ চিকিৎসার পরও ক্লান্তি, স্মৃতির সাময়িক দুর্বলতা এবং হাত-পায়ে অবশভাবের মতো সমস্যায় ভোগেন। তবে তিনি মনে করেন, তাকে আগে থেকেই সীমিত সক্ষমতার মানুষ হিসেবে বিবেচনা করাই তার সবচেয়ে বড় বাধা।

তার ভাষায়, কেউ যদি ধরে নেয় তিনি মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষম, তাহলে ৮০ বা ৯০ শতাংশ সক্ষমতা দেখানোর সুযোগও তিনি পান না।

কর্মস্থলে ফিরে আসা মানেই পুরোপুরি সুস্থ হওয়া নয়

সিঙ্গাপুরের ক্যানসার নিবন্ধনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৪০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ৪ হাজার ৯৯৫টি ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ৩৪ শতাংশ বেশি।

এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, কর্মক্ষম বয়সে ক্যানসার থেকে বেঁচে ফেরা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে চিকিৎসা শেষে তাদের কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

৩৩ বছর বয়সে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন নুরহানা আবদুল গনি। অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার পর কাজে ফেরার অভিজ্ঞতা তার কাছে ছিল অদ্ভুত। কর্মস্থলটি একই ছিল, কিন্তু তিনি নিজেই বদলে গিয়েছিলেন।

Inoperable Cancer and Surgery: What Doctors Check First

আগের মতো শক্তি ও কর্মক্ষমতা ছিল না। চিকিৎসার কারণে তার মনোযোগও কমে গিয়েছিল। কাজ সামলাতে তিনি দায়িত্ব ও সময়সীমার হিসাব লিখে রাখতেন। তবে তার সহকর্মীরা তাকে কম সক্ষম ধরে নিয়ে দায়িত্ব কমিয়ে দেননি। বরং তার ওপর আগের মতো আস্থা রেখেছিলেন।

নুরহানার কাছে বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কারণে একজন মানুষ কী করতে পারবেন না—সেটি ধরে নেওয়ার বদলে তিনি কী করতে পারবেন, সেটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

ধীরে ধীরে কাজের সক্ষমতা ফিরে আসে

কনি সেং ২০২০ সালে ৩৬ বছর বয়সে তৃতীয় পর্যায়ের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসা স্থিতিশীল করার জন্য তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষকতার চাকরি থেকে নয় মাস বিনা বেতনে ছুটি নেন।

চিকিৎসার পর সিঙ্গাপুরে ফিরে কর্মজীবন নতুন করে শুরু করার সময় তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, নিয়োগদাতারা তার ক্যানসারের ইতিহাস এবং চলমান চিকিৎসার কথা জানলে চাকরি দেবেন না। তাই চাকরির আবেদনে তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন।

শুরুতে তিনি দিনে মাত্র তিন ঘণ্টা কাজ করতেন। কারণ শরীরের শক্তি তখনও স্বাভাবিক হয়নি। পুরো দিন কাজ করতে পারলেও বাড়ি ফিরে সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব পালনের মতো শক্তি থাকত না।

পরবর্তীতে নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সফটওয়্যার প্রকৌশল বিষয়ে কাজ শুরু করেন। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণকালীন অবস্থায় আবার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দুই স্তন অপসারণের অস্ত্রোপচার করাতে হলেও প্রতিষ্ঠানটি তাকে সহযোগিতা করে।

পরে তিনি নতুন চাকরি পান এবং কর্মক্ষেত্রে ভালো মূল্যায়নও অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন।

ছোট ছোট ব্যবস্থা বড় পার্থক্য গড়ে দেয়

৬৭ বছর বয়সী এলিল মাথিয়ান লক্ষ্মণন মলদ্বার ও অণ্ডকোষের ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছেন। অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও বিকিরণ চিকিৎসার পর তার শরীরে স্থায়ীভাবে মলত্যাগের জন্য কৃত্রিম পথ তৈরি করতে হয়েছে।

কর্মস্থলে ফেরার পর তাকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন হলে বাড়ি থেকে কাজ করার অনুমতিও ছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ছিল কর্মস্থলে তার বিশেষ চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া।

নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন জায়গায় কৃত্রিম পথের ব্যাগ পরিবর্তনের জন্য তাকে বিশেষ ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। এই সামান্য ব্যবস্থা তার কর্মস্থলে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।

এ অভিজ্ঞতা দেখায়, ক্যানসারজয়ীদের জন্য সবসময় বড় কোনো সুবিধার প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে নেওয়া ছোট ছোট সিদ্ধান্তই তাদের কাজে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট সহায়তা দিতে পারে।

Life after cancer treatment is different. So are the health needs. |  Knowable Magazine

‘স্বাভাবিক’ জীবনে ফেরার অর্থ বদলে যায়

২৮ বছর বয়সী এক শিক্ষিকা, যিনি ভিক্টোরিয়া নামে পরিচিত হতে চেয়েছেন, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ত্রিনেত্রীয় স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার পর চলতি বছরের জুলাইয়ে তিনি কাজে ফেরেন।

চিকিৎসকের পরামর্শে শুরুতে তাকে অপেক্ষাকৃত কম শারীরিক চাপের কাজ দেওয়া হয়। কারণ তার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং কর্মশক্তি নিয়ে উদ্বেগ ছিল।

কাজে ফেরার আট সপ্তাহ পরও তিনি নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছেন। কোনো কোনো দিন নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মনে হলেও বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে যেতে পারে।

তার মতে, বাইরে থেকে একজন ক্যানসারজয়ীকে সুস্থ দেখালেও তার চিকিৎসা, ওষুধ, রক্ত পরীক্ষা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চলতে পারে। তাই কাজে ফিরে আসাকে আগের জীবনে ফিরে যাওয়া হিসেবে দেখা ঠিক নয়; এটি বরং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

নিয়োগদাতাদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে

কর্মীদের ক্যানসারের পর কাজে ফেরাতে অনেক প্রতিষ্ঠান বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

এক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী রোনাল্ড সোহ জানান, তার ১৫ বছর ধরে কাজ করা একজন বিক্রয় পরিচালকের চতুর্থ পর্যায়ের নাকের ক্যানসার ধরা পড়ার পর প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসার সময়ও তাকে বেতন দিয়েছে। এমনকি চিকিৎসার প্রাথমিক খরচ সামলাতে সুদমুক্ত ঋণও দিয়েছে।

চিকিৎসার কারণে ওই কর্মী দিনের পর দিন কাজ করতে পারতেন না। ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি হলেও তাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা কখনো বিবেচনা করেননি সোহ।

তার মতে, প্রতিষ্ঠান কর্মীদের যখন কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ায়, তখন কর্মীরাও সুস্থ হয়ে প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।

অন্যদিকে প্যাট্রিসিয়া মালাইয়ের কর্মস্থল তাকে নির্দিষ্ট অফিস সময়ের বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী দূর থেকে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। অসুস্থ বোধ করলে বৈঠক বা কাজের সময়ও পরিবর্তন করা যেত।

Menopause & Breast Cancer | Midi Health

এক্ষেত্রে কোনো কঠোর পরিকল্পনা চাপিয়ে না দিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তার কী প্রয়োজন। তার শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে কাজের গতি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

আইনি সুরক্ষার প্রশ্নও সামনে এসেছে

সিঙ্গাপুরে গুরুতর অসুস্থতার পর কাজে ফেরা কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র-সুবিধা নিশ্চিত করে এমন পূর্ণাঙ্গ আইন বর্তমানে নেই। কর্মীদের অধিকার বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও নির্দেশনার মধ্যে ছড়িয়ে আছে।

সম্প্রতি একটি মামলায় গুরুতর অসুস্থতার পর কর্মস্থলে বাসা থেকে কাজ করার ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধের জেরে এক ক্যানসারজয়ী নারীকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত ট্রাইব্যুনাল তাকে ২০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়।

এই ঘটনা গুরুতর অসুস্থতার পর কর্মীদের কাজে ফেরানোর ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা ও কর্মীদের দায়িত্ব কতটা স্পষ্ট—সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মীর শারীরিক অবস্থা, কাজের ধরন এবং বাস্তবে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব—এসব বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। শুধু কর্মীর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেই সমস্যা নয়; বরং তার চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন ও বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে প্রকৃত আলোচনা না করাই বড় সমস্যা হতে পারে।

নতুন আইনে কিছু সুরক্ষা বাড়তে পারে

সিঙ্গাপুরের কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতার নতুন আইন ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষা বাড়বে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন করলেই ক্যানসারজয়ীদের কর্মক্ষেত্রের সব সমস্যা সমাধান হবে না।

কারণ কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসার বিষয়টি শুধু আইনি অধিকারের নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আস্থা, যোগাযোগ, সহানুভূতি, কর্মসংস্কৃতি এবং একজন মানুষের সুস্থ হয়ে ওঠার নিজস্ব গতি।

একজন ক্যানসারজয়ী কোনো দিন ভালো থাকতে পারেন, আবার পরের দিন প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন। তাই কাজের সময়, দায়িত্ব ও কর্মদক্ষতার প্রত্যাশায় কিছুটা নমনীয়তা প্রয়োজন হতে পারে।

Who we are - Breast Cancer Foundation (BCF)

কাজ অনেকের কাছে পুনরুদ্ধারের অংশ

স্তন ক্যানসার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহীর মতে, ক্যানসারের পর কাজ একজন মানুষের জীবনে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়। এটি আত্মনির্ভরতা, পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগ, নিয়মিত জীবনযাপন এবং স্বাভাবিকতার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

চিকিৎসা শেষে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসা তাই অনেকের কাছে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় পুনরুদ্ধারের মতো।

৩০ বছর বয়সী এক চিকিৎসক, যিনি শুধু ওয়াং নামে পরিচিত হতে চেয়েছেন, স্তন ক্যানসারের অস্ত্রোপচার ও বিকিরণ চিকিৎসার পরও নানা শারীরিক সমস্যার সঙ্গে লড়ছেন। তার সরাসরি নিয়োগদাতা কাজে ফেরার সময় নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন এবং তিনি শারীরিকভাবে কতটা কাজ করতে পারেন, তা বোঝার চেষ্টা করেছেন।

তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিভাগের মধ্যে একই ধরনের সহানুভূতি তিনি সবসময় পাননি। পেশাগত যোগ্যতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়াও তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তার কাছে কাজে ফেরা শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়। ক্যানসারের কারণে থেমে যাওয়া জীবনের একটি অংশ আবার নিজের করে নেওয়ার উপায়।

তিনি মনে করেন, ক্যানসার থেকে সুস্থ হওয়ার সময় কাজ করতে চাওয়াকে অসুবিধা হিসেবে নয়, বরং ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি হিসেবে দেখা উচিত।

ক্যানসারজয়ীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নয়, বরং প্রয়োজন বোঝা, খোলামেলা আলোচনা এবং সম্ভব হলে কিছুটা নমনীয়তাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ চিকিৎসা শেষ হলেও তাদের সুস্থ হয়ে ওঠার পথ অনেক সময় তখনও চলমান থাকে।

ক্যানসার একজন মানুষের জীবনের একটি অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু তার পরিচয় নয়। কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত সেই মানুষটি আর কী করতে পারেন, সেটিকে সামনে আনা—তিনি কী রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, সেটিকে নয়।