সিঙ্গাপুরকে বিশ্বের অন্যতম পরিকল্পিত ও চলাচলবান্ধব শহর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাস্তার পাশে গাছ, গণপরিবহনকেন্দ্রিক চলাচল এবং পথচারীদের জন্য ছাউনি—সব মিলিয়ে হেঁটে চলার সুযোগ সেখানে যথেষ্ট। তারপরও তীব্র গরম, আর্দ্রতা আর সহজলভ্য গণপরিবহনের কারণে অনেক মানুষ স্বল্প দূরত্বেও হাঁটার বদলে বাস, ট্রেন কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ি বেছে নেন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, হাঁটার জন্য শহর তৈরি করা মানে শুধু ফুটপাত বানানো নয়। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন গন্তব্যে নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও আনন্দদায়কভাবে হেঁটে যাওয়া সম্ভব হয়।
তিন ঘণ্টার হাঁটা থেকে প্রতিদিনের অভ্যাস
সিঙ্গাপুরের বাসিন্দা ক্লারা লিম প্রায় আট বছর আগে প্রতিদিন বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য তিন ঘণ্টা হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পুংগল থেকে তাই সেংয়ের কর্মস্থল পর্যন্ত এই দীর্ঘ পথ অবশ্য অবশ্যই সহজ ছিল না। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে পরিকল্পনাটি বাদ দিতে হয় তাকে।
তবে হাঁটার অভ্যাসটি থেকে যায়। এরপর প্রতিদিন সকালে বাসে চারটি স্টপেজ যাওয়ার বদলে বাড়ি থেকে কাছের গণপরিবহন স্টেশন পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া শুরু করেন তিনি। কাজের বাইরেও সুযোগ পেলেই হাঁটতেন।

বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে সময় কাটানোর পর শহরের ধোবি ঘাট এলাকা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরেছেন এমন ঘটনাও আছে। প্রায় চার ঘণ্টার সেই হাঁটাকেও তিনি উপভোগ করতেন। একবার হাতঘড়িতে নির্দিষ্ট পদক্ষেপের লক্ষ্য পূরণ করতে টানা আট ঘণ্টায় ৫০ হাজার পদক্ষেপও হেঁটেছিলেন।
এখন অবশ্য পরিস্থিতি বদলেছে। তিন মাস বয়সী মেয়ের মা হওয়ায় একা একা হঠাৎ দীর্ঘ পথ হাঁটার সুযোগ কমেছে। তবে প্রতিদিন সকালে মেয়েকে নিয়ে পার্কের পাশের হাঁটার পথে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটেন তিনি। এতে দিনে প্রায় ২০ হাজার পদক্ষেপ পূরণ হয়।
তার কাছে হাঁটা এখন শুধু শরীরচর্চা নয়, নিজের মনকে কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ারও সময়।
হাঁটতে গিয়ে চেনা শহরকে নতুন করে দেখা
আরেক হাঁটাপ্রেমী হং চাও হুই প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটেন। সাধারণত সকাল সাড়ে ৯টার আগে অথবা বিকেল ৫টার পর তিনি হাঁটতে বের হন, যখন তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকে।
২০২২ সাল থেকে নিয়মিত হাঁটতে গিয়ে নিজের আশপাশের এলাকাকেই নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন তিনি। পুরোনো এক সহপাঠীর সাইকেলের দোকান থেকে শুরু করে এলাকার বিড়ালগুলোর প্রিয় বিশ্রামের জায়গা—হাঁটতে না বের হলে এসব হয়তো তার চোখেই পড়ত না।
তার মতে, গাড়ি বা গণপরিবহনে চলার সময় মানুষ প্রায়ই মুঠোফোনের পর্দায় তাকিয়ে থাকে। ফলে যে শহরের মধ্য দিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয় না।

এ কারণে তিনি অনেক সময় গন্তব্যের কয়েকটি স্টেশন আগেই নেমে যান। বাকি পথ হেঁটে যান, যাতে নতুন এলাকা দেখা যায়, মন পরিষ্কার হয় এবং দিনের মধ্যে কিছু অতিরিক্ত শারীরিক চলাচলও হয়ে যায়।
গরম ও আর্দ্রতা বড় বাধা
সিঙ্গাপুরে হাঁটার অবকাঠামো যথেষ্ট উন্নত হলেও হাঁটাকে দৈনন্দিন যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো আবহাওয়া।
প্রখর রোদ, প্রচণ্ড গরম ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে অনেকেই অল্প দূরত্বও হাঁটতে চান না। তার ওপর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস, ট্রেন ও ভবনের সহজলভ্যতা হাঁটার তুলনায় অন্য মাধ্যমকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষায়, এটিই সিঙ্গাপুরের এক ধরনের ‘সুবিধার বৈপরীত্য’। শহরটি এমনভাবে পরিকল্পিত যে মানুষ সহজেই হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে গণপরিবহন এতটাই কার্যকর যে মানুষ সামান্য দূরত্বের জন্যও সেটিই বেছে নেয়।
শুধু ফুটপাত বানালেই হবে না
হাঁটাচলার উপযোগী শহর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। কোথাও বিপজ্জনক মোড়, কোথাও অসমান ফুটপাত, আবার কোথাও পথচারী ও সাইকেলচালকদের জন্য একই পথ ব্যবহারের কারণে তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি।
কিছু এলাকায় পথচারীদের জন্য ছাউনি তৈরি করতে গিয়ে হাঁটার জায়গা আরও সংকুচিত হয়েছে। কোথাও খুঁটি, সিঁড়ি কিংবা সেতুর কাঠামোর কারণে পথ সরু হয়ে গেছে। ব্যস্ত সময়ে এসব জায়গায় পথচারীদের একে অপরকে পাশ কাটিয়ে চলতে হয়, একই সঙ্গে দ্রুতগতির সাইকেল বা ছোট ব্যক্তিগত যানবাহন থেকেও সতর্ক থাকতে হয়।
বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা চলাফেরায় সীমাবদ্ধ মানুষের জন্য কয়েকটি সিঁড়ি বা সামান্য দূরত্বের অতিরিক্ত ঘুরপথও বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
হাঁটার শহর তৈরিতে বড় পরিকল্পনা
সিঙ্গাপুর সরকার দীর্ঘদিন ধরেই গাড়িনির্ভরতা কমিয়ে হাঁটা ও গণপরিবহনকে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছে। ২০১৩ সালে শুরু হওয়া একটি কর্মসূচির মাধ্যমে গণপরিবহনকেন্দ্র ও আবাসিক এলাকা যুক্ত করতে ছাউনিযুক্ত হাঁটার পথ তৈরি করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে প্রায় ১৮৬ কিলোমিটার ছাউনিযুক্ত সংযোগপথ তৈরি হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে আরও ৫০ কিলোমিটার এমন পথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আগামী দিনের পরিকল্পনায় বাসিন্দারা যাতে প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে হেঁটে, সাইকেলে বা অন্য স্বল্প দূরত্বের মাধ্যমে কাছের পাড়া-কেন্দ্রে যেতে পারেন, সেই লক্ষ্যও রয়েছে। বাড়ি থেকে কর্মস্থলে ব্যস্ত সময়ে ৪৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছানোর মতো সংযুক্ত চলাচলব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
মেরিনা সাউথ এলাকাকে এমনভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে বাসিন্দারা ১০ মিনিট হাঁটলেই প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সুবিধা পাবেন।
হাঁটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্য
হাঁটার সবচেয়ে বড় সুফল অবশ্যই শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য। নিয়মিত হাঁটা হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়াতে, রক্তপ্রবাহ উন্নত করতে এবং রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে।
এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। নিয়মিত হাঁটা বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। পর্যাপ্ত শারীরিক সক্রিয়তার সঙ্গে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমার সম্পর্কও দেখা গেছে।
তবে শুধু কতগুলো পদক্ষেপ হাঁটা হলো, সেটিই একমাত্র বিষয় নয়। হাঁটার গতি ও সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। এমন গতিতে হাঁটা ভালো, যাতে কথা বলা যায় কিন্তু গান গাওয়া কঠিন হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, কম হাঁটার উপযোগী এলাকা থেকে বেশি হাঁটার উপযোগী এলাকায় বসবাস শুরু করলে মানুষের দৈনিক পদক্ষেপ গড়ে প্রায় ১ হাজার ১০০টি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

হাঁটা কমাতে পারে একাকিত্বও
হাঁটার সুফল শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাঁটাচলাবান্ধব এলাকা মানুষের মানসিক সুস্থতা বাড়াতে পারে এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্বাভাবিক সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
হাঁটতে হাঁটতে মানুষ দোকানদার, প্রতিবেশী, পরিচিত মুখ কিংবা এলাকার অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে দেখা করে। রাস্তার পাশের গাছপালা, পাখির ডাক কিংবা ছোট দোকান—এসবের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে গাড়ির ভেতর বসে গন্তব্যে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা অনেকটাই ‘এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে যাওয়া’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
অর্থনীতিতেও হাঁটার প্রভাব
হাঁটাচলার উপযোগী শহর পরিবারের পরিবহন ব্যয়ও কমাতে পারে। ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি বাবদ ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
একই সঙ্গে পথচারী বেশি হলে স্থানীয় দোকান, খাবারের দোকান, বাজার ও অন্যান্য ব্যবসায় মানুষের আনাগোনা বাড়ে। গাড়িতে চলা মানুষের তুলনায় হাঁটা মানুষ মাঝপথে কোনো দোকান বা খাবারের জায়গায় থামার সম্ভাবনা বেশি।
ফলে হাঁটাচলার পরিবেশ একটি এলাকার ব্যবসায়িক প্রাণচাঞ্চল্যও বাড়াতে পারে।
সবার জন্য নিরাপদ ও আনন্দদায়ক পথ
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শিশু, তরুণ, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, কম আয়ের পরিবার এবং যারা গাড়ি চালাতে পারেন না বা চান না—তাদের জন্য হাঁটাচলার উপযোগী এলাকা সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা তৈরি করে।

এ কারণে শুধু নতুন ফুটপাত বা ছাউনি তৈরি করলেই হবে না। প্রয়োজন আরও বেশি গাছ ও প্রাকৃতিক ছায়া, পর্যাপ্ত আলো, প্রশস্ত পথ, নিরাপদ পারাপার, পানির ব্যবস্থা এবং সহজে বোঝা যায় এমন পথনির্দেশনা।
সিঙ্গাপুরের আবাসিক ভবনগুলোর নিচের খোলা জায়গাগুলোও হাঁটার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এসব জায়গা দিয়ে সরাসরি এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় মানুষ এসব পথের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না।
হাঁটাকে আবার যাতায়াতের মাধ্যম ভাবতে হবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অবকাঠামোতে নয়, মানুষের চিন্তায় দরকার।
হাঁটাকে শুধু শরীরচর্চা বা বিনোদন হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে দৈনন্দিন যাতায়াতের স্বাভাবিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
অনেক সময় বাসে যেতে যতটা সময় লাগে, হেঁটে যেতে তার চেয়ে মাত্র কয়েক মিনিট বেশি লাগে। তারপরও মানুষ বাস বেছে নেয়। কারণ সুবিধা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও দ্রুততার অভ্যাস তাদের হাঁটা থেকে দূরে রাখে।
অথচ স্বল্প দূরত্বে হাঁটা হলে বাড়তি কোনো খরচ নেই, শরীরও সক্রিয় থাকে এবং নিজের আশপাশকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়।
১৬ বছর বয়সী ইয়েভেট তান এরই মধ্যে এই অভ্যাস গড়ে তুলেছে। স্কুল, পড়াশোনার অতিরিক্ত ক্লাস কিংবা বিপণিবিতান—প্রায় সব জায়গাতেই সে হেঁটে যেতে পছন্দ করে। প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টায় তার প্রায় ২০ হাজার পদক্ষেপ হয়।
তার ভাষায়, একা হাঁটার সময় কেউ বিরক্ত করে না। নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো যায়, চাপ কমে এবং পড়াশোনা ও দিনের কাজ নিয়ে ভাবার সুযোগ হয়।
শহরকে আরও হাঁটাবান্ধব করতে সময় লাগবে। কিন্তু হাঁটা শুরু করার জন্য বড় কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। কাছের গন্তব্যে যাওয়ার সময় শুধু একবার প্রশ্ন করা যেতে পারে—এই পথটুকু কি হেঁটে যাওয়া সম্ভব?
হয়তো সেই ছোট সিদ্ধান্তই শরীর, মন, প্রতিবেশ এবং পুরো শহরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে একটু একটু করে বদলে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















