০১:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হিমালয়ের হিমবাহে দূষণের কালো আস্তরণ, বাড়ছে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রাশিয়ার কারাগার থেকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে তিউনিসীয় তরুণরা, নিয়োগের নেপথ্যে কী? নেপালে ভয়াবহ বন্যায় টেলিযোগাযোগ বিপর্যয়, জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের পুরোনো কৌশলই কি ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি? নেপালের বন্যা শুধু দুর্যোগ নয়, জলবায়ু ন্যায়ের কঠিন পরীক্ষা আশির কোঠাতেও মানুষের পাশে, সেবাকেই তারুণ্যের রহস্য বলছেন দুই স্বেচ্ছাসেবী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় কাজ বাড়ছে, কিন্তু বেতন নয়—এশিয়ার তরুণ কর্মীদের নতুন দুশ্চিন্তা গুদামে সার, মাঠে সংকট: বাংলাদেশের বোরো কি বৈশ্বিক সার-যুদ্ধের নতুন ঝুঁকিতে? প্রচলিত পুরুষত্বের ধারণায় বদল, তরুণদের মধ্যে বাড়ছে রক্ষণশীল মানসিকতা হাঁটুন একটু বেশি, বদলে যাবে শহর-জীবন: শুধু শরীর নয়, উপকার হবে মন ও সমাজেরও

শরীরের গড়ন, বয়স কিংবা লিঙ্গ নয়—সিঙ্গাপুরে নতুন পরিচয় পাচ্ছে পোল নাচ

সিঙ্গাপুরে একসময় পোল নাচের কথা উঠলেই অনেকের চোখে ভেসে উঠত রাতের বিনোদনকেন্দ্রের দৃশ্য। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সেই ধারণাকে পেছনে ফেলে পোল নাচ হয়ে উঠছে শরীরচর্চা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, শারীরিক সক্ষমতা অর্জন এবং বন্ধুত্ব তৈরির একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।

বয়স, শারীরিক গড়ন কিংবা লিঙ্গ—কোনোটিই যে এই চর্চার পথে বাধা নয়, সেটিই নিজেদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেখাচ্ছেন সিঙ্গাপুরের বহু মানুষ।

সহকর্মীদের আমন্ত্রণে শুরু, এখন নিয়মিত পোল নৃত্যশিল্পী

২০১৯ সালে কর্মস্থলের সহকর্মীদের আমন্ত্রণে প্রথমবার পোল নাচের ক্লাসে যোগ দেন ৩২ বছর বয়সী জ্যাসলিন তান। পেশায় তিনি একটি প্রাক্‌বিদ্যালয়ের শিক্ষক। নাচ বা শরীরচর্চার বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা তার ছিল না। বরং পোল নাচ বলতে শুরুতে তারও মনে হয়েছিল, এটি বুঝি পোশাক খুলে নাচার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বিনোদন।

কিন্তু প্রথম ক্লাসেই একটি ছোট সাফল্য তাকে উৎসাহিত করে। পোল ধরে ঘুরতে ঘুরতে পা দিয়ে খুঁটি আঁকড়ে কিছুক্ষণ শরীর ধরে রাখতে পেরেছিলেন তিনি। সেই সামান্য অর্জনই তাকে নিয়মিত অনুশীলনের দিকে নিয়ে যায়।

সাত বছর পর জ্যাসলিন এখন শুধু পোল নাচেই দক্ষ নন, ঝুলন্ত কাপড়ের সাহায্যে শরীরচর্চা এবং ঝুলন্ত ধাতব বৃত্তে কসরতের মতো কঠিন অনুশীলনও করেন। পাশাপাশি একটি নৃত্যকেন্দ্রে খণ্ডকালীন ব্যবস্থাপক হিসেবেও কাজ করছেন।

তবে নিজের অগ্রগতির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে বিদ্রূপও শুনতে হয়েছে। কেউ তাকে আগে ওজন কমানোর পরামর্শ দিয়েছে, কেউ আবার ঠাট্টা করে বলেছে তার ভারে খুঁটি বাঁকছে কিংবা মেঝে ভেঙে যাচ্ছে।

জ্যাসলিনের ভাষায়, অনেকের ধারণা নৃত্যশিল্পী হতে হলে লম্বা, ছিপছিপে এবং আকর্ষণীয় গড়নের অধিকারী হতে হবে।

At 60, this pole-dancing Singaporean influencer is showing how to age well  | South China Morning Post

তবে একই সঙ্গে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য উৎসাহও। বিশেষ করে নিজের মতো বড় গড়নের অনেক নারী তাকে জানিয়েছেন, তার নাচ দেখে তারাও এই চর্চা শুরু করার সাহস পেয়েছেন।

বিদেশের বড় গড়নের পোল নৃত্যশিল্পীদের দেখে জ্যাসলিনও বুঝতে পারেন, এই চর্চায় বড় শরীরের মানুষ থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

৪৭ বছর বয়সে শুরু, ৫৪-তে শিক্ষক

পোল নাচ যে শুধু তরুণদের জন্য নয়, তার উদাহরণ কেলি কোহ।

২০১৯ সালে ৪৭ বছর বয়সে তিনি প্রথম পোল নাচ শুরু করেন। তার আগে দৌড়ানোই ছিল প্রধান শরীরচর্চা। শক্তি বাড়ানোর অনুশীলনের সঙ্গে তেমন পরিচয় ছিল না তার।

জীবনের চল্লিশের দশকে এসে তিনি এমন একটি শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হন, যার কারণে শরীর সক্রিয় রাখার প্রয়োজন আরও বেশি অনুভব করেন। একই সময়ে মেনোপজের মধ্যেও প্রবেশ করেন তিনি। তখন নতুন ধরনের শরীরচর্চার সন্ধান করতে গিয়ে পোল নাচের সঙ্গে পরিচয়।

প্রথম ক্লাসটি তার কাছে ছিল যথেষ্ট ভীতিকর। অন্য শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই ছিলেন অনেক কম বয়সী। ফলে মনে হচ্ছিল, সবাই যেন তার চেয়ে অনেক ভালো পারছেন।

তবু থেমে যাননি কেলি। নিয়মিত অনুশীলনের ফলে ধীরে ধীরে শরীরের শক্তি বাড়তে থাকে। পেশির গঠনেও পরিবর্তন দেখতে পান তিনি।

সাত বছর পর সেই শিক্ষার্থীই এখন পোল নাচের শিক্ষক। ৫৪ বছর বয়সে তিনি ঝুলন্ত বৃত্তের ওপর উল্টো অবস্থায় বিভক্ত পা ধরে রাখার মতো কঠিন কসরত করতে পারেন।

নিজের এই সক্ষমতায় গর্বিত কেলি মনে করেন, তার তরুণ বয়সের নিজেকে যদি আজকের তাকে দেখানো যেত, তাহলে সে কখনোই বিশ্বাস করত না যে একদিন এমন কিছু করতে পারবেন।

More men in Singapore turning to pole dancing for fitness despite stigma -  Yahoo News Singapore

পুরুষদের জন্যও বদলেছে ধারণা

পোল নাচের সঙ্গে পুরুষদের সম্পর্ক নিয়েও সিঙ্গাপুরে ধারণা বদলাচ্ছে।

৩৩ বছর বয়সী লুইস সু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই চর্চার সঙ্গে যুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৃত্যশিল্পীদের কঠিন ও মাধ্যাকর্ষণকে যেন অস্বীকার করা কসরত দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়।

প্রথম ক্লাসে তিনি ছিলেন মাত্র দুজন পুরুষ শিক্ষার্থীর একজন। কিন্তু সহপাঠীদের উৎসাহ তাকে দ্রুত স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেয়। পরিবারও তাকে শুরু থেকেই সমর্থন করেছে। তার আগ্রহ দেখে বাবা বাড়িতে অনুশীলনের জন্য একটি পোলও কিনে দিয়েছিলেন।

তবে লুইস বুঝতে পেরেছিলেন, সবার পরিবার বা পরিচিতজন পোল নাচকে একইভাবে গ্রহণ করে না। অনেক শিক্ষার্থীই নাকি বাবা-মা কিংবা বন্ধুদের কাছ থেকে নিজেদের এই চর্চার কথা গোপন রাখতেন।

লুইসের নিজেরও শরীর নিয়ে সংকোচ ছিল। পোল নাচের অনেক কসরতে খুঁটির সঙ্গে সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শ প্রয়োজন হয়। অথচ শরীর বেশি প্রকাশ করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না।

একবার বাইরে প্রদর্শনের সময় পোশাকের কারণে খুঁটিতে ঠিকমতো আঁকড়ে থাকতে না পেরে পিছলে যান তিনি। সেই ঘটনার পর বুঝতে পারেন, নিজের অস্বস্তির চেয়ে নিরাপদভাবে কসরত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৯ সালে তিনি নিজের প্রথম নৃত্যকেন্দ্র খুলে ফেলেন। এখন তিনি সিঙ্গাপুরের একমাত্র পুরুষ পোল নৃত্যকেন্দ্রের মালিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুসারীর সংখ্যাও এক লাখের বেশি।

আর ক্ষণস্থায়ী ফ্যাশন নয়

এক দশকেরও বেশি আগে লুইস যখন পোল নাচ শুরু করেছিলেন, তখন সিঙ্গাপুরে এটি ছিল বেশ অপরিচিত বিষয়। অনেকে অবাক হয়ে জানতে চাইতেন, সত্যিই কি সিঙ্গাপুরে এমন নাচ হয়? পুরুষরাও কি এতে অংশ নেন?

More men in Singapore turning to pole dancing for fitness despite stigma -  Yahoo News Singapore

 

তখন তার ধারণা ছিল, দেশটিতে মাত্র কয়েকটি পোল নৃত্যকেন্দ্র রয়েছে। এখন বড় নৃত্যকেন্দ্রের পাশাপাশি ছোট ছোট অনুশীলনস্থলও গড়ে উঠেছে। এতগুলো কেন্দ্র হয়েছে যে তার হিসাব রাখাও কঠিন হয়ে গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে পোল নাচ সম্পর্কে মানুষের পরিচিতিও বেড়েছে। কেউ ভিডিও দেখে আগ্রহী হচ্ছেন, কেউ বন্ধুর কাছ থেকে শুনে শুরু করছেন। একই সঙ্গে এর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি, কৌশল ও দীর্ঘ অনুশীলনের বিষয়টিও মানুষ বুঝতে শুরু করেছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই চর্চা টিকে থাকার পেছনে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—নতুন কিছু শেখার চ্যালেঞ্জ, নিজের অগ্রগতি দেখার সুযোগ এবং একটি সামাজিক পরিবেশ।

একজন শিক্ষার্থী নতুন নতুন কসরত আয়ত্ত করতে পারেন, নিজের শারীরিক ও সৃজনশীল সক্ষমতা প্রকাশ করতে পারেন এবং একই সঙ্গে অন্যদের সঙ্গে বন্ধুত্বও তৈরি করতে পারেন।

বড় শরীরের মানুষদের জন্যও জায়গা আছে

২৬ বছর বয়সী শাহরাজাদ লোগান চার বছর ধরে পোল নাচ করছেন। তার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল সার্কাসের কসরত দেখে। আগে তিনি আধুনিক নৃত্য, ব্যালে ও জ্যাজ নৃত্য শিখেছিলেন।

ঝুলন্ত দড়ি ও অন্যান্য কসরতের প্রতিও তার আগ্রহ ছিল। কিন্তু বেশি উচ্চতায় অনুশীলন করার বিষয়টি তাকে ভয় দেখাত। পোল নাচ তার কাছে তাই মাঝামাঝি একটি পথ মনে হয়।

তবু শুরু করার আগে তার দ্বিধা ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এমন মন্তব্য দেখেছিলেন, যেখানে বড় গড়নের মানুষকে পোল নাচের জন্য উপযুক্ত নয় বলে মন্তব্য করা হতো।

শেষ পর্যন্ত যখন তিনি ক্লাসে যোগ দেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়। অন্য শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তার বিষয়ে একে অন্যকে নজরে রাখতেন এবং নতুনদের কঠিন কসরত শেখাতেও সাহায্য করতেন।

এখন শাহরাজাদ নিয়মিত বন্ধু ও সহকর্মীদের পোল নাচের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এমনকি মায়ের সঙ্গেও বিশেষ একটি ক্লাসে অংশ নিয়েছেন।

তার উপলব্ধি খুব সরল—প্রথমে মানুষকে এই চর্চার অভিনবত্ব আকৃষ্ট করে, কিন্তু মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখে এর সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক।

Women in Singapore are embracing pole dancing

পুরোনো ধারণা এখনো পুরোপুরি যায়নি

পোল নাচ নিয়ে গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও পুরোনো কিছু ধারণা এখনো রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ধারণাটি হলো, পোল নাচ মানেই পোশাক খুলে নাচা।

আধুনিক পোল নাচের বিকাশে যৌন আবেদননির্ভর নৃত্যের ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকলেও বর্তমানে এটি অনেক দূর এগিয়েছে। শরীরচর্চার অন্যান্য মাধ্যমের মতোই শক্তি, নমনীয়তা, ভারসাম্য ও কৌশল বাড়ানোর একটি পদ্ধতি হিসেবে এটি চর্চা করা হচ্ছে।

তবে এই ভুল ধারণার কারণে এখনো কেউ কেউ পরিবার ও আত্মীয়দের কাছ থেকে নিজের পোল নাচের বিষয়টি গোপন রাখেন।

ত্রিশের কোঠায় থাকা হানি নামের এক পোল নৃত্যশিল্পী জানান, বন্ধুরা মোটামুটি বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিলেও কেউ কেউ এখনো মনে করেন তিনি বুঝি শুধু অন্তর্বাস পরে নাচেন।

বাস্তবে পোল নাচের সময় শরীরের ত্বক খুঁটির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ ত্বকের ঘর্ষণই অনেক কসরতে শরীরকে নিরাপদে ধরে রাখতে সাহায্য করে।

শিশুদের সঙ্গে কাজ করা শিক্ষক হিসেবে হানির পোল নাচের প্রতি আগ্রহও অনেককে অবাক করে। কারণ সমাজে শিক্ষকদের বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষকদের শান্ত, সংযত ও গুরুগম্ভীর হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে।

কিন্তু তার কাছে পোল নাচ নিজের এমন একটি দিক প্রকাশের সুযোগ, যা ব্যক্তিগত জীবনের অন্য মানুষরা সাধারণত দেখতে পান না।

More men in Singapore turning to pole dancing for fitness despite stigma -  Yahoo News Singapore

বয়স নয়, সাহসটাই বড় কথা

পোল নাচকে তরুণদের চর্চা মনে করার প্রবণতাও এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রশিক্ষকদের মতে, বয়স বাড়লেও এই চর্চা করা সম্ভব। এমনকি ৮২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীও রয়েছেন।

অনেক মানুষ শারীরিকভাবে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নের চেয়ে বেশি ভয় পান—তারা সেখানে গিয়ে বেমানান হয়ে পড়বেন কি না।

অপরিচিত কোনো শরীরচর্চা শুরু করাই যখন ভীতিকর, তার সঙ্গে সামাজিক কুসংস্কার যুক্ত হলে দ্বিধা আরও বাড়ে।

কিন্তু সিঙ্গাপুরের পোল নাচের সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, শুরু করার জন্য তরুণ, শক্তিশালী, নমনীয় কিংবা নৃত্যের পূর্বঅভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজন শুধু নতুন কিছু চেষ্টা করার ইচ্ছা।

পোল নাচ তাই ধীরে ধীরে শরীরের গড়ন, বয়স ও লিঙ্গের প্রচলিত সীমারেখা ভেঙে একটি বৃহত্তর শরীরচর্চার রূপ নিচ্ছে। এখানে লক্ষ্য শুধু দেখতে সুন্দর হওয়া নয়; বরং নিজের শরীরকে নতুনভাবে চেনা, শক্তি বাড়ানো এবং নিজের ওপর বিশ্বাস তৈরি করাও এর বড় অংশ।

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হিমালয়ের হিমবাহে দূষণের কালো আস্তরণ, বাড়ছে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি

শরীরের গড়ন, বয়স কিংবা লিঙ্গ নয়—সিঙ্গাপুরে নতুন পরিচয় পাচ্ছে পোল নাচ

১১:৪৬:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিঙ্গাপুরে একসময় পোল নাচের কথা উঠলেই অনেকের চোখে ভেসে উঠত রাতের বিনোদনকেন্দ্রের দৃশ্য। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সেই ধারণাকে পেছনে ফেলে পোল নাচ হয়ে উঠছে শরীরচর্চা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, শারীরিক সক্ষমতা অর্জন এবং বন্ধুত্ব তৈরির একটি জনপ্রিয় মাধ্যম।

বয়স, শারীরিক গড়ন কিংবা লিঙ্গ—কোনোটিই যে এই চর্চার পথে বাধা নয়, সেটিই নিজেদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেখাচ্ছেন সিঙ্গাপুরের বহু মানুষ।

সহকর্মীদের আমন্ত্রণে শুরু, এখন নিয়মিত পোল নৃত্যশিল্পী

২০১৯ সালে কর্মস্থলের সহকর্মীদের আমন্ত্রণে প্রথমবার পোল নাচের ক্লাসে যোগ দেন ৩২ বছর বয়সী জ্যাসলিন তান। পেশায় তিনি একটি প্রাক্‌বিদ্যালয়ের শিক্ষক। নাচ বা শরীরচর্চার বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা তার ছিল না। বরং পোল নাচ বলতে শুরুতে তারও মনে হয়েছিল, এটি বুঝি পোশাক খুলে নাচার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বিনোদন।

কিন্তু প্রথম ক্লাসেই একটি ছোট সাফল্য তাকে উৎসাহিত করে। পোল ধরে ঘুরতে ঘুরতে পা দিয়ে খুঁটি আঁকড়ে কিছুক্ষণ শরীর ধরে রাখতে পেরেছিলেন তিনি। সেই সামান্য অর্জনই তাকে নিয়মিত অনুশীলনের দিকে নিয়ে যায়।

সাত বছর পর জ্যাসলিন এখন শুধু পোল নাচেই দক্ষ নন, ঝুলন্ত কাপড়ের সাহায্যে শরীরচর্চা এবং ঝুলন্ত ধাতব বৃত্তে কসরতের মতো কঠিন অনুশীলনও করেন। পাশাপাশি একটি নৃত্যকেন্দ্রে খণ্ডকালীন ব্যবস্থাপক হিসেবেও কাজ করছেন।

তবে নিজের অগ্রগতির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে গিয়ে তাকে বিদ্রূপও শুনতে হয়েছে। কেউ তাকে আগে ওজন কমানোর পরামর্শ দিয়েছে, কেউ আবার ঠাট্টা করে বলেছে তার ভারে খুঁটি বাঁকছে কিংবা মেঝে ভেঙে যাচ্ছে।

জ্যাসলিনের ভাষায়, অনেকের ধারণা নৃত্যশিল্পী হতে হলে লম্বা, ছিপছিপে এবং আকর্ষণীয় গড়নের অধিকারী হতে হবে।

At 60, this pole-dancing Singaporean influencer is showing how to age well  | South China Morning Post

তবে একই সঙ্গে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য উৎসাহও। বিশেষ করে নিজের মতো বড় গড়নের অনেক নারী তাকে জানিয়েছেন, তার নাচ দেখে তারাও এই চর্চা শুরু করার সাহস পেয়েছেন।

বিদেশের বড় গড়নের পোল নৃত্যশিল্পীদের দেখে জ্যাসলিনও বুঝতে পারেন, এই চর্চায় বড় শরীরের মানুষ থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

৪৭ বছর বয়সে শুরু, ৫৪-তে শিক্ষক

পোল নাচ যে শুধু তরুণদের জন্য নয়, তার উদাহরণ কেলি কোহ।

২০১৯ সালে ৪৭ বছর বয়সে তিনি প্রথম পোল নাচ শুরু করেন। তার আগে দৌড়ানোই ছিল প্রধান শরীরচর্চা। শক্তি বাড়ানোর অনুশীলনের সঙ্গে তেমন পরিচয় ছিল না তার।

জীবনের চল্লিশের দশকে এসে তিনি এমন একটি শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হন, যার কারণে শরীর সক্রিয় রাখার প্রয়োজন আরও বেশি অনুভব করেন। একই সময়ে মেনোপজের মধ্যেও প্রবেশ করেন তিনি। তখন নতুন ধরনের শরীরচর্চার সন্ধান করতে গিয়ে পোল নাচের সঙ্গে পরিচয়।

প্রথম ক্লাসটি তার কাছে ছিল যথেষ্ট ভীতিকর। অন্য শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই ছিলেন অনেক কম বয়সী। ফলে মনে হচ্ছিল, সবাই যেন তার চেয়ে অনেক ভালো পারছেন।

তবু থেমে যাননি কেলি। নিয়মিত অনুশীলনের ফলে ধীরে ধীরে শরীরের শক্তি বাড়তে থাকে। পেশির গঠনেও পরিবর্তন দেখতে পান তিনি।

সাত বছর পর সেই শিক্ষার্থীই এখন পোল নাচের শিক্ষক। ৫৪ বছর বয়সে তিনি ঝুলন্ত বৃত্তের ওপর উল্টো অবস্থায় বিভক্ত পা ধরে রাখার মতো কঠিন কসরত করতে পারেন।

নিজের এই সক্ষমতায় গর্বিত কেলি মনে করেন, তার তরুণ বয়সের নিজেকে যদি আজকের তাকে দেখানো যেত, তাহলে সে কখনোই বিশ্বাস করত না যে একদিন এমন কিছু করতে পারবেন।

More men in Singapore turning to pole dancing for fitness despite stigma -  Yahoo News Singapore

পুরুষদের জন্যও বদলেছে ধারণা

পোল নাচের সঙ্গে পুরুষদের সম্পর্ক নিয়েও সিঙ্গাপুরে ধারণা বদলাচ্ছে।

৩৩ বছর বয়সী লুইস সু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই চর্চার সঙ্গে যুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৃত্যশিল্পীদের কঠিন ও মাধ্যাকর্ষণকে যেন অস্বীকার করা কসরত দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়।

প্রথম ক্লাসে তিনি ছিলেন মাত্র দুজন পুরুষ শিক্ষার্থীর একজন। কিন্তু সহপাঠীদের উৎসাহ তাকে দ্রুত স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেয়। পরিবারও তাকে শুরু থেকেই সমর্থন করেছে। তার আগ্রহ দেখে বাবা বাড়িতে অনুশীলনের জন্য একটি পোলও কিনে দিয়েছিলেন।

তবে লুইস বুঝতে পেরেছিলেন, সবার পরিবার বা পরিচিতজন পোল নাচকে একইভাবে গ্রহণ করে না। অনেক শিক্ষার্থীই নাকি বাবা-মা কিংবা বন্ধুদের কাছ থেকে নিজেদের এই চর্চার কথা গোপন রাখতেন।

লুইসের নিজেরও শরীর নিয়ে সংকোচ ছিল। পোল নাচের অনেক কসরতে খুঁটির সঙ্গে সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শ প্রয়োজন হয়। অথচ শরীর বেশি প্রকাশ করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না।

একবার বাইরে প্রদর্শনের সময় পোশাকের কারণে খুঁটিতে ঠিকমতো আঁকড়ে থাকতে না পেরে পিছলে যান তিনি। সেই ঘটনার পর বুঝতে পারেন, নিজের অস্বস্তির চেয়ে নিরাপদভাবে কসরত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২০১৯ সালে তিনি নিজের প্রথম নৃত্যকেন্দ্র খুলে ফেলেন। এখন তিনি সিঙ্গাপুরের একমাত্র পুরুষ পোল নৃত্যকেন্দ্রের মালিক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুসারীর সংখ্যাও এক লাখের বেশি।

আর ক্ষণস্থায়ী ফ্যাশন নয়

এক দশকেরও বেশি আগে লুইস যখন পোল নাচ শুরু করেছিলেন, তখন সিঙ্গাপুরে এটি ছিল বেশ অপরিচিত বিষয়। অনেকে অবাক হয়ে জানতে চাইতেন, সত্যিই কি সিঙ্গাপুরে এমন নাচ হয়? পুরুষরাও কি এতে অংশ নেন?

More men in Singapore turning to pole dancing for fitness despite stigma -  Yahoo News Singapore

 

তখন তার ধারণা ছিল, দেশটিতে মাত্র কয়েকটি পোল নৃত্যকেন্দ্র রয়েছে। এখন বড় নৃত্যকেন্দ্রের পাশাপাশি ছোট ছোট অনুশীলনস্থলও গড়ে উঠেছে। এতগুলো কেন্দ্র হয়েছে যে তার হিসাব রাখাও কঠিন হয়ে গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে পোল নাচ সম্পর্কে মানুষের পরিচিতিও বেড়েছে। কেউ ভিডিও দেখে আগ্রহী হচ্ছেন, কেউ বন্ধুর কাছ থেকে শুনে শুরু করছেন। একই সঙ্গে এর জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি, কৌশল ও দীর্ঘ অনুশীলনের বিষয়টিও মানুষ বুঝতে শুরু করেছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই চর্চা টিকে থাকার পেছনে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—নতুন কিছু শেখার চ্যালেঞ্জ, নিজের অগ্রগতি দেখার সুযোগ এবং একটি সামাজিক পরিবেশ।

একজন শিক্ষার্থী নতুন নতুন কসরত আয়ত্ত করতে পারেন, নিজের শারীরিক ও সৃজনশীল সক্ষমতা প্রকাশ করতে পারেন এবং একই সঙ্গে অন্যদের সঙ্গে বন্ধুত্বও তৈরি করতে পারেন।

বড় শরীরের মানুষদের জন্যও জায়গা আছে

২৬ বছর বয়সী শাহরাজাদ লোগান চার বছর ধরে পোল নাচ করছেন। তার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল সার্কাসের কসরত দেখে। আগে তিনি আধুনিক নৃত্য, ব্যালে ও জ্যাজ নৃত্য শিখেছিলেন।

ঝুলন্ত দড়ি ও অন্যান্য কসরতের প্রতিও তার আগ্রহ ছিল। কিন্তু বেশি উচ্চতায় অনুশীলন করার বিষয়টি তাকে ভয় দেখাত। পোল নাচ তার কাছে তাই মাঝামাঝি একটি পথ মনে হয়।

তবু শুরু করার আগে তার দ্বিধা ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এমন মন্তব্য দেখেছিলেন, যেখানে বড় গড়নের মানুষকে পোল নাচের জন্য উপযুক্ত নয় বলে মন্তব্য করা হতো।

শেষ পর্যন্ত যখন তিনি ক্লাসে যোগ দেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়। অন্য শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তার বিষয়ে একে অন্যকে নজরে রাখতেন এবং নতুনদের কঠিন কসরত শেখাতেও সাহায্য করতেন।

এখন শাহরাজাদ নিয়মিত বন্ধু ও সহকর্মীদের পোল নাচের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এমনকি মায়ের সঙ্গেও বিশেষ একটি ক্লাসে অংশ নিয়েছেন।

তার উপলব্ধি খুব সরল—প্রথমে মানুষকে এই চর্চার অভিনবত্ব আকৃষ্ট করে, কিন্তু মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখে এর সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক।

Women in Singapore are embracing pole dancing

পুরোনো ধারণা এখনো পুরোপুরি যায়নি

পোল নাচ নিয়ে গ্রহণযোগ্যতা বাড়লেও পুরোনো কিছু ধারণা এখনো রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ধারণাটি হলো, পোল নাচ মানেই পোশাক খুলে নাচা।

আধুনিক পোল নাচের বিকাশে যৌন আবেদননির্ভর নৃত্যের ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকলেও বর্তমানে এটি অনেক দূর এগিয়েছে। শরীরচর্চার অন্যান্য মাধ্যমের মতোই শক্তি, নমনীয়তা, ভারসাম্য ও কৌশল বাড়ানোর একটি পদ্ধতি হিসেবে এটি চর্চা করা হচ্ছে।

তবে এই ভুল ধারণার কারণে এখনো কেউ কেউ পরিবার ও আত্মীয়দের কাছ থেকে নিজের পোল নাচের বিষয়টি গোপন রাখেন।

ত্রিশের কোঠায় থাকা হানি নামের এক পোল নৃত্যশিল্পী জানান, বন্ধুরা মোটামুটি বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিলেও কেউ কেউ এখনো মনে করেন তিনি বুঝি শুধু অন্তর্বাস পরে নাচেন।

বাস্তবে পোল নাচের সময় শরীরের ত্বক খুঁটির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকা প্রয়োজন হতে পারে। কারণ ত্বকের ঘর্ষণই অনেক কসরতে শরীরকে নিরাপদে ধরে রাখতে সাহায্য করে।

শিশুদের সঙ্গে কাজ করা শিক্ষক হিসেবে হানির পোল নাচের প্রতি আগ্রহও অনেককে অবাক করে। কারণ সমাজে শিক্ষকদের বিশেষ করে শিশুদের শিক্ষকদের শান্ত, সংযত ও গুরুগম্ভীর হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে।

কিন্তু তার কাছে পোল নাচ নিজের এমন একটি দিক প্রকাশের সুযোগ, যা ব্যক্তিগত জীবনের অন্য মানুষরা সাধারণত দেখতে পান না।

More men in Singapore turning to pole dancing for fitness despite stigma -  Yahoo News Singapore

বয়স নয়, সাহসটাই বড় কথা

পোল নাচকে তরুণদের চর্চা মনে করার প্রবণতাও এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রশিক্ষকদের মতে, বয়স বাড়লেও এই চর্চা করা সম্ভব। এমনকি ৮২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীও রয়েছেন।

অনেক মানুষ শারীরিকভাবে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নের চেয়ে বেশি ভয় পান—তারা সেখানে গিয়ে বেমানান হয়ে পড়বেন কি না।

অপরিচিত কোনো শরীরচর্চা শুরু করাই যখন ভীতিকর, তার সঙ্গে সামাজিক কুসংস্কার যুক্ত হলে দ্বিধা আরও বাড়ে।

কিন্তু সিঙ্গাপুরের পোল নাচের সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, শুরু করার জন্য তরুণ, শক্তিশালী, নমনীয় কিংবা নৃত্যের পূর্বঅভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজন শুধু নতুন কিছু চেষ্টা করার ইচ্ছা।

পোল নাচ তাই ধীরে ধীরে শরীরের গড়ন, বয়স ও লিঙ্গের প্রচলিত সীমারেখা ভেঙে একটি বৃহত্তর শরীরচর্চার রূপ নিচ্ছে। এখানে লক্ষ্য শুধু দেখতে সুন্দর হওয়া নয়; বরং নিজের শরীরকে নতুনভাবে চেনা, শক্তি বাড়ানো এবং নিজের ওপর বিশ্বাস তৈরি করাও এর বড় অংশ।