ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলা আরও তীব্র হওয়ায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, মঙ্গলবার রাতে দেশজুড়ে মার্কিন হামলায় ১৮ জন নিহত ও ১০৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে থাকা চারজনও রয়েছেন।
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় হতাহত
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির উপকূলের কাছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলায় চারজন নিহত এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন। হামলার পর ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করেও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই ঘটনার পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বেসামরিক মানুষের হতাহতের খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করে কূটনৈতিক পথে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে যেকোনো হামলার নিন্দা করা হয়। সংঘাতের সব পক্ষকেই আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলতে হবে এবং হামলার ক্ষেত্রে বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য, আনুপাতিকতা ও সতর্কতার নীতি অনুসরণ করতে হবে।

হামলার দায় অস্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেছেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থেকে আসা বেসামরিক হতাহতের প্রতিবেদন সম্পর্কে তারা অবগত।
ইরানের দাবি অনুযায়ী সাম্প্রতিক হামলায় নিহতদের সংখ্যা দেশটিতে চলমান যুদ্ধের মোট প্রাণহানির সঙ্গে যোগ হবে। এর আগে একটি স্বাধীন ইরানি মানবাধিকার সংগঠনের হিসাবে, ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ইরানে ৩ হাজার ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক ছিলেন।
স্কুলে হামলার স্মৃতিও ফিরে এসেছে
বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনা যুদ্ধের প্রথম দিকে মিনাবের একটি মেয়েদের স্কুলে ভয়াবহ বিস্ফোরণের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। ওই ঘটনায় ১৬০ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মিনাবের ওই হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ হয়নি। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরোনো লক্ষ্যবস্তুর তথ্য ব্যবহারের কারণে হামলাটি হয়ে থাকতে পারে। মার্কিন কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য তদন্তের ফল প্রকাশের দাবি জানালেও এখনো তাঁদের কাছে প্রতিবেদনটি দেওয়া হয়নি।
পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা
সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পর ইরান বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাকে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে। কুয়েতের সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার ভোরেও নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন বিমান হামলার কথা জানিয়েছে। দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেগুলো প্রতিহত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

জুলাইয়ের আগের সংঘাতের পর বেশ কিছুদিন সামরিক তৎপরতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এর মধ্যে শান্তি আলোচনা এগোয়নি। এখন আবার সংঘাত বাড়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়েছেন। তবে নিজ দেশে যুদ্ধটি জনপ্রিয় নয় এবং এর প্রভাবে জ্বালানির দামও বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে চাপ
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোকেও হুমকি দিয়েছে। ইরানের অনুমতি ছাড়া ওই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকির ফলে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইরান সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়লেও এখনো কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের অভ্যন্তরে যুদ্ধের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে আগামী দিনে সংঘাত আরও বাড়বে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















