মহাকাশকে ঘিরে সামরিক প্রতিযোগিতা দ্রুত নতুন মাত্রা পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন এমন এক সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার বিস্তৃতি পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মহাকাশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। দুই দেশই এমন প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে, যার মাধ্যমে শত্রুর উপগ্রহ শনাক্ত, অনুসরণ, বাধাগ্রস্ত, এমনকি দখলও করা সম্ভব হতে পারে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন তথ্য, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ-সংক্রান্ত উপাত্ত, গবেষণাপত্র, পেটেন্ট নথি ও সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এই প্রতিযোগিতার চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে উপগ্রহ এখন আর শুধু যোগাযোগ, নেভিগেশন বা গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যম নয়; এগুলো ক্রমেই সক্রিয় সামরিক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে।
চীনের গোপন মহাকাশযানের রহস্যময় তৎপরতা
জুনে চীনের একটি গোপনীয় চালকবিহীন মহাকাশযানকে ঘিরে নতুন করে নজর পড়ে। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে থাকা ওই মহাকাশযান পৃথিবী থেকে কয়েকশ মাইল ওপরে এমন একটি কক্ষপথে একটি ছোট উপগ্রহ ছাড়ে, যেখানে বাণিজ্যিক ও সামরিক উপগ্রহের ঘনত্ব অনেক বেশি।
মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান লিওল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, ছোট উপগ্রহটি পরে আরেকটি চীনা উপগ্রহের চারপাশে ঘুরে আবার মূল মহাকাশযানের দিকে ফিরে আসে। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রেরও একই ধরনের গোপনীয় চালকবিহীন মহাকাশযান রয়েছে। একে এক্স-৩৭বি বলা হয় এবং এটি ছোট আকৃতির মহাকাশযানের মতো দেখতে।
উপগ্রহ এখন সম্ভাব্য অস্ত্রও
ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়েছে, আধুনিক সামরিক ব্যবস্থায় উপগ্রহ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এগুলো পৃথিবীর সামরিক বাহিনীকে যোগাযোগ, অবস্থান নির্ণয়, নজরদারি ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে আসছে।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এমন উপগ্রহ তৈরি করছেন, যেগুলো কক্ষপথ পরিবর্তন করে অন্য মহাকাশযানের কাছে যেতে পারে। কোনো উপগ্রহের কার্যক্রম বৈদ্যুতিন সংকেতের মাধ্যমে ব্যাহত করা, শক্তিশালী আলো দিয়ে তার যন্ত্র অকার্যকর করা কিংবা সরাসরি অন্য মহাকাশযানকে আটক করার সক্ষমতাও ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে।
মার্কিন মহাকাশবাহিনীর প্রধান জেনারেল চান্স সাল্টজম্যান জুলাইয়ে বলেছিলেন, চীন দ্রুত এমন সক্ষমতা তৈরি করছে, যার মধ্যে পৃথিবী ও মহাকাশ—উভয় স্থান থেকে লক্ষ্যবস্তুতে হস্তক্ষেপ বা ধ্বংস করার ব্যবস্থা রয়েছে।
মিত্রদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ তৎপরতা
পৃথিবীর কক্ষপথ যত বেশি ভিড়পূর্ণ হচ্ছে, ততই মহাকাশকে ঘিরে সামরিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুলসংখ্যক উপগ্রহের পাশাপাশি চীনও নিজস্ব বৃহৎ উপগ্রহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে।
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সঙ্গে মহাকাশে যৌথ সামরিক কর্মকাণ্ড বাড়াচ্ছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একটি যৌথ মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করে। মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশবাহিনী কলোরাডো থেকে একটি মার্কিন সামরিক উপগ্রহকে যুক্তরাজ্যের একটি উপগ্রহের খুব কাছে নিয়ে যায়। সেই সময় চীনের শিয়েন-১২-০১ নামের একটি উপগ্রহ তাদের প্রায় ৮৩ কিলোমিটার নিচ দিয়ে অতিক্রম করছিল।
![]()
সামরিক পটভূমির তিনজন মহাকাশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য চীনকে একটি কৌশলগত বার্তা দেওয়া হতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ বিমানবাহিনী কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু টার্নারের মতে, এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই চীনের প্রতি একটি কৌশলগত সংকেত—মিত্রদের ঐক্য, সক্ষমতা এবং ব্রিটিশ উপগ্রহে হস্তক্ষেপ না করার সতর্কবার্তা দেখানো।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য অভিযানটির কথা প্রকাশ্যে জানালেও চীনা উপগ্রহের এত কাছে গিয়ে এটি পরিচালনা করা হয়েছিল—সে তথ্য প্রকাশ করেনি।
মহাকাশে অস্ত্রের আহ্বান
মার্কিন মহাকাশ কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্টিফেন হোয়াইটিং মনে করেন, ভবিষ্যৎ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশভিত্তিক সম্পদ শুরুতেই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাই শুধু উপগ্রহ রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন হলে শত্রুর মহাকাশভিত্তিক ব্যবস্থাকে আঘাত করার সক্ষমতাও থাকতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি কক্ষপথে প্রতিরোধক ব্যবস্থা ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, মহাকাশে সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে এবং প্রতিরোধ ব্যর্থ হলে যুদ্ধ করে জয়ী হওয়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা মহাকাশে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ভূমি থেকে পরিচালিত লেজার, বৈদ্যুতিন সংকেত-বাধাদান ব্যবস্থা, সাইবার হামলা এবং উপগ্রহবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের কথা বলছেন।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া ইতিমধ্যে এমন কিছু চালনাযোগ্য উপগ্রহ পরিচালনা করছে, যেগুলো অন্য মহাকাশযানের কাছে গিয়ে সেগুলো পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা করতে পারে। ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তিকে অস্ত্র বহনের উপযোগী করে তোলা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
চীনের ‘শিকারি’ উপগ্রহের উত্থান
মহাকাশ শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে থাকলেও চীন দ্রুত ব্যবধান কমাচ্ছে। শুধু উপগ্রহের সংখ্যা নয়, তাদের কাজের জটিলতাও বাড়ছে।

চীনের কয়েকটি উপগ্রহ এমন কক্ষপথগত কর্মকাণ্ড দেখিয়েছে, যাকে মার্কিন কর্মকর্তারা মহাকাশের ‘কুকুরে-কুকুরে লড়াই’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। একাধিক উপগ্রহ কাছাকাছি অবস্থান করে সমন্বিতভাবে চলাচল করতে পারে। চীনা মহাকাশযান একটি অকেজো উপগ্রহকে ধরে তার কক্ষপথও পরিবর্তন করেছে।
চীনের শি-চিয়েন-২৬ উপগ্রহকে এমন দ্রুতগতির ও সহজে চালনাযোগ্য উপগ্রহগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গত বছর চীন কক্ষপথে একটি উপগ্রহে জ্বালানি সরবরাহের চেষ্টা করেছে বলেও মার্কিন মহাকাশবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সফলভাবে এমন প্রযুক্তি আয়ত্ত করা গেলে তা মহাকাশযুদ্ধের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ বর্তমানে একটি উপগ্রহের কক্ষপথে সক্রিয় থাকার সময় অনেকটাই তার সঙ্গে বহন করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
জ্বালানি পুনরায় সরবরাহের সক্ষমতা থাকলে একটি উপগ্রহ দীর্ঘ সময় ধরে অন্য মহাকাশযানকে অনুসরণ করতে বা তার ওপর নজর রাখতে পারবে। ফলে ‘শিকারি’ উপগ্রহের কার্যক্ষমতা অনেক বেড়ে যেতে পারে।
জাল দিয়ে উপগ্রহ ধরার প্রযুক্তিও গবেষণায়
চীনের বিভিন্ন সামরিক-সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। পেটেন্ট-সংক্রান্ত নথিতে দেখা গেছে, কিছু প্রতিষ্ঠান এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যার সাহায্যে কোনো মহাকাশযান অন্য একটি মহাকাশযানকে অনুসরণ করার সময় জ্বালানি-সাশ্রয়ী কক্ষপথ নির্ধারণ করতে পারবে।
আরেকটি চীনা সামরিক-ঘনিষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন ধারণা নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে একাধিক মহাকাশযান জাল ব্যবহার করে অন্য মহাকাশযানকে আটক করতে পারে।
একই সঙ্গে শত শত উপগ্রহ একযোগে পরিচালনার সক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবস্থাও উন্নয়নের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রযুক্তির কিছু শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও যুদ্ধের সময় এগুলো সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
পৃথিবীর যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কি মহাকাশে?
মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো পৃথিবীর যুদ্ধক্ষেত্রে উপগ্রহের ওপর নির্ভরতা। যোগাযোগ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য এবং সেনাদের অবস্থান নির্ণয়—সব ক্ষেত্রেই উপগ্রহের ভূমিকা বাড়ছে।
ফলে কোনো দেশের উপগ্রহব্যবস্থা অচল করে দিতে পারলে তার সামরিক সক্ষমতার বড় অংশই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের বড় সংঘাতে শুধু স্থল, সমুদ্র ও আকাশ নয়—মহাকাশও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যা একসময় শুধু বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে দেখা যেত।
মহাকাশে ‘শিকারি’ উপগ্রহ, কক্ষপথ পরিবর্তনকারী মহাকাশযান এবং সম্ভাব্য মহাকাশ অস্ত্রের এই প্রতিযোগিতা তাই আগামী দিনের বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















