ইন্দোনেশিয়ার ১৫ বছর বয়সী ইনতান পারমাতাসারির গল্পটি শুধু একজন কিশোরীর স্থূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি উন্নয়নশীল বিশ্বের দ্রুত বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস ও শিশুস্বাস্থ্যের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। একসময় যেখানে অপুষ্টি ছিল প্রধান সমস্যা, সেখানে এখন সস্তা, অতিপ্রক্রিয়াজাত ও অতিরিক্ত চিনি-চর্বিযুক্ত খাবারের সহজলভ্যতায় শিশুদের মধ্যে স্থূলতা দ্রুত বাড়ছে।
অপুষ্টির পাশাপাশি বাড়ছে স্থূলতা
বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বহু দেশে এখন একই সঙ্গে দুটি বিপরীত পুষ্টিসংকট দেখা দিয়েছে। একদিকে অপুষ্টি ও খর্বাকৃতি, অন্যদিকে শিশু ও কিশোরদের অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা।
দুই শতাধিক দেশের ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশুদের পুষ্টিগত অবস্থা নিয়ে করা সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিশুদের স্থূলতার কেন্দ্র ধীরে ধীরে ধনী দেশগুলো থেকে এমন দেশগুলোর দিকে সরে যাচ্ছে, যাদের এই সমস্যা মোকাবিলার সামর্থ্য তুলনামূলক কম।
ইন্দোনেশিয়ায় ২০২৪ সালে ছেলে ও মেয়েশিশু—উভয় গোষ্ঠীর মধ্যেই স্থূলতার হার আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটিতে এখন স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে স্থূলতা অপুষ্টির চেয়েও বেশি বিস্তৃত হয়ে উঠেছে।
প্রায় ৬ কোটি স্কুলপড়ুয়া শিশুর দেশ ইন্দোনেশিয়ায় অপুষ্টি ও স্থূলতা মিলিয়ে প্রায় ২০ শতাংশ শিশু এই দুই ধরনের পুষ্টিসংকটের কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত।
অপমান ও নিঃসঙ্গতায় স্কুল ছাড়তে হয়েছিল ইনতানকে
বোগোর শহরের এক শ্রমজীবী এলাকায় বেড়ে ওঠা ইনতান ছোটবেলা থেকেই অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছিল। চার বছর বয়সেই তার ওজন এত বেড়ে যায় যে কিন্ডারগার্টেনের কোনো পোশাকই তার গায়ে ঠিকমতো হতো না। শেষ পর্যন্ত পরিবারের তৈরি পোশাক পরে তাকে স্কুলে যেতে হতো।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সহপাঠীদের নির্যাতনও বাড়তে থাকে। সহপাঠীরা তার হাত চিমটি কাটত, টাকা নিয়ে নিত এবং বই ছুড়ে মারত। একসময় এই মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ১২ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দেয় ইনতান।
বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সময়ও সে আশপাশে কেউ আছে কি না দেখে নিত। নিজের শরীর নিয়ে হতাশা ও মানসিক কষ্টে কখনো কখনো দেয়ালে মাথা ঠুকত বলেও তার মা জানিয়েছেন।
স্থূলতার সঙ্গে বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের স্থূলতা শুধু বাহ্যিক চেহারা বা ওজনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে হৃদ্রোগ, বহুমূত্র রোগ, হাঁপানি এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ঝুঁকি জড়িয়ে আছে।
বিশ্বের অনেক দেশে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় অগ্রগতি হলেও শিশুদের স্থূলতাকে এখনো প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই অবহেলার মূল্য ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জুলফিকার ভুট্টার আশঙ্কা, সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে টিকা ও উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে যে স্বাস্থ্যগত অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের ব্যাপক বিস্তার তার বড় অংশকে মুছে দিতে পারে।
সস্তা অস্বাস্থ্যকর খাবারই বড় চালিকাশক্তি
ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসও দ্রুত বদলে গেছে। একসময় খাদ্যের অভাব ছিল বড় সমস্যা। এখন অনেক পরিবারের নাগালের মধ্যে রয়েছে সস্তা কিন্তু অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার।

অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতা, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং পুষ্টি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব—সব মিলিয়ে শিশুদের স্থূলতা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু শুধু বেশি ওজনের হলেই যে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে, তা নয়। প্রয়োজনীয় পুষ্টি না পাওয়া খাবার বেশি খেলে শিশুর শরীরে চর্বি বাড়তে পারে, কিন্তু শারীরিক ও মানসিক বিকাশ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নাও হতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ায় স্বাস্থ্যকর খাবারের ঘাটতি
ইন্দোনেশিয়ার আধুনিক দোকানগুলোতে বিক্রি হওয়া খাদ্যপণ্যের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র প্রায় ২১ শতাংশ পণ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো।
অন্য কয়েকটি দেশে একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে এই হার গড়ে প্রায় ৪১ শতাংশ। শিশুদের কাছে বিপণনের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার সুপারিশ পূরণ করতে পারে ইন্দোনেশিয়ার প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অসংক্রামক রোগবিষয়ক কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ইন্দোনেশিয়ায় বাজারজাত হওয়া খাবার ও পানীয়ের বড় একটি অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি অস্বাস্থ্যকর।
অর্থনৈতিক ক্ষতিও হতে পারে বিশাল
বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর আর্থিক ক্ষতি আগামী কয়েক বছরে বিপুল আকার ধারণ করতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ায় স্থূলতাসংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি ২০১৯ সালের প্রায় ১ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার থেকে ২০৩০ সালে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, কর্মক্ষমতা ও জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
ওজন কমানোর ওষুধ সবার নাগালে নেই
ধনী দেশগুলোতে নতুন ধরনের ওজন কমানোর ওষুধ স্থূলতার চিকিৎসায় সহায়তা করছে। তবে এসব ওষুধের উৎপাদন সীমাবদ্ধতা ও উচ্চমূল্যের কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার হিসাবে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রয়োজন থাকা মানুষের মাত্র ১০ শতাংশ এগুলো পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে এসব ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে এখনো পর্যাপ্ত নির্দেশনা নেই। অধিকাংশ দেশেও নির্দিষ্ট বয়সের নিচে এ ধরনের চিকিৎসার অনুমোদন নেই।

ইনতানের ক্ষেত্রেও প্রচলিত চিকিৎসা, পুষ্টিবিদ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও ওজন নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। পরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার আওতায় তার ওজন কমানোর চিকিৎসা শুরু হয়।
চার বছর বয়সে ৩৫ কেজি ওজনের ইনতানের ওজন একসময় ১৪৮ কেজিতে পৌঁছেছিল। চিকিৎসা শুরুর পর সে প্রায় ৪০ কেজি ওজন কমিয়েছে।
এখন আবার স্কুলে ফিরেছে ইনতান
ওজন কমার সঙ্গে সঙ্গে ইনতানের আত্মবিশ্বাসও ফিরতে শুরু করেছে। এখন সে নিয়মিত হাঁটে, নিজের খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে, চিনি এড়িয়ে চলে এবং শস্য ও কম চর্বিযুক্ত আমিষ খাবারের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়।
সে ব্যায়ামাগারেও যায়, বাবা-মায়ের সঙ্গে বাইরে খেতে যায় এবং সম্প্রতি আবার স্কুলে ফিরেছে।
শৈশবের অপমান তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। এখনো তার স্বপ্ন পুলিশ কর্মকর্তা হওয়া। যারা একসময় তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত, তাদের প্রমাণ করে দিতে চায়—সেও মানুষের জন্য কিছু করতে পারে।
শুধু ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব
ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে খাদ্যপণ্যে লবণ, চর্বি ও চিনির মাত্রা বোঝাতে রঙভিত্তিক খাদ্য-তথ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে উৎপাদকদের নিয়ম মানার জন্য দীর্ঘ সময় দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর কর আরোপের উদ্যোগও বারবার পিছিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের স্থূলতার দায় শুধু পরিবার বা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। শিশুদের কাছে অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিপণন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা, স্পষ্ট পুষ্টি-তথ্য এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতে সরকার ও খাদ্যশিল্প—দুই পক্ষকেই ভূমিকা রাখতে হবে।
একসময় যে দেশগুলো ক্ষুধা ও অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াই করে এগিয়েছে, তাদের সামনে এখন নতুন বাস্তবতা। খাবারের অভাবের পাশাপাশি অতিরিক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাবারও শিশুদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই পরিবর্তন দ্রুত মোকাবিলা করা না গেলে আজকের স্থূল শিশুদের একটি বড় অংশ আগামী দিনের দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত প্রজন্মে পরিণত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















