কৈশোরে নিজের চেহারা, পরিচয়, বন্ধুত্ব, গ্রহণযোগ্যতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই স্বাভাবিক উদ্বেগগুলোই যেন হয়ে উঠছে ব্যবসা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নানা মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তিশালী হাতিয়ার। ব্যক্তিগত পছন্দ ও দুর্বলতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা সুপারিশ ব্যবস্থা তরুণদের একই ধরনের বিষয় বারবার দেখাতে থাকে। ফলে যে কনটেন্ট প্রথমে কৌতূহল থেকে দেখা হয়, সেটিই ধীরে ধীরে জীবনের চিন্তা, আচরণ ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করতে পারে।
ত্বকের যত্ন থেকে শুরু, পরে শরীর নিয়ে অসন্তোষ
রেনি নামের ১৫ বছরের এক কিশোরীর অভিজ্ঞতা এর একটি উদাহরণ। প্রায় ১৪ বছর বয়সে সে ত্বকের যত্ন, সাজসজ্জা, ওজন কমানো এবং মুখের মেদ কমানোর নানা ভিডিও দেখতে শুরু করে। শুরুতে উদ্দেশ্য ছিল ব্রণ কমানো ও ত্বক ভালো রাখা। ভিডিওগুলো তার কাছে বিনোদনও মনে হতো।
কিন্তু একসময় সে খেয়াল করল, এসব ভিডিও নিজে খুঁজে না দেখলেও একই ধরনের বিষয় তার পর্দায় বারবার হাজির হচ্ছে। ধীরে ধীরে অন্যদের চেহারা ও শরীরের সঙ্গে নিজের তুলনা শুরু করে সে।
প্রথমে তার মনে হয়েছিল, আরও সুন্দর হওয়া দরকার। এরপর সেই ভাবনা বদলে যায়—কীভাবে আরও সুন্দর হওয়া যায়, সেই প্রশ্নে। আর সেই প্রশ্নের তৈরি উত্তরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তার সামনে হাজির করতে থাকে—বিভিন্ন প্রসাধনী ও সৌন্দর্যপণ্য।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে রেনি প্রায় ১০০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলারের একটি ত্বকের প্রসাধনী কেনার জন্য মাকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল। পরে অবশ্য মা তা কিনে দেননি। এখন পেছনে ফিরে রেনির নিজেরই মনে হয়, এত কম বয়সে এমন পণ্য তার আদৌ প্রয়োজন ছিল না।

হতাশ কিশোরদের টানছে উগ্র মতাদর্শও
একই ধরনের প্রভাব দেখা যায় অন্য ক্ষেত্রেও। ১৭ বছর বয়সী আলড্রিনের অভিজ্ঞতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে সরাসরি কোনো পণ্য কেনার দিকে না ঠেলে পুরুষত্ব ও নারীদের নিয়ে বিতর্কিত ধারণার দিকে নিয়ে যেতে দেখেছে।
তার সহপাঠীদের কেউ কেউ অ্যান্ড্রু টেটের বক্তব্য অনুসরণ করতে শুরু করেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও টেটের বিভিন্ন ভিডিও আলড্রিনের সামনে আসত। প্রথমে বিনোদন হিসেবে দেখলেও পরে সে ইচ্ছাকৃতভাবে এসব ভিডিওতে প্রতিক্রিয়া দেওয়া বন্ধ করে দেয়, যাতে সেগুলো আরও মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নিজের ভূমিকা না থাকে।
আলড্রিনের ধারণা, কম বয়সের কিশোররা সহজেই এসব বক্তব্যে প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে যখন তাদের চারপাশে বিকল্প মতামতের সুযোগ কম থাকে।
তার মতে, এসব বিষয় এমন কিশোরদের লক্ষ্য করে ছড়ানো হয়, যারা নিজেদের ছোট, দুর্বল কিংবা ক্ষমতাহীন মনে করে। তাদের আত্মবিশ্বাস দেওয়ার নামে আসলে নির্দিষ্ট ধরনের চিন্তাভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
কৈশোরের দুর্বলতাই কেন বড় লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৈশোর এমন একটি সময়, যখন একজন মানুষ নিজের পরিচয়, গ্রহণযোগ্যতা, আত্মমর্যাদা ও সমাজে নিজের অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। একাকিত্ব, সামাজিক প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা অন্য কোনো কারণে বাস্তব জীবনে সংযোগের অভাব থাকলে অনলাইন গোষ্ঠীগুলো আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
এটি তরুণদের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। বরং আপনজনের স্বীকৃতি, নিজের গুরুত্ব বোঝা, দক্ষতা অর্জন এবং কোনো একটি গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার মতো স্বাভাবিক মানবিক প্রয়োজন তখন খুবই তীব্র থাকে।
বাস্তব জীবনে এসব প্রয়োজন পূরণ না হলে অনলাইন জগৎ সহজেই বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
আর যারা তরুণদের প্রভাবিত করতে চায়, তারা বিষয়টি ভালোভাবেই জানে। সরাসরি কোনো মতাদর্শ চাপিয়ে দিলে তরুণরা সেটিকে বিরক্তিকর বা কৃত্রিম বলে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তাই অনেক সময় মতাদর্শকে বিনোদন, রসিকতা, ছবি কিংবা সাধারণ কথাবার্তার আড়ালে উপস্থাপন করা হয়।
কয়েকটি ক্লিক থেকেই শুরু হতে পারে দীর্ঘ যাত্রা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুপারিশ ব্যবস্থা ব্যবহারকারীর প্রতিটি আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। কেউ কোনো একটি বিষয় বারবার দেখলে বা খুঁজলে সেই বিষয়সংক্রান্ত আরও কনটেন্ট সামনে আসতে থাকে।
এভাবে একজন কিশোর প্রথমে নিজের ব্রণ নিয়ে একটি ভিডিও দেখল। পরে ত্বকের যত্নের আরও ভিডিও এলো। তারপর সৌন্দর্যের মানদণ্ড, শরীরের গঠন, ওজন কমানো এবং নানা পণ্যের প্রচার সামনে আসতে শুরু করল।
একই পদ্ধতি রাজনৈতিক কিংবা চরমপন্থী মতাদর্শের ক্ষেত্রেও কাজ করতে পারে।
সিঙ্গাপুরে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে এক কিশোর অনলাইন খেলায় সহিংসতার দৃশ্য তৈরি করার পর ধীরে ধীরে বাস্তব গণহামলা চালানো ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরও ভয়াবহ কনটেন্টের সংস্পর্শে আসে।
অর্থাৎ শুরুটা সবসময় বিপজ্জনক মনে হয় না। কিন্তু একই ধরনের কনটেন্টের ধারাবাহিক উপস্থিতি একজন তরুণের চিন্তার জগৎকে ধীরে ধীরে সংকুচিত করতে পারে।
অনলাইন গোষ্ঠী কখন বিপজ্জনক হয়ে ওঠে
২২ বছর বয়সী উ নামের এক তরুণী ছোটবেলায় নিজের পরিচয় নিয়ে পরিবারে নিজেকে misunderstood মনে করায় অনলাইন সমকামী ও রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠীতে সমর্থন খুঁজে পেয়েছিলেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি এমন কনটেন্টও দেখতে শুরু করেন, যেখানে নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক ও আনুষঙ্গিক জিনিস ব্যবহার করে নিজেকে একটি বিশেষ পরিচয়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কথা বলা হতো। তার মনে হয়েছিল, এসব কনটেন্টের পেছনে পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যও কাজ করছে।
এর পাশাপাশি তিনি এমন মতাদর্শিক বক্তব্যও দেখেছেন, যেখানে একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের প্রতি ঘৃণাকে পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছিল। প্রথমে এসব দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু একই ধরনের বক্তব্য যখন অসংখ্য মন্তব্যে সমর্থন পেতে থাকল, তখন সেগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে।
পরে বাস্তব জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি এসব কনটেন্ট থেকে দূরে সরে আসেন।
আগের প্রজন্মের চেয়ে চাপ এখন অনেক বেশি
কিশোর-কিশোরীদের চেহারা নিয়ে দুশ্চিন্তা, অন্যদের স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা কিংবা কোনো গোষ্ঠীতে জায়গা করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা নতুন নয়। পরিবর্তন এসেছে সেই পরিবেশে, যেখানে এসব অনুভূতি এখন তৈরি ও বিস্তৃত হচ্ছে।
আগের প্রজন্ম স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলে অন্তত কিছু সময় সহপাঠীদের প্রভাব থেকে দূরে থাকতে পারত। বর্তমান প্রজন্মের ক্ষেত্রে সেই চাপ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সারাক্ষণ সঙ্গে থাকে।
কে কতজন অনুসারী পেল, কতজন তার ছবি পছন্দ করল কিংবা কতবার কোনো ভিডিও দেখা হলো—এসব সংখ্যার মাধ্যমে জনপ্রিয়তাও এখন দৃশ্যমান।
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু মানুষের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করে না, সেটিকে বারবার সামনে এনে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুপারিশ ব্যবস্থা সাধারণত ব্যবহারকারীর ভালো থাকা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি নয়; এর প্রধান লক্ষ্য ব্যবহারকারীকে আরও বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে রাখা এবং আয় বাড়ানো। ফলে কোনো কনটেন্ট একজনের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিলেও সেটি যদি তাকে আরও বেশি সময় পর্দায় আটকে রাখে, তাহলে সেই কনটেন্ট বারবার সামনে আসতে পারে।

একই পদ্ধতিতে রাজনীতিতেও তরুণদের সংগঠিত করা হচ্ছে
এই প্রভাব শুধু ভোগবাদ বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক আন্দোলনেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের দ্রুত একত্রিত করতে পারে।
নেপালে তরুণেরা দুর্নীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আন্দোলন সংগঠিত করেছিল। ইন্দোনেশিয়ায় আইনপ্রণেতাদের আবাসন ভাতা নিয়ে ক্ষোভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে তা সংসদের বাইরে বিক্ষোভে রূপ নেয়।
ভারতেও একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন পরে পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা নিয়ে তরুণদের ক্ষোভের বড় আন্দোলনে পরিণত হয়।
তবে অনলাইনে অংশ নেওয়ার সহজ সুযোগের একটি নেতিবাচক দিকও আছে। কেউ হয়তো শুধু পছন্দের চিহ্ন দিচ্ছে, ভাগ করে নিচ্ছে কিংবা মন্তব্য করছে—কিন্তু বাস্তব কোনো কাজে যুক্ত হচ্ছে না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনলাইন ক্ষোভ এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে তা সরাসরি রাস্তায় আন্দোলনে রূপ নেয়।
কখন স্বাভাবিক আগ্রহ বিপদের সংকেত
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণের অনলাইন জগৎ তার বাস্তব জীবনকে সমৃদ্ধ করছে নাকি ধীরে ধীরে সংকুচিত করছে—এটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ধুত্ব, পড়াশোনা, খেলাধুলা ও শখের পাশাপাশি অনলাইন ব্যবহার চললে সাধারণত তা উদ্বেগের কারণ নয়। কিন্তু একজন তরুণ যদি একটি মাত্র পরিচয়, গোষ্ঠী বা বিশ্বাসের মধ্যে নিজেকে আটকে ফেলতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আগের পছন্দের কাজ ছেড়ে দেওয়া, সবকিছুকে সাদা-কালোভাবে দেখা, অনলাইন আচরণ গোপন করা এবং অন্য মতামত সহ্য করতে না পারা—এসব পরিবর্তন সতর্ক হওয়ার কারণ হতে পারে।
রেনির ক্ষেত্রেও বিষয়টি একসময় তার পড়াশোনায় প্রভাব ফেলে। ওজন কমানো তার কাছে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। অন্য কেউ ওজন কমালে তাকেও আরও কমাতে হবে—এমন চিন্তা তৈরি হয়। একসময় সে কয়েক দিন না খেয়ে থাকা এবং অতিরিক্ত খাওয়ার মধ্যে দোদুল্যমান হয়ে পড়ে।
বিপদ থেকে বের হওয়ার পথও দেখাতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
১৭ বছর বয়সী ক্লোয়ি ট্যানের অভিজ্ঞতাও একই রকম। কৈশোরে ব্রণ ও শরীর নিয়ে অনিরাপত্তা থেকে তিনি ত্বকের যত্নের পণ্য কিনতেন, ব্যায়ামের নানা নিয়ম অনুসরণ করতেন এবং নিজের চেহারা নিয়ে ক্রমশ বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।
পরবর্তীতে বিষয়টি এতটাই বাড়ে যে কখনো কখনো আয়নায় নিজের মুখ দেখতেও তার কষ্ট হতো। এমন দিনও গেছে, যখন তিনি খুব সামান্য খাবার খেয়ে পানি পান করে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতেন।
পরিবারের কাছে নিজের সমস্যার কথা জানানোর পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে এই সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সেখান থেকেই একসময় ভিন্ন ধরনের ভিডিওও তার সামনে আসতে থাকে।
এসব ভিডিওতে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতো এবং কম বয়সে কঠোর খাদ্যনিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে সতর্ক করা হতো। প্রথমে ক্লোয়ি এসব ভিডিও এড়িয়ে যেতেন। পরে ধীরে ধীরে তিনি সেগুলো দেখা শুরু করেন এবং নিজের পুরোনো ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শেখেন।
শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান নয়
তরুণদের নিরাপদ রাখতে প্ল্যাটফর্মের ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি উঠেছে। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ন্যূনতম বয়স বাড়ানো এবং বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দিলে ঝুঁকি অন্য জায়গায় চলে যেতে পারে। তাই সমস্যার গভীরে গিয়ে বোঝা জরুরি—কোন বিষয় তরুণদের আকর্ষণ করছে এবং কেন তারা সেসব কনটেন্টের প্রতি এত সহজে সাড়া দিচ্ছে।
শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার শেখানোও যথেষ্ট নয়। তরুণদের বোঝাতে হবে, তাদের পর্দায় কীভাবে কনটেন্ট পৌঁছায়, প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে তাদের অনলাইন আচরণ থেকে আয় করে এবং ব্যক্তিগত তথ্যের বিনিময়ে তারা কী দিচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে তরুণদের শক্তিশালী সম্পর্ক ও নিরাপদ জায়গা তৈরি করে দেওয়া। খেলাধুলা, স্বেচ্ছাসেবা, বিভিন্ন আগ্রহের দল এবং পরিবার তাদের এমন সম্পর্ক দিতে পারে, যেখানে তারা প্রশ্ন করতে, ভুল করতে এবং ভিন্নমত পোষণ করতে ভয় পাবে না।
অভিভাবকদেরও বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা-মাকে প্রতিটি নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন প্রবণতা সম্পর্কে সবকিছু জানতে হবে না। কিন্তু সন্তানের অনলাইন জগৎ সম্পর্কে আগ্রহী থাকতে হবে।
শুধু পোশাক, সাজসজ্জা কিংবা মোবাইল ব্যবহারের সময় নিয়ে প্রশ্ন না করে জানতে হবে—কেন সন্তান এসব করছে, কী অনুভব করছে এবং অনলাইনে কী খুঁজছে।
অভিযোগ বা শাস্তির বদলে খোলামেলা কথোপকথনের সুযোগ তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে। কোনো উত্তর না পেলেও যোগাযোগের দরজা খোলা রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
রেনির সৎমায়ের অভিজ্ঞতা থেকে এই শিক্ষা আরও স্পষ্ট। সন্তানের দৃশ্যমান আচরণের পেছনে কী ঘটছে, সেটি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। শুধু ‘কী করছ’ না জিজ্ঞেস করে ‘কেন করছ’ এবং ‘এর অর্থ তোমার কাছে কী’—এসব প্রশ্নও করতে হবে।

তরুণদের নিজেদের বিচারবোধও গড়ে তুলতে হবে
আবার সব দায়িত্ব পরিবার বা প্ল্যাটফর্মের ওপর চাপিয়ে দিলেও হবে না। তরুণদের নিজেদেরও অনলাইন কনটেন্ট বিচার করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তাদের বুঝতে হবে, পর্দায় বারবার দেখা কোনো বিষয় সত্য, স্বাভাবিক কিংবা প্রয়োজনীয়—এমন নয়। জনপ্রিয়তা মানেই গ্রহণযোগ্যতা নয়, আর বিপুল সংখ্যক মানুষ কোনো মতের সঙ্গে একমত হলেই সেটি সঠিক হয়ে যায় না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তরুণদের একটি মতাদর্শ থেকে সরিয়ে আরেকটি ‘সঠিক’ মতাদর্শে ঠেলে দেওয়াও সমাধান নয়। বরং তাদের প্রশ্ন করার, দ্বিমত পোষণ করার এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
রেনির জন্য পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল একটি উপলব্ধি থেকে—যে জীবনযাপন ও সৌন্দর্যের মানদণ্ডের পেছনে ছুটছে, তা তাকে সুখী করছে না। এরপর ধীরে ধীরে সে ক্ষতিকর বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায়, পরিবারের সঙ্গে আবার যোগাযোগ তৈরি করে এবং নিজের পছন্দের অ্যানিমে, কমিকস ও বইয়ের দোকানে ঘোরার মতো কাজে ফিরে যায়।
তার উপলব্ধি এখন খুব সরল—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু সেখানে কী ধরনের কনটেন্ট নিজের জীবনে ঢুকতে দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তটাই গুরুত্বপূর্ণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















