সিঙ্গাপুরের প্রেসলি চ্যাংয়ের শৈশব আর দশজন শিশুর মতো ছিল না। মাত্র সাত বছর বয়সে প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময় পরিবারকে ভাড়া বাসা থেকে উচ্ছেদ হতে হয়। সেই সময় পুরোনো বাসায় আটকে যায় তার স্কুলের পোশাক ও বই। এরপর সাময়িকভাবে স্কুল থেকে বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার। কিন্তু সেই সাময়িক বিরতিই শেষ পর্যন্ত গড়ায় প্রায় নয় বছরের দীর্ঘ স্কুলছুটে।
প্রেসলি তখন বুঝতেই পারেননি, স্কুল থেকে দূরে থাকার এই সময় তার জীবনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলবে। আজ ২৫ বছর বয়সে এসে সেই একই মানুষটি উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন, একাধিক বৃত্তি পেয়েছেন এবং শিক্ষক হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।
ভাড়া বাসা থেকে বিচ্ছিন্ন এক শৈশব
প্রেসলির পরিবার দীর্ঘদিন আর্থিক সংকটে ছিল। বাবার অনিয়মিত কাজের আয়ে চলত সংসার। নিজেদের কোনো বাড়ি ছিল না। ফলে ছয় মাস থেকে এক বছরের ব্যবধানে তাদের ভাড়া বাসা বদলাতে হতো।
২০০৮ সালে পরিবারকে একটি বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তখন প্রেসলি সদ্য প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছেন। তিন সন্তানকেই স্কুল থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তার বাবা-মা।
সাত বছরের প্রেসলি তখন বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। বরং স্কুলে যেতে হচ্ছে না—এতে তিনি খুশিই হয়েছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে স্কুলের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায়।
তার মা সন্তানদের বাড়িতে পড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই পড়াশোনা বেশিদিন চলেনি। তিন ভাইবোনের দিনের বড় অংশ কেটে যেত খেলাধুলা, টেলিভিশন দেখা আর বিনোদনের মধ্যে।
টেলিভিশনই হয়ে ওঠে শিক্ষার জানালা
স্কুলে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও প্রেসলির শেখার আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। টেলিভিশনে নানা অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র দেখতে দেখতে তার পড়াশোনার কিছু ভিত্তি তৈরি হয়।
তিনি পরে বলেন, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রই এক অর্থে তার শিক্ষার মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম জানালা ছিল তাদের ঘরের টেলিভিশন।
কিন্তু দীর্ঘদিন স্কুলের বাইরে থাকায় বয়সী শিশুদের সঙ্গে তার সামাজিক যোগাযোগও তৈরি হয়নি। পরিবারটি আত্মীয়স্বজনদের থেকেও অনেকটা বিচ্ছিন্ন ছিল। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগও ছিল না।
কিছু প্রতিবেশী বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করলেও তা এগোয়নি। ফলে প্রায় এক দশক স্কুলের বাইরে থাকার বিষয়টি কার্যত আড়ালেই থেকে যায়।
কাজের জগতে গিয়ে বুঝলেন, তিনি কতটা পিছিয়ে
১৪ বছর বয়সে আইনগতভাবে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার পর প্রেসলি একটি খাবারের দোকানে খণ্ডকালীন কাজ শুরু করেন।
তখনই প্রথম তিনি নিজের শিক্ষাগত ঘাটতির বাস্তব প্রভাব বুঝতে শুরু করেন। খাবারের নাম লিখতে গিয়ে সাধারণ কিছু শব্দ লিখতেও তার সমস্যা হতো। হিসাবের কাজ করতে ভয় পেতেন, কারণ মাথায় দ্রুত যোগ-বিয়োগ করার অভ্যাস ছিল না।
সহকর্মীরাও বিষয়টি বুঝে তাকে নানা সহজ অঙ্ক ও বিজ্ঞানের প্রশ্ন করতেন। কখনো কখনো তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপও করা হতো।
কেউ কেউ তাকে সরাসরি প্রশ্ন করত, স্কুলে না পড়েও তিনি কীভাবে জীবনযাপন করছেন। এসব কথা তাকে গভীরভাবে আঘাত করত।
দুই বছর কাজ করার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন—যেভাবেই হোক, তাকে আবার স্কুলে ফিরতে হবে।
স্কুলে ফেরার পথও ছিল কঠিন
প্রেসলির বাবা-মা শিক্ষা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সনদ না থাকায় স্বাভাবিক মাধ্যমিক শিক্ষায় তার পথ সহজ ছিল না।
শেষ পর্যন্ত তার সামনে আসে দুটি বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর একটি ছিল নর্থলাইট স্কুল। আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন তার পুরোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মার্টিন ট্যান।
পরিচিত একজন শিক্ষক সেখানে আছেন—এই বিষয়টি প্রেসলিকে সাহস দেয়। তিনি নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে প্রায় এক দশক পর স্কুলে ফিরে প্রথম কয়েক সপ্তাহ তার জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন।
আবার স্কুলে গিয়ে যেন নতুন জীবন শুরু
স্কুলের পোশাক পরাটাই তার কাছে ছিল এক আবেগঘন ঘটনা। বহু বছর অন্য শিশুদের স্কুলে যেতে দেখেছেন, অথচ নিজে ছিলেন ঘরে। এবার তিনিই স্কুলের পোশাক পরে বাইরে বের হচ্ছেন।
কিন্তু আনন্দের পাশাপাশি ছিল সংকোচ ও ভয়।
নির্দিষ্ট সময়সূচি, ঘণ্টা, এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে ছুটে যাওয়া—সবকিছুই তার কাছে নতুন। তার সহপাঠীরা এসবের সঙ্গে বহু বছর ধরে অভ্যস্ত হলেও প্রেসলিকে প্রায় শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছিল।
শুধু নিয়মকানুন নয়, পড়াশোনার ধরনও ছিল তার কাছে অপরিচিত। পরীক্ষার প্রশ্ন, শ্রেণিকাজ কিংবা খাতায় কীভাবে উত্তর লিখতে হয়—অনেক কিছুই তিনি জানতেন না।
প্রথম সপ্তাহের পরই একসময় মনে হয়েছিল, তিনি হয়তো আবারও পড়াশোনা ছেড়ে দেবেন।
শিক্ষকদের উৎসাহ বদলে দিল সবকিছু
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। প্রেসলি ছাত্রপরিষদে যোগ দেন এবং এমন কিছু সহপাঠীর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যারা পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিত।
শিক্ষকরাও তার পাশে দাঁড়ান। একজন শ্রেণিশিক্ষক তাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখতেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রেসলি নিজের সামর্থ্য নিয়ে ভেতরে ভেতরে সন্দিহান।
ইংরেজি পরীক্ষার সময়ও তিনি ভীষণ চাপ অনুভব করছিলেন। তখন শিক্ষক তাকে বোঝান, ভবিষ্যতে আরও উচ্চস্তরের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সামর্থ্য তার রয়েছে এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে।
এই কথাগুলো প্রেসলির মনে গভীর ছাপ ফেলে। তিনি নিজের ওপর বিশ্বাস করতে শেখেন। এরপর ধীরে ধীরে অসতর্কতাজনিত ভুলও কমতে থাকে।
একের পর এক সাফল্যের পথে
নর্থলাইটের পর প্রেসলি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই বছর আতিথেয়তা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে রিপাবলিক পলিটেকনিকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
পলিটেকনিকে পড়ার সময় তার ফলাফল ছিল অসাধারণ। তিন বছরে পাঁচটি সেমিস্টারেই তিনি নিজের শিক্ষাবর্ষের সেরা দশ শতাংশ শিক্ষার্থীর তালিকায় ছিলেন।
পাশাপাশি তিনি দুটি বৃত্তিও পান। একসময় যে তরুণ সাধারণ অঙ্ক করতে ভয় পেতেন, তিনিই হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মেধাবী শিক্ষার্থী।
তবে ভালো ফল করলেও নিজের সম্পর্কে তার ধারণা রাতারাতি বদলায়নি।
তার ভাষায়, দীর্ঘদিন ভালো ফল করার পরও হঠাৎ করে তার মনে হয়নি যে তিনি খুব মেধাবী। বরং জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে—কখনো মানুষ ব্যর্থ হয়, কখনো সফল হয়; সবাই নিজের পথে এগিয়ে চলে।
বাবার মৃত্যু, তবু থামেননি
পলিটেকনিকে পড়ার দ্বিতীয় বর্ষে হঠাৎ তার বাবা মারা যান। তখন প্রেসলির বয়স মাত্র ২০ বছর।
পরীক্ষার মাত্র এক সপ্তাহ আগে বাবাকে হারানোর পরও পরের সপ্তাহে তাকে পরীক্ষায় বসতে হয়। শোক সামলে তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান।
এই কঠিন সময়ও তার শিক্ষাজীবন থামাতে পারেনি।
এবার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন
শুরুতে প্রেসলির ইচ্ছা ছিল চিকিৎসা-সামাজিক কর্মী বা পরামর্শক হওয়ার। কিন্তু নর্থলাইট স্কুলে ছয় মাস সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার পর তার ভাবনা বদলে যায়।
তিনি উপলব্ধি করেন, একজন শিক্ষক শুধু পড়ান না; শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে পাশে দাঁড়ান, তাদের আত্মবিশ্বাস তৈরি করেন এবং জীবনের পথ দেখান।
পলিটেকনিক শেষ করার পরও তিনি সামাজিক কাজ ও শিক্ষকতা—দুই পথের মধ্যে দ্বিধায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষকতা বৃত্তি পাওয়ার পর তার সিদ্ধান্ত অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায়।
এখন তিনি জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চার বছরের স্নাতক কোর্স করছেন। ভবিষ্যতে শরীরচর্চার শিক্ষক হতে চান।
তার স্বপ্ন, এমন একজন শিক্ষক হওয়া যিনি শিক্ষার্থীদের জীবনে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন আনতে পারেন।
নিজের সময়েই জীবন গড়তে চান
প্রেসলি এখন জীবনের সাফল্যকে অন্যদের মাপকাঠিতে বিচার করেন না। সমবয়সীদের কেউ আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, কেউ ব্যক্তিগত জীবন গড়ছে, কেউ পেশাগতভাবে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে—এসব নিয়ে তিনি খুব একটা উদ্বিগ্ন নন।
কারণ তার যাত্রা শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গা থেকে।
তিনি মনে করেন, জীবনে কোথায় পৌঁছানো গেল সেটিই সব নয়; নিজের অবস্থান নিয়ে শান্তি ও অর্থ খুঁজে পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় যে শিশুটি স্কুলের পোশাক পরার সুযোগ হারিয়েছিল, আজ সে নিজেই ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীদের শিক্ষক হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তার বিশ্বাস, জীবন সবার জন্য একই সময়সূচি মেনে চলে না। আর নিজের দীর্ঘ পথের দিকে ফিরে তাকিয়ে তার উপলব্ধি—তিনি এখন ঠিক সেই জায়গাতেই আছেন, যেখানে থাকতে চান।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















