মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটির পাঁচটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, ওমান উপসাগরে চারটি এবং ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল খার্গ দ্বীপের কাছে আরও একটি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, এসব জাহাজ ইরানের বিপুল অর্থের একটি গোপন বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের অংশ ছিল। ওই নেটওয়ার্ক থেকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীকে অর্থায়ন করা হয় বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ।
ইরানের হামলার পর জাহাজে পাল্টা আঘাত
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরই তেলবাহী জাহাজগুলোতে আঘাত হানা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যখনই মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজকে লক্ষ্য করবে, তখনই দেশটি আরও তেলবাহী জাহাজ হারাবে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন যে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে প্রস্তুত, তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। জর্ডানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এর মধ্যে ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়ে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এই হামলায় কোনো মার্কিন সেনা আহত হননি।
তবে পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উপসাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ নিয়েও উদ্বেগ
ইরান কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরের কাছাকাছি থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজগুলোর কর্মীদের দ্রুত এলাকা ছেড়ে যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এদিকে ইরানের নৌবাহিনী দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে একটি চালকবিহীন মার্কিন ডুবোজাহাজ আটক করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দাবিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর বক্তব্য, ইরান যে বস্তুটি আটক করেছে সেটি কোনো সামরিক ডুবোজাহাজ নয়; বরং পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ একটি পানির নিচের জরিপযান। এতে কোনো গোপন সামরিক সরঞ্জাম বা সংবেদনশীল তথ্য ছিল না বলেও জানানো হয়েছে।
তেলের বাজারে বাড়ছে অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪১ ডলারে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৫৫ ডলারে পৌঁছেছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সৌদি আরবেও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা
এর মধ্যেই ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালকবিহীন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন এবং কয়েকটি তেল স্থাপনার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
ফলে ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল স্থাপনা, সমুদ্রপথ এবং বাণিজ্যিক জাহাজও ক্রমেই সংঘাতের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বড় শঙ্কা
বিশ্বের তেল বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবহন করা হয়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে তেল সরবরাহ, জাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আরও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রবাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সামরিক হামলা ও পাল্টা হামলার ফলে পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি নতুন হামলা পুরো অঞ্চলে আরও বড় সংঘাতের সূচনা করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















