০৪:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ধ্বংসের পর পুরোনো পথে নয়, নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে এগোতে হবে নেপালকে চীনা পণ্য কিনতে বিনিময় কৌশলে নিষেধাজ্ঞা এড়াচ্ছে ইরান দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চিরকুট বিতর্কে চীন ফিলিপাইন শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরেও কাটছে না বাণিজ্য জট ট্রাম্প কিম চতুর্থ বৈঠক আয়োজনে মধ্যস্থতায় প্রস্তুত হলো চীন মিয়ানমারে টিন খনি চালু হলো জাতিসংঘ তদন্ত প্রত্যাখ্যান করল সরকার  হোয়াইট হাউসের সহকারীদের নগদ উপহার নিয়ে উঠল নৈতিকতার প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের দুই অংশের প্রতীক নিয়ে উপনির্বাচনে দ্বন্দ্ব  নেপালে বন্যা পুনর্গঠনে পাঁচশ কোটি ডলার সহায়তা চাইল সরকার এশিয়া কাপ সেমিফাইনালে আজ ভারতের মুখোমুখি বাংলাদেশ নারী দল

বাংলাদেশে হাম মহামারিতে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়াল হাজার

চলতি বছরের মার্চ মাসে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে মৃত শিশুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এখন পর্যন্ত এক হাজার দুই জন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, আর সংক্রমিত হয়েছে এক লাখ সাতাশি হাজার চারশ চুরাশি জন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব। সতেরো কোটি মানুষের এই দেশে শিশুমৃত্যুর এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই প্রাদুর্ভাবকে পৃথক প্রতিবেদনের মাধ্যমে নথিভুক্ত করেছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র জহিদ রায়হান জানিয়েছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। তার ভাষায়, নির্দিষ্ট মাত্রার গণ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হয়নি এবং টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের এখনো খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার হোসাইনের ভাষ্যমতে, দুই হাজার চব্বিশ ও পঁচিশ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় টিকা সংগ্রহ নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যার ফলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয় এবং তা প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময় রুটিন কর্মসূচি কীভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে, এই ঘটনা তারই একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে, বাড়ছে শিশুমৃত্যু
এপ্রিল মাসে সারাদেশে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এই কর্মসূচির আওতায় এক কোটি আশি লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হলেও প্রায় চল্লিশ লাখ শিশু এখনো টিকার বাইরে রয়ে গেছে। এই বিশাল সংখ্যক অরক্ষিত শিশুই আগামী দিনে সংক্রমণের নতুন ঢেউয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় সামান্য ফাঁকফোকরও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকা, বস্তি এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের হার তুলনামূলক কম থাকায় সেসব এলাকাতেই নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের চৌষট্টি জেলার মধ্যে আটান্নটি জেলা এবং সবকটি বিভাগ এই প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে, তারপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক বসতি এলাকাগুলোয় সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। আক্রান্তদের প্রায় আশি শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, আর দুই বছরের কম বয়সীদের মধ্যেই সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আক্রান্ত হয়েছে, যাদের এখনো টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। সংস্থাটি জানিয়েছে, দুই হাজার চব্বিশ ও পঁচিশ সালে সারাদেশে হাম-রুবেলা টিকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল, আর দুই হাজার বিশ সালের পর নিয়মিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিও আয়োজন করা হয়নি। এসব কারণে জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকিকে উচ্চ মাত্রার বলে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি এবং প্রতিটি এলাকায় অন্তত পঁচানব্বই শতাংশ টিকাদানের হার বজায় রাখার সুপারিশ করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখায় নতুন পরিচালক
সামনের দিনগুলোয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মূল চ্যালেঞ্জ হবে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, তবে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে এখনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ শৃঙ্খল মজবুত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়ানো ছাড়া এই সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণ কঠিন হবে।

এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, রোগ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার আগে থেকেই হাতে থাকা সত্ত্বেও তা সময়মতো প্রয়োগ করা যায়নি। টিকা আছে, জ্ঞান আছে, তবু চল্লিশ লাখ শিশু এখনো ঝুঁকিতে, আর এই ফারাকটুকুই এক হাজার শিশুর মৃত্যুর পেছনের আসল গল্প বলে দেয়।

জনপ্রিয় সংবাদ

ধ্বংসের পর পুরোনো পথে নয়, নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে এগোতে হবে নেপালকে

বাংলাদেশে হাম মহামারিতে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়াল হাজার

০২:০৬:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চলতি বছরের মার্চ মাসে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে মৃত শিশুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এখন পর্যন্ত এক হাজার দুই জন শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, আর সংক্রমিত হয়েছে এক লাখ সাতাশি হাজার চারশ চুরাশি জন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব। সতেরো কোটি মানুষের এই দেশে শিশুমৃত্যুর এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই প্রাদুর্ভাবকে পৃথক প্রতিবেদনের মাধ্যমে নথিভুক্ত করেছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র জহিদ রায়হান জানিয়েছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। তার ভাষায়, নির্দিষ্ট মাত্রার গণ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হয়নি এবং টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের এখনো খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার হোসাইনের ভাষ্যমতে, দুই হাজার চব্বিশ ও পঁচিশ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় টিকা সংগ্রহ নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যার ফলে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয় এবং তা প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময় রুটিন কর্মসূচি কীভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে, এই ঘটনা তারই একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশে, বাড়ছে শিশুমৃত্যু
এপ্রিল মাসে সারাদেশে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এই কর্মসূচির আওতায় এক কোটি আশি লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব হলেও প্রায় চল্লিশ লাখ শিশু এখনো টিকার বাইরে রয়ে গেছে। এই বিশাল সংখ্যক অরক্ষিত শিশুই আগামী দিনে সংক্রমণের নতুন ঢেউয়ের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় সামান্য ফাঁকফোকরও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকা, বস্তি এবং ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের হার তুলনামূলক কম থাকায় সেসব এলাকাতেই নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের চৌষট্টি জেলার মধ্যে আটান্নটি জেলা এবং সবকটি বিভাগ এই প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে, তারপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক বসতি এলাকাগুলোয় সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। আক্রান্তদের প্রায় আশি শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, আর দুই বছরের কম বয়সীদের মধ্যেই সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আক্রান্ত হয়েছে, যাদের এখনো টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। সংস্থাটি জানিয়েছে, দুই হাজার চব্বিশ ও পঁচিশ সালে সারাদেশে হাম-রুবেলা টিকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল, আর দুই হাজার বিশ সালের পর নিয়মিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিও আয়োজন করা হয়নি। এসব কারণে জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকিকে উচ্চ মাত্রার বলে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি এবং প্রতিটি এলাকায় অন্তত পঁচানব্বই শতাংশ টিকাদানের হার বজায় রাখার সুপারিশ করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখায় নতুন পরিচালক
সামনের দিনগুলোয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মূল চ্যালেঞ্জ হবে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, তবে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে এখনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ শৃঙ্খল মজবুত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়ানো ছাড়া এই সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণ কঠিন হবে।

এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, রোগ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার আগে থেকেই হাতে থাকা সত্ত্বেও তা সময়মতো প্রয়োগ করা যায়নি। টিকা আছে, জ্ঞান আছে, তবু চল্লিশ লাখ শিশু এখনো ঝুঁকিতে, আর এই ফারাকটুকুই এক হাজার শিশুর মৃত্যুর পেছনের আসল গল্প বলে দেয়।