নিজের মতো করে কাজ করার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। চাকরির বাঁধাধরা নিয়ম ছেড়ে নিজের উদ্যোগে কিছু করার আকাঙ্ক্ষাও কম নয়। তবে বড় প্রশ্ন হলো—কখন চাকরি ছেড়ে স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করা উচিত?
গণমাধ্যম উদ্যোক্তা ও সাংবাদিক কারা সোয়িশারের মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।
‘আমি আরও ভালো করতে পারি’—এই ভাবনা থেকেই শুরু
নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগে সোয়িশার সাংবাদিক হিসেবে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে কাজ করেছেন। পরে তিনি রিকোড প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রযুক্তি ও গণমাধ্যম বিষয়ক সম্মেলন আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হন।
স্বাধীনভাবে কাজ করার সিদ্ধান্তের পেছনে নিজের সক্ষমতার ওপর আত্মবিশ্বাস বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে জানান তিনি। তাঁর ভাবনা ছিল, ব্যর্থ হলেও আবার সাংবাদিকতায় ফিরে আসার সুযোগ থাকবে। কারণ একজন দক্ষ প্রতিবেদকের কাজের চাহিদা সবসময়ই থাকে।
এই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দিয়েছিল।
ঝুঁকি নেওয়ার আগে বাস্তবতা বুঝতে হবে
সোয়িশারের মতে, চাকরি ছেড়ে নিজের উদ্যোগ শুরু করার আগে ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতি ভালোভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিবারের দায়িত্ব, সন্তান, নিয়মিত চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যান্য আর্থিক দায়বদ্ধতা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
অর্থাৎ শুধু চাকরিতে বিরক্তি তৈরি হয়েছে বলেই হুট করে পদত্যাগ করা উচিত নয়। নিজের জীবনযাত্রা কতটা অনিশ্চয়তা সামলাতে পারবে, সেটিও ভাবতে হবে।
নিজের আলাদা কণ্ঠ থাকা জরুরি
স্বাধীনভাবে কিছু করতে চাইলে শুধু উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা থাকলেই হবে না। নিজের এমন একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি বা কণ্ঠ থাকা দরকার, যা অন্যদের থেকে আলাদা।
সোয়িশার যখন নিজের উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, তখন তিনি মূলত দর্শক ও পাঠক কী চান, মানুষ কী খুঁজছে এবং কোন প্রয়োজন এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করেনি—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
তাঁর মতে, কারও যদি সত্যিই বলার মতো কিছু থাকে এবং নিজের হাতে কিছু তৈরি করার প্রবল আগ্রহ থাকে, তাহলে স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা বিবেচনা করা উচিত।
স্বাধীনভাবে কাজ করেও সফল হওয়া সম্ভব
সোয়িশার উদাহরণ হিসেবে ডন লেমনকে উল্লেখ করেছেন। দীর্ঘ সময় সিএনএনে কাজ করার পর ২০২৩ সালে লেমন প্রতিষ্ঠানটি ছাড়েন। এরপর তিনি স্বাধীনভাবে বিষয়বস্তু তৈরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজ এবং সরাসরি অনুষ্ঠান আয়োজনের দিকে এগিয়ে যান।
সোয়িশারের মতে, বর্তমান গণমাধ্যমের পরিবেশে পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ আগের চেয়ে বেশি। গ্রাহকভিত্তিক সদস্যতা, অলাভজনক সংবাদমাধ্যম কিংবা ছোট কিন্তু বিশ্বস্ত দর্শকগোষ্ঠী—এসব পথেও সফল হওয়া সম্ভব।
উদ্যোক্তা মানসিকতা তৈরি করা যায়
নিজের উদ্যোগ চালাতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে জীবনযাত্রায় কিছু ছাড় দিতে হয়। সোয়িশার বোঝাতে চেয়েছেন, উদ্যোক্তা মানসিকতা মানে শুধু বড় স্বপ্ন দেখা নয়; প্রয়োজন হলে খরচ কমানো, সুবিধা ত্যাগ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ধরে রাখার মানসিকতাও এর অংশ।
তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন, সবাই একইভাবে ঝুঁকি নিতে পারেন না। তাই কিছু মানুষকে তিনি চাকরিতেই থাকার পরামর্শ দেন।
তারপরও তাঁর বিশ্বাস, উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা অনেকের মধ্যেই রয়েছে এবং চর্চার মাধ্যমে এই দক্ষতা তৈরি করা সম্ভব।
“বেশির ভাগ মানুষই আসলে উদ্যোক্তা হতে পারে”—সোয়িশারের এই বক্তব্যের মূল কথা হলো, স্বাধীনভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত শুধু সাহসের বিষয় নয়; এর সঙ্গে আত্মবিশ্বাস, বাস্তব প্রস্তুতি, স্বতন্ত্র চিন্তা এবং ঝুঁকি সামলানোর সক্ষমতাও জড়িত।
স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করার আগে নিজের আর্থিক সামর্থ্য, পারিবারিক দায়িত্ব, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা এবং নিজের আলাদা দক্ষতা—এই চারটি বিষয় যাচাই করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারা সোয়িশারের পরামর্শ অনুযায়ী, চাকরি ছাড়ার সঠিক সময় সবার জন্য এক নয়। তবে নিজের কিছু তৈরি করার মতো স্পষ্ট ধারণা এবং সেটিকে টিকিয়ে রাখার মতো প্রস্তুতি থাকলে স্বাধীন পথ বেছে নেওয়ার সময়টি হয়তো কাছেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















