আর্কটিক অঞ্চলের দুর্গম স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে সমুদ্রের গভীরে গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন কেবল ধ্বংসের জন্য তৈরি একটি গোপন প্রযুক্তি ব্যবহারের মহড়া চালানোর সময় রাশিয়ার সাবমেরিন ও গভীর সমুদ্রের যান শনাক্ত করেছে ন্যাটোর মিত্র দেশগুলো। ব্রিটেন, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানে রুশ নৌযানগুলোর গতিবিধি নজরদারি করা হয় এবং তাদের মহড়া শেষ করার আগেই বাধা দেওয়া হয়।
পশ্চিমা দুই কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি বছরের বসন্তে এই ঘটনা ঘটে। রাশিয়ার গভীর সমুদ্র যুদ্ধ পরিচালনা বিভাগের গোপন ইউনিট ‘গুগি’ এই অভিযানে যুক্ত ছিল। গভীর সমুদ্রের বিশেষ যান ব্যবহার করে রুশ বাহিনী এমন একটি অত্যাধুনিক ও ধ্বংসাত্মক প্রযুক্তি প্রয়োগের অনুশীলন করছিল, যা সমুদ্রের তলদেশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কেবল অচল করে দিতে পারে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে ওই মহড়ায় কোনো কেবল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়নি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল মূলত সম্ভাব্য ন্যাটো-রাশিয়া সংঘাতের সময় ওই প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা হতে পারে, তার একটি অনুশীলন। প্রযুক্তিটি ঠিক কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে কর্মকর্তারা বিস্তারিত কিছু জানাননি।
ব্রিটেন ও নরওয়ে গত এপ্রিলেই আর্কটিক জলসীমায় রাশিয়ার একটি গোপন তৎপরতা শনাক্ত করার কথা জানিয়েছিল। তবে এবারের ঘটনায় নতুন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি, অভিযানের সুনির্দিষ্ট স্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণের তথ্য আগে প্রকাশ্যে আসেনি।
পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন উদ্বেগ বাড়ছে যে ইউরোপে নাশকতামূলক তৎপরতা আরও বাড়াতে পারে মস্কো। একই সঙ্গে রাশিয়া ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, তা নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছু মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষক মনে করছেন, রাশিয়া ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ৫ নম্বর ধারা পরীক্ষার মতো কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে সমুদ্রতলের যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাগানের পানির পাইপের চেয়েও বেশি মোটা নয়—এমন অনেক তলদেশীয় কেবল বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ ও আর্থিক লেনদেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের সময়ও এসব কেবলের কৌশলগত গুরুত্ব বহুবার দেখা গেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন যোগাযোগের মাধ্যমে সামরিক নির্দেশনা পাঠানোর ক্ষেত্রে এসব কেবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
স্ভালবার্ডকে নরওয়ের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে দুটি প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তলদেশীয় অপটিক্যাল-ফাইবার কেবল। সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিটার নিচ দিয়েও এগুলো চলে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন স্ভালস্যাটে ডাউনলোড হওয়া বিপুল পরিমাণ স্যাটেলাইট তথ্য এই কেবলগুলোর মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। স্ভালস্যাট নাসার ‘নিয়ার স্পেস নেটওয়ার্ক’-এরও অংশ।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। ক্রেমলিন অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। মস্কো কোনো ধরনের সংঘাতের পরিকল্পনা করছে—এমন অভিযোগও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
পশ্চিমা কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারির পরিস্থিতি অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার লক্ষ্যভিত্তিক তৎপরতা বেড়েছে। পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও রোমানিয়া এরই মধ্যে নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমায় রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের লঙ্ঘনের কথা জানিয়েছে।
আগস্টে জার্মানির লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে একটি ড্রোন হামলার চেষ্টা নিয়েও জার্মানি রাশিয়াকে দায়ী করেছিল। ওই ঘটনার পর বার্লিন বন শহরে রাশিয়ার একটি কনস্যুলেট এবং বার্লিনে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নেয়।
এর আগে আগস্টে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ মস্কো সফর করেন। ইউরোপে রাশিয়ার নাশকতামূলক তৎপরতা আরও বাড়ানো নিয়ে সতর্ক করতে তিনি রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন। তবে স্ভালবার্ডের গোপন সমুদ্রতল অভিযান নিয়ে তিনি আলোচনা করেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।
সমুদ্রে রুশ নৌযানগুলোর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানের সময় ব্রিটিশ ও নরওয়ের কর্মকর্তারা তাদের পাওয়া তথ্য মস্কোর কাছেও তুলে ধরেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, রাশিয়াকে বোঝানো যে নতুন এই প্রযুক্তি এবং গোপন অভিযান সম্পর্কে পশ্চিমা দেশগুলো অবগত এবং প্রয়োজনে তা শনাক্ত করতে সক্ষম।
নরওয়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তোরে স্যান্ডভিক বলেছেন, যৌথ অভিযানের মাধ্যমে রাশিয়াকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে তারা গোপনে কাজ করতে পারবে না। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করার যেকোনো চেষ্টা শনাক্ত করা হবে এবং তার পরিণতি হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে আর্কটিকের উত্তরে উত্তেজনা বাড়ানো কারও স্বার্থে নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাশিয়ার গভীর সমুদ্র গবেষণা বিভাগের রুশ সংক্ষিপ্ত নাম ‘গুগি’। ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে এই গোপন সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ন্যাটোও সমুদ্রতলের অবকাঠামো রক্ষায় নজরদারি বাড়িয়েছে।
রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়লে স্ভালবার্ডের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে নরওয়ের মূল ভূখণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত ‘বিয়ার গ্যাপ’ নামের সমুদ্রাঞ্চল বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব পেতে পারে। পশ্চিমা এক কর্মকর্তার মতে, রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপে থাকা পারমাণবিক সাবমেরিনগুলো আটলান্টিকে যেতে হলে প্রায় ৪০০ মাইল প্রশস্ত এই জলপথ অতিক্রম করতে হয়। এরপর তাদের নরওয়ের প্রত্যন্ত আগ্নেয় দ্বীপ ইয়ান মায়েনের পাশ দিয়ে যেতে হয়।
এই কৌশলগত অঞ্চলে নজরদারি জোরদার করতে ব্রিটেন, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে যৌথ মহড়াও চালিয়েছে। আগস্টে উচ্চ উত্তরের এলাকায় ন্যাটোর যৌথভাবে কাজ করার সক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য ইয়ান মায়েনে ব্রিটেনও বাহিনী মোতায়েন করে।
নরওয়ে ২০২৮ সালের মধ্যে স্ভালবার্ড ও ইয়ান মায়েনকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন অপটিক্যাল-ফাইবার কেবল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
সমুদ্রতলের অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে ন্যাটোর উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালে জার্মানিতে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহকারী নর্ড স্ট্রিমের চারটি সমুদ্রতলীয় পাইপলাইনের মধ্যে তিনটি বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। ওই ঘটনায় জার্মানিতে এক ইউক্রেনীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। তিনি হামলার সময় বিশেষ বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন বলে জার্মান তদন্তকারীদের দাবি। তবে ইউক্রেন নর্ড স্ট্রিম নাশকতায় কোনো ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
২০২৩ সাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলীয় অবকাঠামোর আশপাশে ধীরগতিতে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যাও বেড়েছে। এসব জাহাজ পাইপলাইন, বিদ্যুৎ কেবল ও টেলিযোগাযোগ কেবলের অবস্থান পর্যবেক্ষণ বা মানচিত্র তৈরির চেষ্টা করছে বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবকাঠামোর অবস্থান পর্যবেক্ষণ নিজে অবৈধ নয়। কিন্তু এত ব্যাপকভাবে এমন কার্যক্রম চালানোকে সম্ভাব্য নাশকতার প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
সামুদ্রিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর উত্তর সাগরে এ ধরনের ধীরগতির চলাচল ৫২ শতাংশ বেড়ে ১৩ হাজার ৭৯টি জাহাজে দাঁড়ায়। দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলে একই ধরনের তৎপরতা বেড়েছে ৮৮ শতাংশ, যেখানে জাহাজের সংখ্যা ১৮ হাজার ৪০১টিতে পৌঁছেছে।
তলদেশীয় অবকাঠামো সুরক্ষায় ন্যাটো ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে নজরদারি বাড়িয়েছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ন্যাটো ‘বাল্টিক সেন্ট্রি’ এবং যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে ‘নর্ডিক ওয়ার্ডেন’ নামে পৃথক উদ্যোগ চালু করা হয়। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর আশপাশে নৌবাহিনীর টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
বাল্টিক সাগরও এই নজরদারির অন্যতম প্রধান এলাকা। উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে সেখানে এ ধরনের জাহাজ চলাচল আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ কমে ৫২৬টিতে নেমে আসে। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গত বছরের শেষ পর্যন্ত বাল্টিক সাগরে অন্তত ১১টি সমুদ্রতলীয় কেবল ক্ষতিগ্রস্ত বা বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বিস্তৃত বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ কেবলের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক প্রতি বছর আরও বড় হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারসহ তথ্য ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার কারণে এসব অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ছে। ফলে ইউরোপের মতো অঞ্চলগুলোও সম্ভাব্য নাশকতার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রুস জোন্সের মতে, গত ২৫ বছরে ইউরোপ একই সঙ্গে সমুদ্রতলীয় অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে এবং সেই অবকাঠামো রক্ষার সক্ষমতা কমিয়েছে। এখন রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে ইউরোপ সেই সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
স্ভালবার্ডের বরফঠান্ডা সমুদ্রের গভীরে রাশিয়ার এই মহড়া তাই শুধু একটি সামরিক অনুশীলনের ঘটনা নয়। এটি একই সঙ্গে দেখিয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যৎ সংঘাতে সমুদ্রতলের অদৃশ্য যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেগুলো রক্ষায় ন্যাটো ও ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগ কতটা গভীর হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















