০৮:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্যাক্সনি-আনহাল্টে আফডির বড় জয়, চীনের সঙ্গে জার্মানির নীতিতে কি বদল আসবে? বিশ্বে ক্ষুধা কমাতে গ্রামীণ জনপদে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান সাত বছর পর ভারতে যাচ্ছেন শি, মোদির সঙ্গে বৈঠকে নজর মক্কা চুক্তির অধীনে সামরিক পদক্ষেপ নেই পাকিস্তানের সাফ জবাব পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের একশ দিনে সাফল্য ও বিতর্ক পাশাপাশি যুদ্ধের ছায়ায় রাশিয়া, ভোটের আগে বাড়ছে মানুষের উদ্বেগ ন্যাটোর নজরদারিতে রাশিয়ার গোপন সাবমেরিন মহড়া, লক্ষ্য সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ তার জাপানের এআই স্যাটেলাইটকে ‘গুরুতর হুমকি’ বলল চীন সামরিক যোগাযোগে মাস্কের স্পেসএক্সের ওপর ব্রিটেনের নির্ভরতা বাড়ছে তাইজে তীব্র লড়াই, হুথিদের তিন ড্রোন ভূপাতিত

ছোট নৌকার বিক্ষোভ নয়, আসল সংকট ব্রিটেনের ভেঙে পড়া অভিবাসন ব্যবস্থা

ব্রিটেনে ছোট নৌকায় অভিবাসীদের আগমন নিয়ে যে ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে রাস্তায় নেমেছে, সেটিকে কেবল উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখার প্রবণতা সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা বোঝার জন্য তা যথেষ্ট নয়। ডোভারের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে যে অসন্তোষ রয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন: রাষ্ট্র কি আদৌ নিজের সীমান্ত, আশ্রয়ব্যবস্থা এবং অভিবাসন নীতির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে?

আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় বিক্ষোভ নয়; বরং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করেছে যে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এবং রাষ্ট্রের বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে বিপুল দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

অভিবাসন ব্যবস্থায় বাস্তবতার জায়গা কোথায়?

সাবেক ব্রিটিশ অভিবাসন কর্মকর্তা টনি স্মিথের ১৯৭০-এর দশকের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে একটি অস্বস্তিকর তুলনা সামনে আনে। বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এমন আবেদন দেখেছেন, যেখানে ব্রিটেনে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যসংখ্যা কাগজে-কলমে বাড়িয়ে দেওয়া হতো। নির্ভরযোগ্য জন্মনিবন্ধন বা আধুনিক পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় কর্মকর্তাদের নির্ভর করতে হতো সাক্ষাৎকার, পারিবারিক সম্পর্কের বিবরণ এবং নিজেদের বিচারবোধের ওপর।

সেই ব্যবস্থার কঠোরতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: কর্মকর্তাদের কাছে অসঙ্গতি শনাক্ত করার এবং মিথ্যা তথ্যের পরিণতি নির্ধারণের বাস্তব ক্ষমতা ছিল।

আজকের ব্রিটেনে অভিবাসন সিদ্ধান্ত অনেক বেশি জটিল। মানবাধিকার আইন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, আদালত, আপিল এবং আইনি প্রতিনিধিত্ব—সব মিলিয়ে এমন একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে সরকারের পক্ষে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন কঠিন, তেমনি সেটি কার্যকর করাও অনেক সময় দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

এর ফলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে ধীরে ধীরে আইনি গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।

আশ্রয়ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই এখন প্রশ্নে

সম্প্রতি এক স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তথ্য প্রকাশকারী কর্মকর্তা দাবি করেছেন, যুক্তরাজ্যে করা আশ্রয় আবেদনের মাত্র এক শতাংশ প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এই নির্দিষ্ট দাবিকে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। কিন্তু আশ্রয়ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগকে কেবল ওই একজনের বক্তব্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সরকারি পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, সিদ্ধান্তের ধরন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটকীয়ভাবে বদলেছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ৪২ হাজার আশ্রয় আবেদন অনুমোদিত হয়েছে, যা মোট আবেদনের ৩৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে অনুমোদনের সংখ্যা ছিল ৬৮ হাজার। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০২২ সালে, অনুমোদনের হার ছিল ৭৭ শতাংশ, যদিও তখন মোট আবেদন ছিল মাত্র ১৮ হাজার।

এই সংখ্যাগুলো নিজে থেকে কোনো আবেদনকারীকে প্রতারক প্রমাণ করে না। কিন্তু এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে: ব্রিটেন কি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে প্রকৃত শরণার্থীকে যথাযথ সুরক্ষা দেওয়া এবং মিথ্যা দাবিকে প্রত্যাখ্যান করা—দুটিই নির্ভরযোগ্যভাবে সম্ভব?

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার নিরীক্ষা এই প্রশ্নকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। সেখানে দেখা গেছে, ব্রিটেনের মাত্র অর্ধেক আশ্রয় সিদ্ধান্ত নিজস্ব মানদণ্ড পূরণ করে। ৬০টি সাক্ষাৎকারের নমুনার মধ্যে ১৯টিতে আবেদনকারী কোন ভিত্তিতে আশ্রয় চাইছেন, সেটিই যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।200,000 small boat arrivals loom amid UK raising threat level to ‘severe’  following recent terror attack

এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণ।

যখন কর্মকর্তাদের দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য চাপ দেওয়া হয়, তখন দ্রুততার সঙ্গে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তের সংঘাত তৈরি হতে বাধ্য। একটি আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে যতটা প্রমাণ ও আইনি সতর্কতা দরকার, অনুমোদনের ক্ষেত্রে যদি তুলনামূলকভাবে কম বাধা থাকে, তাহলে ব্যবস্থাটি স্বাভাবিকভাবেই একদিকে ঝুঁকে পড়বে।

ডোভারের ক্ষোভকে তাই অবাক হওয়ার মতো কিছু মনে হয় না

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কেন থাকবে?

ডোভারে বিক্ষোভকারীরা যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে, তার প্রতিটি বক্তব্য বা প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করার প্রয়োজন নেই। মুখোশধারী কোনো দল রাস্তায় নামলে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। সহিংসতা, হুমকি কিংবা নিরীহ মানুষের ওপর হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ এবং সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। সরকার বছরের পর বছর ধরে বলেছে যে ছোট নৌকায় অবৈধ প্রবেশ বন্ধ করা হবে। মানুষ সেই প্রতিশ্রুতির ফল দেখতে চাইবে—এটাই স্বাভাবিক।

একজন ভোটারের প্রশ্ন খুব কঠিন কিছু নয়: সরকার যদি জানে যে অবৈধভাবে মানুষ ছোট নৌকায় করে দেশে ঢুকছে, তাহলে তাদের আটকানো বা দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা কোথায়?

আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে। যারা শিক্ষার্থী বা কর্মসংস্থানের অনুমতিপত্রে বৈধভাবে ব্রিটেনে প্রবেশ করে পরে এমন আশ্রয় দাবি করে যা সত্য নয়, তাদের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের কঠোর যাচাই হবে না?

এই প্রশ্নগুলোকে শুধু ‘ডানপন্থী’ বলে বাতিল করা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য তা বিপজ্জনক।

রাজনৈতিক দলগুলোও এখন বাস্তবতা বুঝছে

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ব্রিটেনের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। লেবার, কনজারভেটিভ এবং রিফর্ম—তিন দলই ভিন্ন ভাষায় হলেও স্বীকার করছে যে অভিবাসন সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত আদালত, আইনজীবী, বিচারিক ট্রাইব্যুনাল এবং বিভিন্ন সহায়ক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

লেবারের অভিবাসন আইন বিচারকদের কাছ থেকে কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষমতা সরিয়ে সাধারণ ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কনজারভেটিভরা আরও অনেক দূর যেতে চায়। তাদের প্রস্তাব হলো, অভিবাসন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও আপিলের বড় অংশ আবার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়া এবং আদালতে যাওয়ার সুযোগকে খুব সীমিত করে ফেলা।

তাদের দাবি, এতে প্রায় ৯৮ শতাংশ অভিবাসন মামলা আদালতের বাইরে চলে যেতে পারে।

এটি নিঃসন্দেহে একটি মৌলিক পরিবর্তন হবে। এর সঙ্গে ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রশ্নও জড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্র হওয়া উচিত আরও সরল একটি বিষয়: একটি দেশের সীমান্তনীতি নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?

নির্বাচিত সরকারের, নাকি এমন একটি ক্রমবর্ধমান আইনি ব্যবস্থার হাতে যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নতুন কোনো পথ খোলা থাকে?

মানবিকতার নামে অকার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়

প্রকৃত শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া ব্রিটেনের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকটি দাবি সত্য বলে ধরে নিতে হবে।

একটি কার্যকর আশ্রয়ব্যবস্থা একই সঙ্গে মানবিক এবং কঠোর হতে পারে। প্রকৃত বিপন্ন মানুষকে দ্রুত সুরক্ষা দেওয়া যাবে, আবার মিথ্যা দাবি প্রমাণিত হলে তা প্রত্যাখ্যান করা যাবে। অবৈধ প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। আর যাদের থাকার অধিকার নেই, তাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে।

সমস্যা হলো, ব্রিটেন এমন একটি ব্যবস্থায় আটকে গেছে যেখানে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটি কার্যকর করতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। এর মধ্যে সরকারের অর্থ ব্যয় হয়, স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ বাড়ে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষয় হয়।

এই আস্থার সংকটই ছোট নৌকার বিক্ষোভের প্রকৃত রাজনৈতিক অর্থ।

এটি শুধু অভিবাসন নিয়ে ক্ষোভ নয়। এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে ক্ষোভ। মানুষ জানতে চাইছে, নির্বাচিত সরকার যদি কোনো নীতি ঘোষণা করে, তাহলে সেই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষমতাও কি তার আছে?

সরকারের সামনে তাই দুটি পথ। একদিকে থাকবে বর্তমান ব্যবস্থার জটিলতা, দীর্ঘ আপিল, দুর্বল যাচাই এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা। অন্যদিকে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব, যেখানে প্রকৃত শরণার্থীর অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু মিথ্যা দাবি বা অবৈধ প্রবেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে।

ডোভারের মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া সহজ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই পরিস্থিতি তৈরি না করা, যেখানে মানুষের রাজনৈতিক হতাশা ক্রমে আরও বড় হয়ে ওঠে।

কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ সবসময় রাস্তায় হয় না।

অনেক সময় তার উত্তর আসে ভোটের বাক্সে।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্যাক্সনি-আনহাল্টে আফডির বড় জয়, চীনের সঙ্গে জার্মানির নীতিতে কি বদল আসবে?

ছোট নৌকার বিক্ষোভ নয়, আসল সংকট ব্রিটেনের ভেঙে পড়া অভিবাসন ব্যবস্থা

০৬:২৪:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্রিটেনে ছোট নৌকায় অভিবাসীদের আগমন নিয়ে যে ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে রাস্তায় নেমেছে, সেটিকে কেবল উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখার প্রবণতা সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা বোঝার জন্য তা যথেষ্ট নয়। ডোভারের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে যে অসন্তোষ রয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন: রাষ্ট্র কি আদৌ নিজের সীমান্ত, আশ্রয়ব্যবস্থা এবং অভিবাসন নীতির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে?

আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় বিক্ষোভ নয়; বরং এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করেছে যে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এবং রাষ্ট্রের বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে বিপুল দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

অভিবাসন ব্যবস্থায় বাস্তবতার জায়গা কোথায়?

সাবেক ব্রিটিশ অভিবাসন কর্মকর্তা টনি স্মিথের ১৯৭০-এর দশকের অভিজ্ঞতা এ বিষয়ে একটি অস্বস্তিকর তুলনা সামনে আনে। বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এমন আবেদন দেখেছেন, যেখানে ব্রিটেনে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যসংখ্যা কাগজে-কলমে বাড়িয়ে দেওয়া হতো। নির্ভরযোগ্য জন্মনিবন্ধন বা আধুনিক পরীক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় কর্মকর্তাদের নির্ভর করতে হতো সাক্ষাৎকার, পারিবারিক সম্পর্কের বিবরণ এবং নিজেদের বিচারবোধের ওপর।

সেই ব্যবস্থার কঠোরতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: কর্মকর্তাদের কাছে অসঙ্গতি শনাক্ত করার এবং মিথ্যা তথ্যের পরিণতি নির্ধারণের বাস্তব ক্ষমতা ছিল।

আজকের ব্রিটেনে অভিবাসন সিদ্ধান্ত অনেক বেশি জটিল। মানবাধিকার আইন, আন্তর্জাতিক চুক্তি, আদালত, আপিল এবং আইনি প্রতিনিধিত্ব—সব মিলিয়ে এমন একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে সরকারের পক্ষে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন কঠিন, তেমনি সেটি কার্যকর করাও অনেক সময় দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।

এর ফলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে ধীরে ধীরে আইনি গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।

আশ্রয়ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই এখন প্রশ্নে

সম্প্রতি এক স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তথ্য প্রকাশকারী কর্মকর্তা দাবি করেছেন, যুক্তরাজ্যে করা আশ্রয় আবেদনের মাত্র এক শতাংশ প্রকৃত অর্থে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এই নির্দিষ্ট দাবিকে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার। কিন্তু আশ্রয়ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগকে কেবল ওই একজনের বক্তব্য বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সরকারি পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছে, সিদ্ধান্তের ধরন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটকীয়ভাবে বদলেছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ৪২ হাজার আশ্রয় আবেদন অনুমোদিত হয়েছে, যা মোট আবেদনের ৩৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে অনুমোদনের সংখ্যা ছিল ৬৮ হাজার। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০২২ সালে, অনুমোদনের হার ছিল ৭৭ শতাংশ, যদিও তখন মোট আবেদন ছিল মাত্র ১৮ হাজার।

এই সংখ্যাগুলো নিজে থেকে কোনো আবেদনকারীকে প্রতারক প্রমাণ করে না। কিন্তু এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে: ব্রিটেন কি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যেখানে প্রকৃত শরণার্থীকে যথাযথ সুরক্ষা দেওয়া এবং মিথ্যা দাবিকে প্রত্যাখ্যান করা—দুটিই নির্ভরযোগ্যভাবে সম্ভব?

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার নিরীক্ষা এই প্রশ্নকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। সেখানে দেখা গেছে, ব্রিটেনের মাত্র অর্ধেক আশ্রয় সিদ্ধান্ত নিজস্ব মানদণ্ড পূরণ করে। ৬০টি সাক্ষাৎকারের নমুনার মধ্যে ১৯টিতে আবেদনকারী কোন ভিত্তিতে আশ্রয় চাইছেন, সেটিই যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।200,000 small boat arrivals loom amid UK raising threat level to ‘severe’  following recent terror attack

এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণ।

যখন কর্মকর্তাদের দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য চাপ দেওয়া হয়, তখন দ্রুততার সঙ্গে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তের সংঘাত তৈরি হতে বাধ্য। একটি আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে যতটা প্রমাণ ও আইনি সতর্কতা দরকার, অনুমোদনের ক্ষেত্রে যদি তুলনামূলকভাবে কম বাধা থাকে, তাহলে ব্যবস্থাটি স্বাভাবিকভাবেই একদিকে ঝুঁকে পড়বে।

ডোভারের ক্ষোভকে তাই অবাক হওয়ার মতো কিছু মনে হয় না

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কেন থাকবে?

ডোভারে বিক্ষোভকারীরা যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে, তার প্রতিটি বক্তব্য বা প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করার প্রয়োজন নেই। মুখোশধারী কোনো দল রাস্তায় নামলে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। সহিংসতা, হুমকি কিংবা নিরীহ মানুষের ওপর হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

কিন্তু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ এবং সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। সরকার বছরের পর বছর ধরে বলেছে যে ছোট নৌকায় অবৈধ প্রবেশ বন্ধ করা হবে। মানুষ সেই প্রতিশ্রুতির ফল দেখতে চাইবে—এটাই স্বাভাবিক।

একজন ভোটারের প্রশ্ন খুব কঠিন কিছু নয়: সরকার যদি জানে যে অবৈধভাবে মানুষ ছোট নৌকায় করে দেশে ঢুকছে, তাহলে তাদের আটকানো বা দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা কোথায়?

আরও একটি প্রশ্ন রয়েছে। যারা শিক্ষার্থী বা কর্মসংস্থানের অনুমতিপত্রে বৈধভাবে ব্রিটেনে প্রবেশ করে পরে এমন আশ্রয় দাবি করে যা সত্য নয়, তাদের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের কঠোর যাচাই হবে না?

এই প্রশ্নগুলোকে শুধু ‘ডানপন্থী’ বলে বাতিল করা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য তা বিপজ্জনক।

রাজনৈতিক দলগুলোও এখন বাস্তবতা বুঝছে

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ব্রিটেনের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। লেবার, কনজারভেটিভ এবং রিফর্ম—তিন দলই ভিন্ন ভাষায় হলেও স্বীকার করছে যে অভিবাসন সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত আদালত, আইনজীবী, বিচারিক ট্রাইব্যুনাল এবং বিভিন্ন সহায়ক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

লেবারের অভিবাসন আইন বিচারকদের কাছ থেকে কিছু সিদ্ধান্তের ক্ষমতা সরিয়ে সাধারণ ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কনজারভেটিভরা আরও অনেক দূর যেতে চায়। তাদের প্রস্তাব হলো, অভিবাসন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও আপিলের বড় অংশ আবার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেওয়া এবং আদালতে যাওয়ার সুযোগকে খুব সীমিত করে ফেলা।

তাদের দাবি, এতে প্রায় ৯৮ শতাংশ অভিবাসন মামলা আদালতের বাইরে চলে যেতে পারে।

এটি নিঃসন্দেহে একটি মৌলিক পরিবর্তন হবে। এর সঙ্গে ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রশ্নও জড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু বিতর্কের কেন্দ্র হওয়া উচিত আরও সরল একটি বিষয়: একটি দেশের সীমান্তনীতি নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা কার হাতে থাকবে?

নির্বাচিত সরকারের, নাকি এমন একটি ক্রমবর্ধমান আইনি ব্যবস্থার হাতে যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নতুন কোনো পথ খোলা থাকে?

মানবিকতার নামে অকার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়

প্রকৃত শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া ব্রিটেনের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকটি দাবি সত্য বলে ধরে নিতে হবে।

একটি কার্যকর আশ্রয়ব্যবস্থা একই সঙ্গে মানবিক এবং কঠোর হতে পারে। প্রকৃত বিপন্ন মানুষকে দ্রুত সুরক্ষা দেওয়া যাবে, আবার মিথ্যা দাবি প্রমাণিত হলে তা প্রত্যাখ্যান করা যাবে। অবৈধ প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। আর যাদের থাকার অধিকার নেই, তাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে।

সমস্যা হলো, ব্রিটেন এমন একটি ব্যবস্থায় আটকে গেছে যেখানে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটি কার্যকর করতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। এর মধ্যে সরকারের অর্থ ব্যয় হয়, স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ বাড়ে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষয় হয়।

এই আস্থার সংকটই ছোট নৌকার বিক্ষোভের প্রকৃত রাজনৈতিক অর্থ।

এটি শুধু অভিবাসন নিয়ে ক্ষোভ নয়। এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে ক্ষোভ। মানুষ জানতে চাইছে, নির্বাচিত সরকার যদি কোনো নীতি ঘোষণা করে, তাহলে সেই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষমতাও কি তার আছে?

সরকারের সামনে তাই দুটি পথ। একদিকে থাকবে বর্তমান ব্যবস্থার জটিলতা, দীর্ঘ আপিল, দুর্বল যাচাই এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা। অন্যদিকে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব, যেখানে প্রকৃত শরণার্থীর অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু মিথ্যা দাবি বা অবৈধ প্রবেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে।

ডোভারের মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া সহজ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই পরিস্থিতি তৈরি না করা, যেখানে মানুষের রাজনৈতিক হতাশা ক্রমে আরও বড় হয়ে ওঠে।

কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ সবসময় রাস্তায় হয় না।

অনেক সময় তার উত্তর আসে ভোটের বাক্সে।