যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কোভেন্যান্ট ভারী বিস্ফোরক বহনে সক্ষম নতুন একটি দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তুলনামূলক কম খরচে দ্রুত ও ব্যাপক পরিমাণে এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। বড় মার্কিন অস্ত্র নির্মাতাদের আধিপত্যের বাজারে সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই নতুন প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগকে তাই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কোভেন্যান্টের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রটির নাম ‘অ্যান্থেম’। এটি ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য এবং ২০০ কেজির বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, গত এক বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় ক্ষেপণাস্ত্রটি দুই শতাধিকবার উড্ডয়ন করেছে।
যুদ্ধের পর অস্ত্রের মজুত বাড়ানোর তাগিদ
ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পর মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও তুলনামূলক কম দামে বেশি সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহের দিকে নজর দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেই কোভেন্যান্টের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের ঘোষণা এলো।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মাইকেল কাউফম্যান বলেন, বড় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমমানের অস্ত্র অল্প পরিমাণে তৈরি হচ্ছে এবং সেগুলোর দামও অনেক বেশি। সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই কোভেন্যান্ট অ্যান্থেম তৈরি করেছে।
অ্যান্থেমকে অন্যান্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যাপক সংখ্যায় ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি টমাহক ও জেএএসএসএম-ইআর ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।
নজর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে
কোভেন্যান্টের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষেপণাস্ত্রটির নকশা তৈরির সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাব্য সংঘাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট অ্যাবি ডেনবার্গ বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের কথা মাথায় রেখেই তাদের অস্ত্রের নকশা করা হয়েছে।
সামরিক পরিকল্পনায় চীনের কাছাকাছি মিত্র দেশগুলোর দ্বীপ থেকে ভূমিভিত্তিক দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করার ধারণা রয়েছে। ফিলিপাইনের মতো দেশ থেকে এ ধরনের অস্ত্র নিক্ষেপ করা হলে চীনের কিছু লক্ষ্যবস্তু প্রায় ৩ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেও চলে আসতে পারে। এতে মানববাহী যুদ্ধবিমান বা নৌবাহিনীর বড় আকারের আক্রমণাত্মক বহরের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিন দেশে উৎপাদনের পরিকল্পনা
কোভেন্যান্ট ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি আড়াইশ কোটি মার্কিন ডলারের কিছু বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ইসরায়েলে প্রতিষ্ঠানটির দুই শতাধিক কর্মী রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯ হাজার ৭৫০ বর্গমিটার আয়তনের একটি কারখানা বুধবার চালু হচ্ছে। পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় পৌঁছালে সেখানে বছরে প্রায় ৫ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সম্ভব হবে।
জার্মানির স্যাক্সনি অঞ্চলেও একই ধরনের একটি কারখানা রয়েছে। সেখানেও বছরে প্রায় ৫ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। আর উত্তর ইসরায়েলের অপেক্ষাকৃত ছোট কারখানায় বছরে আরও প্রায় ২ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে তিন দেশে বছরে প্রায় ১২ হাজার অ্যান্থেম ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
চলতি বছরেই সরবরাহ শুরু
কোভেন্যান্ট জানিয়েছে, পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু হলে প্রতিটি অ্যান্থেমের দাম কয়েক লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে রাখার লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের অর্ডার এসেছে।
জার্মানিতে তৈরি অ্যান্থেমের সরবরাহ চলতি বছরের শেষ নাগাদ একটি আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে শুরু হওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কাছে সরবরাহ শুরু হতে পারে ২০২৭ সালে। একই বছর প্রতিষ্ঠানটি আয় থেকে নগদ অর্থপ্রবাহ তৈরি করতে পারবে বলে আশা করছে।
সরবরাহব্যবস্থায় বিকল্প রাখছে প্রতিষ্ঠানটি
নতুন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ করা। এই ঝুঁকি কমাতে কোভেন্যান্ট একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর না করার নীতি নিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট ইঞ্জিন সরবরাহের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আরও একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি আগামী দুই বছরে ৪ হাজারের বেশি জেট ইঞ্জিন সংগ্রহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিও করা হয়েছে।
কোভেন্যান্টের অ্যান্থেম প্রকল্প তাই শুধু একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নয়; বরং কম খরচে দ্রুত ও ব্যাপক হারে দূরপাল্লার অস্ত্র উৎপাদনের নতুন মডেল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। ইরান যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ায় এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা শিল্পে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি—দুই বাস্তবতাকেই সামনে রেখে দূরপাল্লার কম খরচের ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা বাড়তে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















