০৯:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীন মোকাবিলায় জাপান ও ফিলিপাইনের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা

পূর্ব এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাবের মুখে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক রূপান্তরের পথে হাঁটছে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ, ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব জোরদারের মাধ্যমে টোকিও এই পরিবর্তন আনতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে তাইওয়ান ঘিরে সম্ভাব্য সংকট এবং সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের কাছে চীনা নৌবাহিনীর টহল এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি। জাপান সরকার বছরের শেষ নাগাদ তাদের কৌশলগত নিরাপত্তা নথি সংশোধনের পরিকল্পনা করছে, যেখানে ন্যাটোর মান অনুযায়ী জিডিপির দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে জাপান হবে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশ।

তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একাধিক বাস্তব বাধার মুখোমুখি হচ্ছে জাপান। দ্রুত ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যার কারণে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগযোগ্য তরুণের সংখ্যা কমছে, ফলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বছরের পর বছর ধরে নিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। এর পাশাপাশি জাপানের শিল্প কাঠামোও নতুন অস্ত্র উৎপাদনের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারছে না। রাজস্ব ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয়ের চাপে সরকারকে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর প্রশ্নে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এমনকি অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে নতুন প্রযুক্তি পরিচালনার গতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, যাকে তারা একধরনের কার্যক্ষম দ্বন্দ্ব বলে অভিহিত করছেন। জাপানের শিল্প কাঠামোও নতুন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সম্প্রসারিত হতে না পারায় উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতিও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

Japan, Philippines to boost military tech ties amid China tensions | Stars  and Stripes
একই সময়ে দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধে জড়িত ফিলিপাইনও তাদের সামরিক আধুনিকায়ন নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র প্রায় ত্রিশ বিলিয়ন ডলারের একটি সংশোধিত সামরিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিলেন, যা ২০৩৪ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। কিন্তু বাজেট সংকটের কারণে এই পরিকল্পনা বিলম্বিত হচ্ছে এবং সমালোচকরা একে সরকারের লোক দেখানো প্রতিশ্রুতি বলে আখ্যা দিচ্ছেন, যা মার্কোসের প্রকৃত অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা বাড়ানোই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলেও, বাস্তবে বরাদ্দ অর্থ ছাড় হতে বিলম্ব হওয়ায় সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচি বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে এই দুই দেশের অভিজ্ঞতা তুলনীয়। সীমিত বাজেট, জনশক্তির সংকট আর রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে সামরিক আধুনিকায়নের পরিকল্পনা কীভাবে থমকে যেতে পারে, জাপান ও ফিলিপাইনের এই দৃষ্টান্ত তার শিক্ষণীয় উদাহরণ। আঞ্চলিক শক্তিসাম্যের পরিবর্তনের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিকল্পনাতেও পরোক্ষভাবে পড়তে বাধ্য, বিশেষত বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর নৌ উপস্থিতি বাড়ার প্রেক্ষাপটে, যা বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশলকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ঘোষণা আর তার বাস্তবায়নের মধ্যে যে বিস্তর ব্যবধান তৈরি হতে পারে, এই দুই দেশের অভিজ্ঞতা তা স্পষ্ট করে তোলে। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থাকলেও অর্থনৈতিক ও জনতাত্ত্বিক বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয় কোনো দেশ কতটা দ্রুত তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীন মোকাবিলায় জাপান ও ফিলিপাইনের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা

০৬:৫৭:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পূর্ব এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাবের মুখে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক রূপান্তরের পথে হাঁটছে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ, ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলজুড়ে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব জোরদারের মাধ্যমে টোকিও এই পরিবর্তন আনতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে তাইওয়ান ঘিরে সম্ভাব্য সংকট এবং সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের কাছে চীনা নৌবাহিনীর টহল এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি। জাপান সরকার বছরের শেষ নাগাদ তাদের কৌশলগত নিরাপত্তা নথি সংশোধনের পরিকল্পনা করছে, যেখানে ন্যাটোর মান অনুযায়ী জিডিপির দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে জাপান হবে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশ।

তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একাধিক বাস্তব বাধার মুখোমুখি হচ্ছে জাপান। দ্রুত ক্রমহ্রাসমান জনসংখ্যার কারণে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগযোগ্য তরুণের সংখ্যা কমছে, ফলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বছরের পর বছর ধরে নিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। এর পাশাপাশি জাপানের শিল্প কাঠামোও নতুন অস্ত্র উৎপাদনের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারছে না। রাজস্ব ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয়ের চাপে সরকারকে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর প্রশ্নে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এমনকি অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে নতুন প্রযুক্তি পরিচালনার গতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, যাকে তারা একধরনের কার্যক্ষম দ্বন্দ্ব বলে অভিহিত করছেন। জাপানের শিল্প কাঠামোও নতুন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সম্প্রসারিত হতে না পারায় উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতিও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

Japan, Philippines to boost military tech ties amid China tensions | Stars  and Stripes
একই সময়ে দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধে জড়িত ফিলিপাইনও তাদের সামরিক আধুনিকায়ন নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র প্রায় ত্রিশ বিলিয়ন ডলারের একটি সংশোধিত সামরিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিলেন, যা ২০৩৪ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। কিন্তু বাজেট সংকটের কারণে এই পরিকল্পনা বিলম্বিত হচ্ছে এবং সমালোচকরা একে সরকারের লোক দেখানো প্রতিশ্রুতি বলে আখ্যা দিচ্ছেন, যা মার্কোসের প্রকৃত অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত অঞ্চলে শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা বাড়ানোই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলেও, বাস্তবে বরাদ্দ অর্থ ছাড় হতে বিলম্ব হওয়ায় সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন কর্মসূচি বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে এই দুই দেশের অভিজ্ঞতা তুলনীয়। সীমিত বাজেট, জনশক্তির সংকট আর রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে সামরিক আধুনিকায়নের পরিকল্পনা কীভাবে থমকে যেতে পারে, জাপান ও ফিলিপাইনের এই দৃষ্টান্ত তার শিক্ষণীয় উদাহরণ। আঞ্চলিক শক্তিসাম্যের পরিবর্তনের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিকল্পনাতেও পরোক্ষভাবে পড়তে বাধ্য, বিশেষত বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর নৌ উপস্থিতি বাড়ার প্রেক্ষাপটে, যা বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলোর কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশলকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ঘোষণা আর তার বাস্তবায়নের মধ্যে যে বিস্তর ব্যবধান তৈরি হতে পারে, এই দুই দেশের অভিজ্ঞতা তা স্পষ্ট করে তোলে। রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থাকলেও অর্থনৈতিক ও জনতাত্ত্বিক বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয় কোনো দেশ কতটা দ্রুত তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারবে।