চীনের বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ নতুন নয়। বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্যনীতি, শুল্ক এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্য বিরোধের আড়ালে আরও বড় একটি পরিবর্তন ঘটছে। চীনের উৎপাদন দক্ষতা বিশ্বে শিল্প কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক মূল্যকে স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে।
২০১৫ সালে শুরু হওয়া ‘মেড ইন চায়না’ কৌশলের লক্ষ্য ছিল অত্যাধুনিক শিল্পখাতে চীনকে নেতৃত্বের অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। সেই লক্ষ্য অর্জনে দেশটি ইতিমধ্যেই অনেক দূর এগিয়েছে। জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সালে বৈশ্বিক উৎপাদনশিল্পের মূল্য সংযোজনে চীনের অংশ ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। ২০২০ সালে তা বেড়ে প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছে যায়। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই অংশ ৪৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
কিছু খাতে চীনের আধিপত্য আরও স্পষ্ট। বিশ্বের বাজারে বিক্রি হওয়া বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এবং সোলার প্যানেলের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখন চীনে উৎপাদিত হয়। সেমিকন্ডাক্টর ও বাণিজ্যিক বিমান নির্মাণে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় চীন এখনও পিছিয়ে থাকলেও প্রযুক্তিগত ব্যবধান দ্রুত কমছে।
এই সাফল্যের ব্যাখ্যায় প্রায়ই রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির কথা বলা হয়। নিঃসন্দেহে সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু শুধু সরাসরি ভর্তুকি দিয়ে বর্তমান চীনা শিল্প সক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যক্ষ ভর্তুকি কমলেও বিনিয়োগের জন্য কর ছাড়, দ্রুত শিল্পভূমি পাওয়ার সুযোগ এবং কম খরচে মূলধন সংগ্রহের মতো পরোক্ষ সহায়তা বেড়েছে। একই সঙ্গে চীনের উচ্চ সঞ্চয়ের হার সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম রাখতে সহায়তা করে এবং বিপুল শিল্প বিনিয়োগ সম্ভব করে তোলে।
অবশ্য বিপুল বিনিয়োগ মানেই উৎপাদনশীলতার নিশ্চয়তা নয়। ইতিহাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও ভুল বিনিয়োগ, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে সেই মডেল শেষ পর্যন্ত স্থবির হয়ে পড়ে। চীনের নিজের আবাসন খাতেও অতিরিক্ত নির্মাণ দেখিয়েছে যে প্রচুর মূলধন ব্যয় করেও বিপুল অপচয় হতে পারে।
কিন্তু উৎপাদনশিল্পের বহু ক্ষেত্রে চিত্রটি আলাদা। সেখানে বড় বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার চাপ, উন্নত পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে শক্তিশালী দক্ষতা। এর ফলে চীনা কোম্পানিগুলো শুধু কম খরচে পণ্য তৈরি করছে না, উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থেকে দ্রুত শিখছে, বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের সুবিধা কাজে লাগাচ্ছে এবং ধারাবাহিকভাবে খরচ কমাচ্ছে।

এ কারণেই চীনের প্রতিযোগিতামূলক শক্তিকে এখন কেবল ভর্তুকির ফল হিসেবে দেখা বিভ্রান্তিকর। সরাসরি সরকারি ভর্তুকি বিলুপ্ত হলেও দক্ষতা, অবকাঠামো, বিপুল বাজার, প্রকৌশল সক্ষমতা এবং উৎপাদনের স্কেল চীনা শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে আরও একটি মৌলিক বাস্তবতা যুক্ত। জ্ঞান একবার অর্জিত হলে তা সহজে হারিয়ে যায় না। যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার ও উৎপাদন প্রযুক্তির মধ্যে সেই জ্ঞান জমা হতে থাকে। একইভাবে সস্তা জ্বালানি আরও সস্তা উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করে। সৌর বা বায়ুবিদ্যুতের খরচ কমলে সেই শক্তি ব্যবহার করে নতুন সোলার প্যানেল কিংবা উইন্ড টারবাইন তৈরি করাও আরও সস্তা হয়। এই প্রক্রিয়া নিজেকেই আরও শক্তিশালী করে।
চীন না থাকলেও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিশ্ব উৎপাদনশীলতা বাড়াত। কিন্তু চীনের নীতি, বিনিয়োগের মাত্রা এবং শিল্প সক্ষমতা সেই পরিবর্তনের গতি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
এখন অন্য দেশগুলোর সামনে প্রশ্ন, এই নতুন বাস্তবতায় তারা কী করবে। চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ একটি পথ। আরেকটি পথ হতে পারে নিজ দেশে চীনা বিনিয়োগ স্বাগত জানানো। কিন্তু এখানেও একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। চীনা কোম্পানি যখন অন্য দেশে কারখানা তৈরি করবে, তখন তারা এমন কারখানাই গড়বে যা চীনের উৎপাদনশীলতার কাছাকাছি পর্যায়ে কাজ করতে পারে। সেখানে চীনা যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল দক্ষতা ব্যবহৃত হবে। স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও টিকে থাকতে হলে একই মাত্রার উৎপাদনশীলতা অর্জন করতে হবে।
এর অনিবার্য ফল হলো, ভবিষ্যতের শিল্প উৎপাদনে মানুষের প্রয়োজন ক্রমেই কমবে।
চীন বর্তমানে বিশ্বের উৎপাদনশিল্পের মূল্য সংযোজনের প্রায় ৩০ শতাংশ তৈরি করছে আনুমানিক ১২ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক দিয়ে। গোটা বিশ্ব যদি একই মাত্রার উৎপাদনশীলতা অর্জন করে, তাহলে বর্তমান বিশ্বের প্রয়োজনীয় সব উৎপাদিত পণ্য তৈরি করতে আনুমানিক ৪০ কোটি শ্রমিকই যথেষ্ট হতে পারে। এটি বৈশ্বিক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ শতাংশ। প্রযুক্তিগত উন্নতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই অনুপাত আরও কমবে।
কৃষিতে ইতিমধ্যে একই ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে উন্নত অর্থনীতির বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষিতে কাজ করত। প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতার কারণে এখন অনেক দেশে মোট কর্মসংস্থানের সামান্য অংশ দিয়েই প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব। উৎপাদনশিল্পও শেষ পর্যন্ত একই পথে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি ফল হবে উৎপাদিত পণ্যের আপেক্ষিক মূল্য ক্রমাগত কমে যাওয়া। একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি, সোলার প্যানেল বা অন্য শিল্পপণ্য তৈরির খরচ দ্রুত কমতে পারে। কিন্তু ভালো অবস্থানের জমি, বিশেষ ব্র্যান্ড, ব্যক্তিগত সেবা কিংবা এমন সম্পদ যার সরবরাহ স্বভাবতই সীমিত, তার মূল্য একইভাবে কমবে না। ফলে অত্যন্ত স্বয়ংক্রিয় অর্থনীতিতে সম্পদ কোথায় তৈরি হবে এবং কার হাতে জমা হবে, সেই প্রশ্নও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
উন্নত দেশগুলো যত শিল্পনীতিই নিক, দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থানের অংশ কমার সম্ভাবনাই বেশি। একই সঙ্গে ভারত বা আফ্রিকার দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য শিল্পকারখানা বিপুল কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে উঠবে, এমন প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়।
চীন আজ বিশ্বকে দেখাচ্ছে উচ্চমানের শিল্পপণ্য উৎপাদনে আসলে কত অল্পসংখ্যক মানুষের প্রয়োজন হতে পারে। নতুন এই ‘চায়না শক’ মোকাবিলায় দেশগুলো শুল্ক দিক, শিল্পনীতি গ্রহণ করুক কিংবা চীনা বিনিয়োগ স্বাগত জানাক, একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বদলাবে না। একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় মানুষের সংখ্যা ক্রমেই কমতে থাকবে।
এটাই চীনের উৎপাদন বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্রভাব। প্রশ্নটি আর শুধু কে বিশ্বের কারখানা হবে, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের সেই কারখানায় আদৌ কতজন মানুষের প্রয়োজন হবে।
অ্যাডেয়ার টার্নার 


















