০৮:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আর্জেন্টিনায় মিলেইর অর্থনৈতিক সাফল্য, তবু বাড়ছে জনরোষ ভারতের বাজারে দ্রুত বাড়ছে পনিরের চাহিদা, বদলে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস সরকারের সমালোচনা করার অধিকারই গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা মিয়ানমারে ফিরে এসেছে আফিম চাষ, বাড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্বেগ চীনা গবেষকদের কাছে আজও এক ধাঁধার নাম ভারত জাপানিদের জন্য ভিসা ফি সাত গুণ বাড়াল চীন লেটুসবাহিত পরজীবীর প্রকোপ শেষের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক চাপের মাঝে ফেডের সামনে সুদ বাড়ানোর কঠিন সিদ্ধান্ত স্কুলশিশুরা কেন দিন দিন কম মেধাবী হয়ে উঠছে? ডেমোক্র্যাটদের বিভক্তিই কি তাদের শক্তি? ট্রাম্পের ঐক্যবদ্ধ রিপাবলিকানদের নিয়ে নতুন প্রশ্ন

জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান পুতিনের জন্য কেন সুখবর

জার্মানির ছোট রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যকে শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য ধরা পড়বে না। ইউরোপের রাজনীতিতে রাশিয়াপন্থী শক্তির বিস্তার এবং ইউক্রেনকে ঘিরে পশ্চিমা ঐক্যের ভবিষ্যৎ—দুই ক্ষেত্রেই এই ফল গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।

এএফডি ওই নির্বাচনে ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে, এককভাবে রাজ্য সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে সামান্য দূরে ছিল তারা। ইউরোপের অন্যান্য উগ্র ডানপন্থী ও জনতাবাদী দলের মতো এএফডিও রাশিয়ার প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল। তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মস্কোর স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় মিল রয়েছে—ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার জন্য ইউরোপীয় জনমতকে প্রভাবিত করা।

রাশিয়ার জন্য ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর একটি এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন নয়; বরং ইউরোপের রাজনৈতিক দৃশ্যপট এমনভাবে বদলে দেওয়া, যাতে কিয়েভের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ভয়ের রাজনীতি মস্কোর বড় হাতিয়ার

এই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে কার্যকর বার্তাগুলোর একটি হলো—ইউক্রেনকে সহায়তা করে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে না, বরং পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।

সম্প্রতি জার্মানির লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে একটি সশস্ত্র ড্রোনের ঘটনা এ ধরনের প্রচারের একটি উদাহরণ। জার্মান সরকার প্রায় এক মাস পর মস্কোকে ওই হামলার পরিকল্পনার জন্য দায়ী করে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। রাশিয়ার একটি কনস্যুলেট ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করা হয় এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে রুশ রাষ্ট্রদূতদের তলব করা হয়।

প্রতিক্রিয়াটি ছিল মূলত প্রতীকী এবং উত্তেজনা না বাড়ানোর জন্যই সীমিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ একে ‘বাস্তব যুদ্ধের শুরু’ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি রুশ সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি জার্মানির পদক্ষেপকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন এবং দাবি করেন, বার্লিন আবারও যুদ্ধ চায়।

এই বক্তব্যের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য খুব কম। জার্মানির পারমাণবিক অস্ত্র নেই এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা, গোলাবারুদ, ড্রোন বা দ্রুত মোতায়েনযোগ্য স্থলবাহিনীও নেই। তার ওপর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে নাৎসি জার্মানি রাশিয়া থেকে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সরিয়ে নিয়ে আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছিল; বর্তমান জার্মানির নিজ ভূখণ্ডে রুশ দপ্তর বন্ধ করার ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

তবু এমন বক্তব্যের রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। কারণ এর উদ্দেশ্য সম্ভবত জার্মান জনগণের কাছে এই ধারণা জোরালো করা যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া মানেই বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে এটি এএফডির মতো রাশিয়াপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রচারকেও শক্তিশালী করে।With Messaging That Mirrors Putin's, Germany's Far-Right Party Gains Ground  - The New York Times

ন্যাটোর শক্তিবৃদ্ধি কীভাবে ঘটল

একই ধরনের কৌশল সামরিক ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র নরওয়েতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম লঞ্চার নিয়ে সামরিক মহড়া চালানোর প্রস্তুতি নিলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ একে নতুন নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন। এর কয়েক দিন পর ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা জানায়, ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত একটি রুশ ইউনিট পূর্ব বেলারুশের দিকে যাচ্ছে, ন্যাটোর সীমান্তের কাছাকাছি।

দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতার মধ্যেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ওরেশনিক পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এবং এর পাল্লা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। বিপরীতে টমাহক তুলনামূলক ধীরগতির এবং পারমাণবিক অস্ত্র বহনের জন্য ব্যবহৃত হয় না। নরওয়ের মহড়ায় কোনো টমাহক ছোড়া হয়নি; মূলত প্রয়োজনে লঞ্চারগুলো ইউরোপে দ্রুত নিয়ে আসা সম্ভব কি না, সেটিই পরীক্ষা করা হয়েছিল।

তবে এর মধ্যকার বড় সত্যটি হলো—রাশিয়ার চারপাশের নিরাপত্তা পরিবেশ আগের তুলনায় নিঃসন্দেহে বদলেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের বড় অংশই মস্কোর নিজের কর্মকাণ্ডের ফল।

২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ক্রিমিয়া দখল করে, তখন ন্যাটোর সম্প্রসারণকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিল মস্কো। কিন্তু সে সময় পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি আজকের মতো ছিল না। ১৯৯৬ সালে ন্যাটো নতুন পূর্ব ইউরোপীয় সদস্যদের ভূখণ্ডে স্থায়ী ঘাঁটি না বসানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। ২০১৭ সালের আগে সেখানে এ ধরনের স্থায়ী উপস্থিতিও তৈরি হয়নি। ইউক্রেনের সংবিধানেও তখন ন্যাটো সদস্য হওয়ার পথ বন্ধ ছিল এবং দেশটির জনগণের মধ্যেও এ বিষয়ে আগ্রহ সীমিত ছিল। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় কমছিল, এমনকি ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে তার শেষ সক্রিয় ট্যাংকও সরিয়ে নেয়।

২০২২ সালের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেয়। ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়তে শুরু করে, বিশেষ করে জার্মানি এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনে। মার্কিন ট্যাংক আবার ইউরোপে ফিরে আসে এবং পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি জোরদার হয়। একই সময়ে ন্যাটোর সদস্যপদ ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে এবং এর পক্ষে দেশটিতে ব্যাপক জনসমর্থনও তৈরি হয়েছে।

মস্কোর জন্য যুদ্ধের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা

পুতিনের জন্য এই পরিবর্তন একটি রাজনৈতিক সুবিধাও তৈরি করেছে। রাশিয়ার অভ্যন্তরে তিনি পশ্চিমা হুমকিকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, যাতে ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সেনাদের মৃত্যুকে শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হিসেবে নয়, বরং দেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখানো যায়।

ইউরোপেও একই বয়ান ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাশিয়া এবং ইউরোপের কিছু জনতাবাদী রাজনৈতিক দল দাবি করছে, ইউক্রেনকে অস্ত্র ও অর্থ দেওয়া এবং ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠন করা আসলে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার শামিল। এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পারমাণবিক ধ্বংসের আশঙ্কা।

ন্যাটোর কোনো সদস্যই রাশিয়াকে আক্রমণ করার আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কিন্তু রাজনৈতিক প্রচারে বাস্তবতার চেয়ে আশঙ্কা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। আর সেই জায়গাতেই এএফডির মতো দলগুলোর সাফল্য মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আগামী দিনের বড় পরীক্ষা

স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির সাফল্য হয়তো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আগামী এক বছরে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও উগ্র ডানপন্থী ও রাশিয়াপন্থী দলগুলোর নির্বাচনী অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ইউক্রেনকে অর্থায়ন এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার প্রশ্নে।

ফ্রান্স এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মেরিন ল্য পেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল র‍্যালি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দলটির সভাপতি জর্দান বারদেলাও সম্প্রতি বলেছেন, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় অর্থ দেওয়া বন্ধ করার সময় এসেছে।

এই রাজনৈতিক প্রবণতাগুলো পুতিনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য রাশিয়ার ওপর বাড়লেও তিনি যদি মনে করেন সময় তার পক্ষেই কাজ করছে, তাহলে আপসের প্রয়োজনও কম অনুভব করবেন।

তার প্রত্যাশা হতে পারে—ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনকে পশ্চিমা সহায়তা থেকে বঞ্চিত করবে, পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন বাড়াবে এবং ন্যাটোর ঐক্য দুর্বল করবে। সে ক্ষেত্রে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পাশাপাশি ইউরোপের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যও যুদ্ধের ফলাফলের অংশ হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

আর্জেন্টিনায় মিলেইর অর্থনৈতিক সাফল্য, তবু বাড়ছে জনরোষ

জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান পুতিনের জন্য কেন সুখবর

০৬:১০:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জার্মানির ছোট রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলের সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যকে শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য ধরা পড়বে না। ইউরোপের রাজনীতিতে রাশিয়াপন্থী শক্তির বিস্তার এবং ইউক্রেনকে ঘিরে পশ্চিমা ঐক্যের ভবিষ্যৎ—দুই ক্ষেত্রেই এই ফল গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।

এএফডি ওই নির্বাচনে ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে, এককভাবে রাজ্য সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে সামান্য দূরে ছিল তারা। ইউরোপের অন্যান্য উগ্র ডানপন্থী ও জনতাবাদী দলের মতো এএফডিও রাশিয়ার প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল। তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মস্কোর স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় মিল রয়েছে—ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার জন্য ইউরোপীয় জনমতকে প্রভাবিত করা।

রাশিয়ার জন্য ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর একটি এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন নয়; বরং ইউরোপের রাজনৈতিক দৃশ্যপট এমনভাবে বদলে দেওয়া, যাতে কিয়েভের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ভয়ের রাজনীতি মস্কোর বড় হাতিয়ার

এই লক্ষ্য অর্জনে সবচেয়ে কার্যকর বার্তাগুলোর একটি হলো—ইউক্রেনকে সহায়তা করে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে না, বরং পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।

সম্প্রতি জার্মানির লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে একটি সশস্ত্র ড্রোনের ঘটনা এ ধরনের প্রচারের একটি উদাহরণ। জার্মান সরকার প্রায় এক মাস পর মস্কোকে ওই হামলার পরিকল্পনার জন্য দায়ী করে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। রাশিয়ার একটি কনস্যুলেট ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করা হয় এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে রুশ রাষ্ট্রদূতদের তলব করা হয়।

প্রতিক্রিয়াটি ছিল মূলত প্রতীকী এবং উত্তেজনা না বাড়ানোর জন্যই সীমিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ একে ‘বাস্তব যুদ্ধের শুরু’ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি রুশ সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি জার্মানির পদক্ষেপকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন এবং দাবি করেন, বার্লিন আবারও যুদ্ধ চায়।

এই বক্তব্যের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য খুব কম। জার্মানির পারমাণবিক অস্ত্র নেই এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করার মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা, গোলাবারুদ, ড্রোন বা দ্রুত মোতায়েনযোগ্য স্থলবাহিনীও নেই। তার ওপর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে নাৎসি জার্মানি রাশিয়া থেকে কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সরিয়ে নিয়ে আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছিল; বর্তমান জার্মানির নিজ ভূখণ্ডে রুশ দপ্তর বন্ধ করার ঘটনা তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

তবু এমন বক্তব্যের রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। কারণ এর উদ্দেশ্য সম্ভবত জার্মান জনগণের কাছে এই ধারণা জোরালো করা যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া মানেই বৃহত্তর যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে এটি এএফডির মতো রাশিয়াপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রচারকেও শক্তিশালী করে।With Messaging That Mirrors Putin's, Germany's Far-Right Party Gains Ground  - The New York Times

ন্যাটোর শক্তিবৃদ্ধি কীভাবে ঘটল

একই ধরনের কৌশল সামরিক ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র নরওয়েতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম লঞ্চার নিয়ে সামরিক মহড়া চালানোর প্রস্তুতি নিলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ একে নতুন নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন। এর কয়েক দিন পর ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা জানায়, ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত একটি রুশ ইউনিট পূর্ব বেলারুশের দিকে যাচ্ছে, ন্যাটোর সীমান্তের কাছাকাছি।

দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতার মধ্যেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ওরেশনিক পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এবং এর পাল্লা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। বিপরীতে টমাহক তুলনামূলক ধীরগতির এবং পারমাণবিক অস্ত্র বহনের জন্য ব্যবহৃত হয় না। নরওয়ের মহড়ায় কোনো টমাহক ছোড়া হয়নি; মূলত প্রয়োজনে লঞ্চারগুলো ইউরোপে দ্রুত নিয়ে আসা সম্ভব কি না, সেটিই পরীক্ষা করা হয়েছিল।

তবে এর মধ্যকার বড় সত্যটি হলো—রাশিয়ার চারপাশের নিরাপত্তা পরিবেশ আগের তুলনায় নিঃসন্দেহে বদলেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের বড় অংশই মস্কোর নিজের কর্মকাণ্ডের ফল।

২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ক্রিমিয়া দখল করে, তখন ন্যাটোর সম্প্রসারণকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছিল মস্কো। কিন্তু সে সময় পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি আজকের মতো ছিল না। ১৯৯৬ সালে ন্যাটো নতুন পূর্ব ইউরোপীয় সদস্যদের ভূখণ্ডে স্থায়ী ঘাঁটি না বসানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। ২০১৭ সালের আগে সেখানে এ ধরনের স্থায়ী উপস্থিতিও তৈরি হয়নি। ইউক্রেনের সংবিধানেও তখন ন্যাটো সদস্য হওয়ার পথ বন্ধ ছিল এবং দেশটির জনগণের মধ্যেও এ বিষয়ে আগ্রহ সীমিত ছিল। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় কমছিল, এমনকি ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে তার শেষ সক্রিয় ট্যাংকও সরিয়ে নেয়।

২০২২ সালের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেয়। ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়তে শুরু করে, বিশেষ করে জার্মানি এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনে। মার্কিন ট্যাংক আবার ইউরোপে ফিরে আসে এবং পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি জোরদার হয়। একই সময়ে ন্যাটোর সদস্যপদ ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে এবং এর পক্ষে দেশটিতে ব্যাপক জনসমর্থনও তৈরি হয়েছে।

মস্কোর জন্য যুদ্ধের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা

পুতিনের জন্য এই পরিবর্তন একটি রাজনৈতিক সুবিধাও তৈরি করেছে। রাশিয়ার অভ্যন্তরে তিনি পশ্চিমা হুমকিকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, যাতে ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সেনাদের মৃত্যুকে শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাতের অংশ হিসেবে নয়, বরং দেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখানো যায়।

ইউরোপেও একই বয়ান ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাশিয়া এবং ইউরোপের কিছু জনতাবাদী রাজনৈতিক দল দাবি করছে, ইউক্রেনকে অস্ত্র ও অর্থ দেওয়া এবং ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠন করা আসলে যুদ্ধ উসকে দেওয়ার শামিল। এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পারমাণবিক ধ্বংসের আশঙ্কা।

ন্যাটোর কোনো সদস্যই রাশিয়াকে আক্রমণ করার আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কিন্তু রাজনৈতিক প্রচারে বাস্তবতার চেয়ে আশঙ্কা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। আর সেই জায়গাতেই এএফডির মতো দলগুলোর সাফল্য মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আগামী দিনের বড় পরীক্ষা

স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির সাফল্য হয়তো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আগামী এক বছরে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও উগ্র ডানপন্থী ও রাশিয়াপন্থী দলগুলোর নির্বাচনী অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ইউক্রেনকে অর্থায়ন এবং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার প্রশ্নে।

ফ্রান্স এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মেরিন ল্য পেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল র‍্যালি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। দলটির সভাপতি জর্দান বারদেলাও সম্প্রতি বলেছেন, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় অর্থ দেওয়া বন্ধ করার সময় এসেছে।

এই রাজনৈতিক প্রবণতাগুলো পুতিনের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য রাশিয়ার ওপর বাড়লেও তিনি যদি মনে করেন সময় তার পক্ষেই কাজ করছে, তাহলে আপসের প্রয়োজনও কম অনুভব করবেন।

তার প্রত্যাশা হতে পারে—ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনকে পশ্চিমা সহায়তা থেকে বঞ্চিত করবে, পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন বাড়াবে এবং ন্যাটোর ঐক্য দুর্বল করবে। সে ক্ষেত্রে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পাশাপাশি ইউরোপের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যও যুদ্ধের ফলাফলের অংশ হয়ে উঠবে।