বেশি আয় করলেই সুবিধা হারানোর নিয়ম বদলে সব কর্মজীবী পরিবারের জন্য ৩০ ঘণ্টা বিনামূল্যের শিশুসেবার প্রতিশ্রুতি
ব্রিটেনে বছরে ১ লাখ পাউন্ডের বেশি আয় করা অভিভাবকদের জন্য বিনামূল্যের শিশুসেবা সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, সেটিকে ‘অযৌক্তিক ফাঁদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে পুরোপুরি তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি। দলটির নেতা কেমি বেডেনক জানিয়েছেন, তারা ক্ষমতায় ফিরলে আয় যতই হোক, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা পূরণকারী অভিভাবকদের জন্য শিশুসেবা সহায়তা চালু রাখা হবে।
৪ অক্টোবর ২০২৬, রোববার দলটির বার্ষিক সম্মেলন শুরু হয়েছে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে। সম্মেলনকে সামনে রেখে নতুন এই নীতির ঘোষণা দিয়েছে কনজারভেটিভরা। দলটির দাবি, বর্তমান ব্যবস্থায় সামান্য বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতির পর কোনো কোনো পরিবার উল্টো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে অনেক অভিভাবক অতিরিক্ত কাজ, বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতি গ্রহণের বিষয়ে দ্বিধায় পড়তে পারেন।

বর্তমানে ইংল্যান্ডে ৯ মাস থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুর কর্মজীবী অভিভাবকেরা শর্তসাপেক্ষে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৩০ ঘণ্টা বিনামূল্যের শিশুসেবা পেতে পারেন। এই সুবিধা বছরে ৩৮ সপ্তাহ পর্যন্ত দেওয়া হয়। তবে অভিভাবক বা তার সঙ্গীর প্রত্যাশিত সমন্বিত নিট আয় বছরে ১ লাখ পাউন্ডের বেশি হলে এই সুবিধার জন্য যোগ্যতা থাকে না।
একই ১ লাখ পাউন্ডের সীমা করমুক্ত শিশুসেবা হিসাবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই ব্যবস্থায় অভিভাবক প্রতি ৮ পাউন্ড জমা দিলে সরকার আরও ২ পাউন্ড যোগ করে, যা প্রতি শিশু বছরে সর্বোচ্চ ২ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু কোনো অভিভাবকের আয় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে সেই সহায়তাও বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে ৩ ও ৪ বছর বয়সী সব শিশুই পরিবারের আয় বিবেচনা ছাড়াই সপ্তাহে ১৫ ঘণ্টা বিনামূল্যের শিশুসেবার অধিকারী। ফলে ১ লাখ পাউন্ডের সীমাটি মূলত কর্মজীবী অভিভাবকদের অতিরিক্ত ৩০ ঘণ্টার সুবিধা এবং করমুক্ত শিশুসেবা ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলে।
কনজারভেটিভদের প্রস্তাব কার্যকর হলে এই আয়সীমা পুরোপুরি তুলে দেওয়া হবে। দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন, এমন সব অভিভাবকই ৩০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিনামূল্যের শিশুসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ বছরে ১ লাখ পাউন্ডের বেশি আয় করলেও শুধু সেই কারণে আর সুবিধা হারাতে হবে না।
বেডেনক বলেন, বেশি কাজ বা বেশি আয় করার কারণে কাউকে শাস্তির মুখে পড়া উচিত নয়। তার যুক্তি, বর্তমান ব্যবস্থা পরিবারকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলছে যেখানে একটি পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধির পর শিশুসেবার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত আয়ও পুরোপুরি লাভ হিসেবে থাকছে না। তার মতে, এর প্রভাব কর্মসংস্থান, পরিবার গঠন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও পড়তে পারে।
কনজারভেটিভদের ভাষ্য, আয়সীমার কারণে বিশেষ করে অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হতে পারেন, কারণ বাস্তবে শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব অনেক পরিবারে মায়ের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ে। তাই এই সীমা তুলে দেওয়া একদিকে পরিবারবান্ধব এবং অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সহায়ক হবে বলে দলটি মনে করছে।
তবে প্রস্তাবটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর আওতায় অত্যন্ত উচ্চ আয়ের পরিবারও চলে আসবে। বেডেনককে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বছরে ১০ লাখ পাউন্ড আয় করা কোনো ব্যক্তি বা পরিবারও কি এ সুবিধা পেতে পারে? তিনি আয় দিয়ে মানুষকে আলাদা না করার পক্ষে অবস্থান নেন এবং বলেন, লক্ষ্য হলো বেশি কাজ বা বেশি উপার্জনের ক্ষেত্রে যেন সরকারি নীতিই বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। কনজারভেটিভরা জানিয়েছে, প্রস্তাবটির আনুমানিক বার্ষিক খরচ হবে প্রায় ৭০ কোটি পাউন্ড। এই অর্থ জোগাতে সরকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, এমন বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় কর্মীসংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। দলটির হিসাবে, ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে এসব পদ কমিয়ে প্রায় ১৬০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
এই সাশ্রয়ের পরিকল্পনায় আর্টস কাউন্সিল ইংল্যান্ড ও এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির মতো সরকারি কাঠামোর বাইরে পরিচালিত সংস্থাগুলোতে কর্মীসংখ্যা কমানোর কথা বলা হয়েছে। তবে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এই কর্মী কমানোর আওতার বাইরে রাখা হবে বলে জানিয়েছে দলটি।

কনজারভেটিভদের দাবি, শিশুসেবার এই পরিবর্তন হবে করব্যবস্থাকে আরও সহজ, ন্যায্য ও কর্মবান্ধব করার বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। দলটির ছায়া অর্থমন্ত্রী অ্যান্ড্রু গ্রিফিথ সম্মেলনে করব্যবস্থার এমন কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তবে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি প্রস্তাবটির সমালোচনা করেছে। তাদের বক্তব্য, বেশি আয়ের মানুষের জন্য সুবিধা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া কনজারভেটিভদের নীতির একটি দিক তুলে ধরে। লেবারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান আয়সীমা কনজারভেটিভ সরকারের সময়ই নির্ধারিত হয়েছিল। একই সঙ্গে লেবার সরকার ৩০ ঘণ্টার সরকারি অর্থায়নভিত্তিক শিশুসেবা এবং পরিবারগুলোর জন্য অন্যান্য সহায়তা বাড়ানোর কথা বলেছে।
বর্তমান ব্যবস্থার সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘ক্লিফ এজ’ বা হঠাৎ সুবিধা হারানোর সমস্যা। অর্থাৎ নির্দিষ্ট আয়সীমার ঠিক নিচে থাকা একটি পরিবার যে সুবিধা পাচ্ছে, সামান্য আয় বাড়িয়ে সীমা অতিক্রম করলেই তারা একসঙ্গে বড় ধরনের সহায়তা হারাতে পারে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, এমন কাঠামো মানুষকে বেশি উপার্জনের পরিবর্তে আয়সীমার নিচে থাকার জন্য উৎসাহিত করতে পারে।
কনজারভেটিভদের এই ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে, যখন দলটি ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর নিজেদের নতুন রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করছে। বার্মিংহামের সম্মেলনে সামনে আরও বেশ কিছু নীতির ঘোষণা দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে লেবার ও রিফর্ম ইউকের তুলনায় পিছিয়ে থাকা অবস্থান বদলানোই তাদের বড় রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোর একটি।
সব মিলিয়ে, ১ লাখ পাউন্ড আয়ের সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাবটি শুধু শিশুসেবা ব্যয়ের বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান, করনীতি, পরিবার গঠন এবং উচ্চ আয়ের মানুষের প্রতি সরকারি সহায়তার সীমা নিয়ে ব্রিটেনে নতুন বিতর্কও তৈরি করতে পারে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা অবশ্য নির্ভর করবে কনজারভেটিভরা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরতে পারে কি না এবং তাদের অর্থায়ন পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মতভাবে কার্যকর করা যায় তার ওপর।












