দেশের ৬৩টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি এখন পুঞ্জীভূত লোকসানে। এসব ব্যাংকের মোট পুঞ্জীভূত লোকসান ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাবে এই চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে। অর্থ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। পরে সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের তথ্য জানানো হয়। দেশের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ ব্যাংক যে বড় সংকটে, এই প্রতিবেদন সেটিই স্পষ্ট করল।
২২ ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে থাকার তালিকায় চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে। এগুলো হলো জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। দুটি বিশেষায়িত ব্যাংকও আছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। বাকিগুলোর মধ্যে ১৫টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও একটি বিদেশি ব্যাংক। বেসরকারি ব্যাংকগুলো হলো এবি, বাংলাদেশ কমার্স, এক্সিম, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, আইসিবি ইসলামিক, আইএফআইসি, ইসলামী, মেঘনা, ন্যাশনাল, গ্লোবাল ইসলামী, পদ্মা, সীমান্ত, সোশ্যাল ইসলামী, দ্য প্রিমিয়ার ও ইউনিয়ন ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংকটি হলো ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক মোট ছয়টি, তার চারটিই এই তালিকায়। অর্থাৎ সরকারি মালিকানার ব্যাংকগুলোর অবস্থাই সবচেয়ে নাজুক।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে পুরো ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা হয়েছে মাত্র ৭৮৯ কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে খাতটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ দৈনন্দিন ব্যবসা থেকে যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে ক্ষতি পোষানো যাচ্ছে না। পুঞ্জীভূত লোকসান মানে বছরের পর বছর জমে ওঠা ক্ষতি। এই ক্ষতি ব্যাংকের মূলধন খেয়ে ফেলে। মূলধন দুর্বল হলে ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাও কমে যায়। ২২ ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে থাকার অর্থ, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকের মূলধন ইতিমধ্যে চাপে পড়েছে। পরিচালন মুনাফা হলো খরচ বাদে ব্যবসা থেকে আয়। এর পর খারাপ ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি রাখা ও কর মেটানোর পর যা থাকে, সেটিই নিট মুনাফা বা লোকসান।
বৈঠকে কমিটির সদস্যরা ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানান। পরবর্তী বৈঠকে সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে কমিটি। খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়া দেশের ব্যাংক খাতের পুরোনো সমস্যা। সম্প্রতি খেলাপি ঋণ আদায়ে নতুন আইনের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে সরকার। তারল্যসংকটে পড়া কিছু ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ সহায়তাও নিতে হয়েছে।
সাধারণ আমানতকারীর কাছে এই খবরের মানে সরল। তাঁরা জানতে চান, তাঁদের জমানো টাকা নিরাপদ কি না। লোকসানে থাকা ব্যাংক মানেই আমানত ঝুঁকিতে, এমন নয়। তবে দীর্ঘ সময় লোকসান চলতে থাকলে আস্থা নড়ে যায়। তাই ২২ ব্যাংক পুঞ্জীভূত লোকসানে থাকার এই চিত্র সামনে আসার পর সরকারের পরিকল্পনা জানা জরুরি। কোন ব্যাংক একীভূত হবে, কোনটিতে নতুন মূলধন আসবে, আর কোনটির পরিচালনায় পরিবর্তন আসবে, সেই রূপরেখা দ্রুত স্পষ্ট করা দরকার। আতঙ্কে একসঙ্গে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা বরং সংকট বাড়ায়। তাই স্পষ্ট তথ্য আর বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনাই আস্থা ফেরানোর পথ। ব্যাংক খাতের সংস্কার যত দেরি হবে, ক্ষতির অঙ্কও তত বড় হবে।












