ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাণিজ্য আলোচনা এখন কার্যত একটি ‘স্থবির’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই দেশের পক্ষ থেকেই আরও বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ খুব সীমিত হয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তবে আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং সমঝোতার পথ খুঁজতে দুই দেশই এখনো কাজ করছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছে। এর মূল লক্ষ্য ছিল দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং বাজারে প্রবেশাধিকার, শুল্ক ও বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য কমানো। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় চুক্তি চূড়ান্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে সীতারামন বলেন, আলোচনায় এমন একটি পর্যায় এসেছে, যার পর দুই পক্ষের জন্যই আরও ছাড় দেওয়া ‘খুবই কঠিন’। তাঁর ভাষায়, এটি কঠোর ও জোরালোভাবে আলোচিত একটি চুক্তি। তারপরও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন একটি বিষয় দুই দেশের সমঝোতার জায়গাকে আরও সংকুচিত করেছে, রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এমন একটি আইনে স্বাক্ষর করেছেন, যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রুশ তেল কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা তাকে দিতে পারে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ভারত রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল ক্রেতা। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনে আসছে।
রুশ তেল কেনা কমানো ভারতের জন্যও সহজ সিদ্ধান্ত নয়। আমদানি কমলে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং সরকারের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন শুল্ক ভারতের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন এক ধরনের জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। একদিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী তেলের সরবরাহ ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি রয়েছে।
ভারত ইতিমধ্যে সতর্ক করে বলেছে, রাশিয়ার তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারও জানিয়েছিলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি এখনই হওয়ার মতো অবস্থায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
সীতারামন আরও বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে ঘাটতিতে রয়েছে, আর ভারতের পক্ষে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। ওয়াশিংটন এই ভারসাম্য কমাতে চাইছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্য রপ্তানি বেড়ে ৪২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্যগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে।
দুই পক্ষের দর-কষাকষিতে মূল সমস্যা হচ্ছে কে কতটা ছাড় দেবে। ওয়াশিংটন ভারতের কাছ থেকে আরও বাজার উন্মুক্ত করা ও অতিরিক্ত ছাড় চাইছে। অন্যদিকে নয়াদিল্লি মনে করছে, একতরফাভাবে ছাড় দিয়ে চুক্তি করা হলে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ভারতের অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া উচিত নয়।
সীতারামন একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ককে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতার সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবিলায় শুল্ককে ক্রমেই ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা শুধু দর-কষাকষির একটি উপকরণ হিসেবে শুল্ক ব্যবহারের প্রচলিত ধারণার বাইরে চলে গেছে।
ভারতের চীনের সঙ্গে বড় বাণিজ্য ঘাটতির উদাহরণও তিনি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ভারসাম্যও ভারতের বিপক্ষে। কিন্তু সেই ঘাটতি কমাতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজাই ভারতের পছন্দ। অর্থাৎ বাণিজ্য ঘাটতি থাকলেই শুল্ক চাপিয়ে দেওয়ার বদলে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা, ছাড় ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা তাই এখন শুধু শুল্ক বা বাজারে প্রবেশাধিকারের প্রশ্নে আটকে নেই। এর সঙ্গে রাশিয়ার তেল, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চেষ্টা এবং দুই দেশের বৃহত্তর কৌশলগত সম্পর্কও জড়িয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমেছে। দুই দেশই আলোচনা চালিয়ে গেলেও সমঝোতার জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়ের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্পর্কের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে মূলত শুল্ক, রুশ তেল আমদানি এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো জটিল বিষয়গুলোতে দুই পক্ষ কতটা বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে তার ওপর।












