সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন দ্রুত করতে একটি বিশেষ অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এর নাম বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬। রোববার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে খসড়াটি অনুমোদন পায়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের বিষয়টি জানান। সরকারের লক্ষ্য, আগামী গ্রীষ্মের আগেই ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যোগ করা। এর মাধ্যমে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো হবে। বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকিও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন অধ্যাদেশ কেন দরকার হলো, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছে সরকার। বিদ্যমান তিনটি আইনে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নেই। আইনগুলো হলো সরকারি ক্রয় আইন ২০০৬, ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন ২০২৬ এবং বিদ্যুৎ আইন ২০১৮। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগে প্রকল্প নিতে গিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। যেমন, ১৫ বছর ধরে বিদ্যুতের দাম কীভাবে ঠিক হবে, তার পরিষ্কার নিয়ম ছিল না। ছাদের ভাড়া বিদ্যুৎ দিয়ে শোধ করার ব্যবস্থাও আইনে ছিল না। রক্ষণাবেক্ষণের দায় কার, সেটিও অস্পষ্ট ছিল।
অধ্যাদেশে দুটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি ওপেক্স পদ্ধতি। এতে বেসরকারি বিনিয়োগকারী নিজের টাকায় সৌর প্যানেল বসাবেন। এরপর তিনি ভবনটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবেন। এই পদ্ধতিতে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ভবন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ছাদ ব্যবহার করা যাবে। দ্বিতীয়টি ক্যাপেক্স পদ্ধতি। যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় আছে, তারা নিজেদের টাকায় সৌরব্যবস্থা বসাতে পারবে। তখন ব্যবস্থাটির মালিকও হবে ওই প্রতিষ্ঠান। বিদ্যুৎ বিভাগ এর আগে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬ থেকে ২০৩০ তৈরি করেছে। নতুন অধ্যাদেশ সেই কৌশল বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি দেবে। এতে চুক্তির শর্ত নিয়ে অনিশ্চয়তাও কমার কথা।
বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনো আমদানি করা তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সেই চাপ সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে পড়ে। ডলার খরচ বাড়ে, ভর্তুকির বোঝাও বাড়ে। অথচ সরকারি অফিস, স্কুল, হাসপাতালের হাজার হাজার ছাদ এখন খালি পড়ে থাকে। এসব ছাদে সৌর প্যানেল বসলে দিনের বেলার বিদ্যুতের একটি অংশ স্থানীয়ভাবেই মিটবে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কিছুটা কমবে। সৌরব্যবস্থা একবার বসালে জ্বালানি কেনার খরচ আর লাগে না। শুধু রক্ষণাবেক্ষণের খরচ থাকে।
তবে কাগজে লক্ষ্য ঠিক করা আর মাঠে তা বাস্তবায়ন এক নয়। আগামী গ্রীষ্ম খুব দূরে নয়, হাতে আছে মাত্র কয়েক মাস। এত অল্প সময়ে কয়েক হাজার মেগাওয়াট ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বড় চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবেন কি না, তা নির্ভর করবে বিদ্যুতের দাম ও চুক্তির শর্ত কতটা স্পষ্ট হয় তার ওপর। সরকারি দপ্তরগুলো কত দ্রুত ছাদ ব্যবহারের অনুমতি দেয়, সেটিও বড় বিষয়। ছাদের মালিক প্রতিষ্ঠান আর বিনিয়োগকারীর মধ্যে দায়িত্ব পরিষ্কার না হলে প্রকল্প মাঝপথে আটকে যেতে পারে। দ্রুত ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে হলে নতুন আইনি কাঠামোকে সেই জট খুলতে হবে। তা পারলেই লক্ষ্যপূরণের পথ তৈরি হবে।












