ভারতের শেয়ারবাজারে নতুন রেকর্ড গড়তে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য শেয়ার বিক্রি শুরু করেছে টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জিও প্ল্যাটফর্মস। ৩২০ কোটি ডলারের এই প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৮৩০ কোটি ডলারে। এটি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইপিও হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রায় দুই দশক পর ধনকুবের মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠীর কোনো প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারে আসছে।
বুধবার, ২১ অক্টোবর শুরু হওয়া এই আইপিওতে বিনিয়োগকারীরা শুক্রবার পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন। প্রতি শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৬৫ থেকে ১ হাজার ১১৯ রুপির মধ্যে। বিক্রির জন্য রাখা মোট শেয়ারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষিত থাকবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য। রিলায়েন্সের কর্মী ও বিদ্যমান শেয়ারধারীরাও এই আইপিওতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
জিওর আইপিও ঘিরে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ
জিওর এই শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ ভারতের শেয়ারবাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে জিওর আইপিও পরীক্ষা করবে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কতটা শক্তিশালী রয়েছে।
জিও প্ল্যাটফর্মসের পেছনে রয়েছে মেটা, গুগল এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সমর্থন। প্রতিষ্ঠানটির অধীনে রয়েছে ভারতের বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ ব্যবসা। এর গ্রাহকসংখ্যা ৫০ কোটির বেশি। একক দেশের বাজারে গ্রাহকসংখ্যার হিসাবে চীনের চায়না মোবাইলের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ অপারেটর হিসেবে অবস্থান করছে জিও।
সর্বোচ্চ মূল্যায়ন কার্যকর হলে জিও ভারতের সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলোর তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে। ২৮ অক্টোবর শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরুর সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইপিও শুরুর আগেই বড় বিনিয়োগকারীদের সাড়া
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আবেদন শুরুর আগেই জিওর আইপিওতে বড় বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক ও ভারতীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রায় ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারের শেয়ার বরাদ্দ করেছে। এই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে আবুধাবি ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি ও ব্ল্যাকরকের মতো বড় প্রতিষ্ঠান।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষিত শেয়ারের বিপরীতে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ, এই শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের জন্য রাখা শেয়ারের তুলনায় চাহিদা ছিল প্রায় ৩০ গুণ।
আইপিওর আগেই এমন সাড়া প্রতিষ্ঠানটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ইঙ্গিত দেয়। তবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পর জিওর শেয়ারের দাম ও লেনদেনের গতিপ্রকৃতি কেমন হয়, তা নির্ভর করবে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার ওপর।
দুই দশক পর রিলায়েন্সের নতুন শেয়ারবাজার উদ্যোগ
রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠীর কোনো প্রতিষ্ঠান সর্বশেষ ২০০৬ সালে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে এসেছিল। প্রায় ২০ বছর পর জিওর এই উদ্যোগ আম্বানি পরিবারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের জন্য একটি বড় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মুকেশ আম্বানি ২০১৯ সালে পাঁচ বছরের মধ্যে জিওকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেরি হয়। ২০২৫ সালেও তালিকাভুক্তির উদ্যোগ পিছিয়ে যায়। পরে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আইপিও বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় সম্ভাব্য সময়সূচি আবার পরিবর্তন করা হয়।
জিওর বর্তমান আইপিওর আকার ভারতের আগের বড় শেয়ারবাজার উদ্যোগগুলোকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। হুন্দাই মোটর ইন্ডিয়া ও ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির ঘটনাও এই আইপিওর তুলনায় ছোট হতে পারে।
সস্তা ইন্টারনেট দিয়ে ভারতের বাজার দখল
২০১৬ সালে জিওর টেলিযোগাযোগ ব্যবসা শুরু হয়। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি কম দামে ইন্টারনেট এবং বিনা মূল্যে ভয়েস কলের সুবিধা দিয়ে ভারতীয় বাজারে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এর ফলে ভারতী এয়ারটেল ও ভোডাফোন আইডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
কম খরচে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার কৌশল জিওকে দ্রুত বাজারের শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে যায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির টেলিযোগাযোগ ব্যবসার নেতৃত্বে রয়েছেন মুকেশ আম্বানির ছেলে আকাশ আম্বানি।
জিওর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো বিশাল গ্রাহকসংখ্যা, মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যাপক ব্যবহার এবং টেলিযোগাযোগ সেবার চাহিদা। এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটি ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
আয় ও মুনাফার প্রধান উৎস টেলিযোগাযোগ
২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে জিও প্ল্যাটফর্মসের আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি ডলার। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা হয়েছে প্রায় ৩২০ কোটি ডলার।
এই আয় ও মুনাফার প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছে টেলিযোগাযোগ ব্যবসা থেকে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
৫০ কোটির বেশি গ্রাহকের বাজারে অবস্থান জিওকে বড় আয়ের ভিত্তি দিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং গ্রাহকদের চাহিদার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।
উৎসবের মৌসুমে আইপিওর আয়োজন
ভারতের হিন্দু ধর্মীয় উৎসবের মৌসুমে আইপিওটি বাজারে এনেছে জিও। দেশটিতে এই সময়কে কেনাকাটা ও বিনিয়োগের জন্য শুভ বলে বিবেচনা করেন অনেকে। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতীয় শেয়ারবাজারে লেনদেনের গতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে রিলায়েন্স আগেভাগেই কিছু প্রস্তুতি নিয়েছে। চলতি মাসে প্রতিষ্ঠানটির চার লাখের বেশি কর্মীকে নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৫ দিন আগেই বেতন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইপিওতে আবেদন করতে আগ্রহীদের শেয়ার লেনদেনের হিসাব খোলার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আইপিওতে আবেদনকারীর সংখ্যা এবং শেষ পর্যন্ত শেয়ারের চাহিদা কতটা দাঁড়ায়, তা জানা যাবে আবেদনপর্ব শেষ হওয়ার পর।
তালিকাভুক্তির পর নজর থাকবে শেয়ারের দামে
জিও প্ল্যাটফর্মসের আইপিও ভারতের পুঁজিবাজারে নতুন মাইলফলক তৈরি করতে পারে। সর্বোচ্চ মূল্যায়ন কার্যকর হলে প্রতিষ্ঠানটি দেশটির অন্যতম বৃহৎ কোম্পানিতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ এবং ভারতের প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে।
তবে বড় আকারের আইপিও হলেই তালিকাভুক্তির পর শেয়ারের দাম বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বাজারের পরিস্থিতি, প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ আয়, মুনাফা ধরে রাখার সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা শেয়ারের দামে প্রভাব ফেলবে।
শুক্রবার আবেদনপর্ব শেষ হওয়ার পর এবং ২৮ অক্টোবর সম্ভাব্য লেনদেন শুরুর সময় জিওর আইপিওর প্রকৃত চাহিদা আরও স্পষ্ট হবে। এই ফলাফল ভারতের শেয়ারবাজারে ভবিষ্যতের বড় প্রযুক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আইপিও আয়োজনেও প্রভাব ফেলতে পারে।












