ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ও বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলাকে একীভূত করার সম্ভাবনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ এ বিষয়ে পৃথক বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। মাস্ক বলেছেন, দুই প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে চুক্তির শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি, এমনকি শেষ পর্যন্ত একীভূতকরণ নাও হতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের একজন ইলন মাস্কের এই মন্তব্যের পর শেয়ারবাজারে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম নিয়মিত লেনদেন-পরবর্তী বাণিজ্যে ৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে টেসলার শেয়ারের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। দুই প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য একীভূতকরণ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছিল। তবে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষ কমিটি গঠনের বিষয়টি এবারই প্রথম নিশ্চিত করলেন মাস্ক।
বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক বৈঠকে মাস্ক বলেন, স্পেসএক্স ও টেসলাকে এক ছাতার নিচে আনার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত চিপ নকশা, রোবট তৈরি, মহাকাশে পণ্য ও প্রযুক্তি পাঠানো এবং যোগাযোগব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রে দুই প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে বড় ধরনের সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
তবে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনায় তিনি সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না। দুই প্রতিষ্ঠানেই তাঁর স্বার্থ জড়িত থাকায় স্বাধীন পরিচালকদের নিয়ে গঠিত বিশেষ কমিটিগুলো আলোচনা পরিচালনা করছে। মাস্কের ভাষ্য অনুযায়ী, শেয়ারহোল্ডারদের অনুরোধে কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হলে তা শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনও পেতে হবে।
তিনি আরও জানান, দুই কমিটি এখনো লেনদেনের শর্তে একমত হয়নি। তাই স্পেসএক্স ও টেসলার একীভূতকরণ নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সময় আসেনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবসায় দ্রুত উত্থান
স্পেসএক্সের ব্যবসায় বড় পরিবর্তন আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যকেন্দ্রের অবকাঠামো। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬১ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪৫৮ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট আয় প্রায় ১০ গুণ বেড়ে ৭৫৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই আয়ের বড় অংশ এসেছে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্যকেন্দ্রের কম্পিউটিং সক্ষমতা ভাড়া দেওয়ার মাধ্যমে। এসব গ্রাহকের মধ্যে রয়েছে অ্যানথ্রপিক, গুগল এবং রিফ্লেকশন এআই।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, স্পেসএক্সের ব্যবসা এখন শুধু রকেট উৎক্ষেপণ কিংবা স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বড় কম্পিউটিং অবকাঠামো সরবরাহকারী হিসেবেও গড়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার চাহিদা বাড়ায় এই ব্যবসা থেকে আয়ও দ্রুত বাড়ছে।
তবে এই সম্প্রসারণে ব্যয়ও বাড়ছে। তৃতীয় প্রান্তিকে স্পেসএক্সের মূলধনি ব্যয় প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১ হাজার ৯৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। চতুর্থ প্রান্তিকে এই খাতে আরও ৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ৪ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ব্রেট জনসেন।
এত বড় বিনিয়োগের মধ্যেও তৃতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। স্পেসএক্সের নিট মুনাফা হয়েছে ৪৪০ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ১১০ কোটি ডলার লোকসান হয়েছিল। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল, এবার মুনাফা হতে পারে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলার। বাস্তবে মুনাফা সেই পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে।
সমন্বিত হিসাবে শেয়ারপ্রতি আয় হয়েছে ৪৫ সেন্ট, যেখানে বিশ্লেষকদের গড় প্রত্যাশা ছিল ১৩ সেন্ট। পুঁজিবাজারে স্পেসএক্সের প্রথম মুনাফার এই ফল প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণে কেন আগ্রহ মাস্কের
স্পেসএক্স ও টেসলার কার্যক্রম আলাদা হলেও প্রযুক্তিগতভাবে তাদের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। টেসলা বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও রোবট তৈরিতে কাজ করছে। অন্যদিকে স্পেসএক্সের মূল ব্যবসা রকেট উৎক্ষেপণ, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এবং মহাকাশ প্রযুক্তি ঘিরে। দুই প্রতিষ্ঠানই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চিপ এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার উন্নয়নে আগ্রহী।
মাস্কের মতে, দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সফটওয়্যার তৈরি, নিজস্ব চিপ উৎপাদন, রোবটের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে।
দুই প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে টেরাফ্যাব নামের একটি চিপ উৎপাদন উদ্যোগেও যুক্ত। মাস্ক জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের প্রথম পরীক্ষামূলক চিপ আগামী বছরের মে বা জুনে তৈরি হতে পারে। ২০২৮ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের মধ্যে বড় পরিসরে চিপ উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।
চিপ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াতে পারলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত উপাদানের সরবরাহে প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ভরতা কমতে পারে। তবে পরিকল্পিত সময়সূচি বাস্তবায়ন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
মাস্কের মালিকানার কাঠামোও সম্ভাব্য একীভূতকরণকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। টেসলায় তাঁর মালিকানা প্রায় ২০ শতাংশ এবং স্পেসএক্সে প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। দুই প্রতিষ্ঠান একীভূত হলে সম্মিলিত প্রতিষ্ঠানে তাঁর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
আলোচনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য চুক্তির একটি পথ হতে পারে স্পেসএক্সের টেসলাকে অধিগ্রহণ করা। তবে বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। টেসলা এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটি বিনিয়োগ ব্যাংকের সঙ্গেও কাজ করছে বলে জানা গেছে।
স্টারলিংকের আয় বাড়লেও গ্রাহকপ্রতি আয় কমছে
স্পেসএক্সের ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা। নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং ব্যক্তিগত গ্রাহক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উড়োজাহাজ, জাহাজ ও সরকারি সংস্থার জন্য সেবা সম্প্রসারণের ফলে গ্রাহকসংখ্যা বাড়ছে।
তৃতীয় প্রান্তিকে স্টারলিংকের গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখে। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ২১ লাখ ৯০ হাজার গ্রাহক। অর্থাৎ গ্রাহকসংখ্যার দিক থেকে প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছে।
তবে নতুন বাজারে প্রবেশ এবং তুলনামূলক কম দামের প্যাকেজ চালুর কারণে গ্রাহকপ্রতি গড় মাসিক আয় কমেছে। ২০২৩ সালে এই আয় ছিল ৯৯ ডলার, যা ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে নেমে এসেছে ৬৯ ডলারে।
ধনী দেশগুলোর বাইরেও সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে স্পেসএক্সের। এতে নতুন গ্রাহক পাওয়া গেলেও গ্রাহকপ্রতি গড় আয় আরও কমতে পারে। ফলে স্টারলিংকের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে গ্রাহকসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি লাভজনকতা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
স্টারশিপের সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
স্পেসএক্সের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু স্টারশিপ নামের পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটব্যবস্থা। এটি এখনো বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নিয়মিতভাবে ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে ভবিষ্যতে বড় আকারের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং মহাকাশে কম্পিউটিং অবকাঠামো স্থাপনে এই রকেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্টারশিপকে নির্ভরযোগ্যভাবে বারবার ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে পারলে মহাকাশে সরঞ্জাম পাঠানোর ব্যয় কমানো এবং বড় আকারের প্রযুক্তিগত প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হতে পারে। অন্যদিকে রকেটটির উন্নয়ন ও পরীক্ষায় বিলম্ব হলে স্পেসএক্সের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বাধার মুখে পড়তে পারে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মহাকাশ বিভাগে বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ, সরকারি মিশন এবং স্টারশিপের উন্নয়ন কার্যক্রম রয়েছে। এসব খাত ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করলেও ব্যয় ও অনিশ্চয়তা উল্লেখযোগ্য।












