চলতি বছরের প্রথম সাড়ে নয় মাসেই দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০০০ সালে রোগটির সংক্রমণের হিসাব সংরক্ষণ শুরুর পর এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। একই সময়ে ডেঙ্গুতে ৩৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা গত ২৬ বছরের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের তথ্যের ভিত্তিতেই এই পরিসংখ্যান তৈরি হয়েছে। উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও যারা পরীক্ষা করাননি, বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েছেন কিংবা হাসপাতালের বাইরে চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন, তারা এই হিসাবের বাইরে রয়েছেন। ফলে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে ২০২৩ সালে দেশে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই বছর মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। মৃত্যুর হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে ২০২৪ সাল। সে বছর ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান ৫৭৫ জন। ২০২৫ সালেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা যান ৪১৩ জন।
জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে বাড়ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও বাতাসের আর্দ্রতায় পরিবর্তন আসছে। এর প্রভাব পড়ছে এডিস মশার বংশবিস্তার, বিস্তার ও আচরণে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জমে থাকা পানি অপসারণে দুর্বলতা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর উদ্যোগের অভাব ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
দীর্ঘদিন ধরে মশার ওষুধ ছিটানো ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে প্রচলিত মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উড়ন্ত মশা মারার ওপর নির্ভর না করে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা, লার্ভা ধ্বংস করা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ও জাপানের ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স টোকিওর গবেষক চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ খানের মতে, মশা নিধনের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে লোকদেখানো কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কোথায় মশা বংশবিস্তার করছে, তা শনাক্ত করে সেসব স্থানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি মনে করেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও যুক্ত করা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘স্কুল অ্যাম্বাসাডর’ কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের পরিবার ও সমাজের অন্য সদস্যদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মশক নিধন ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নির্মূল এবং নিয়মিত তদারকিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো এলাকায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পর তা পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হলেও পরিকল্পিত মশক নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা এবং কার্যকর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সংক্রমণ কমিয়ে রাখা সম্ভব।
বর্ষার বাইরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ
একসময় জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গুর প্রধান মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরের অন্যান্য সময়েও এই রোগের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। ফলে শুধু বর্ষাকালকে কেন্দ্র করে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার ধরন বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। এর ফলে এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গু সংক্রমণের ধরনে পরিবর্তন আসছে।
তার মতে, পরিবর্তিত পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল নতুন করে সাজাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রশমন ও অভিযোজন, এই দুটি পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ। মশক নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষে জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ মোকাবিলা করা কঠিন হলেও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
এ জন্য কোন তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতিতে এডিস মশার বিস্তার বাড়ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে মশা নিয়ন্ত্রণের সময়, পদ্ধতি ও কার্যক্রমের এলাকা নির্ধারণ করা গেলে প্রতিরোধব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে।
এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৩৬৬ জন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৬৬ জন।
মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালের রোগী ছিলেন। বরিশাল সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় দুজন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।
নতুন রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১০ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১১৩ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪১৫ জন।
এ ছাড়া বরিশালে ১৯১ জন, চট্টগ্রামে ১০৫ জন, খুলনায় ১৪১ জন, ময়মনসিংহে ৮০ জন, রাজশাহীতে ১২৮ জন, রংপুরে ৭২ জন এবং সিলেটে ১১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গুর সংক্রমণ শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলাতেও রোগীর চাপ বাড়ছে। ফলে রাজধানীকেন্দ্রিক কার্যক্রমের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
হটস্পট শনাক্ত করে পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মৃত ব্যক্তিদের অধিকাংশই অসুস্থ হওয়ার তিন দিন বা তারও পরে হাসপাতালে এসেছিলেন।
তিনি জানান, ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি এমন এলাকা শনাক্ত করে সেখানে মশার লার্ভা ধ্বংস ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ কাজে সিটি করপোরেশনগুলোও যুক্ত রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ঠিকানা যাচাই করে যেসব এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছেন, সেসব এলাকায় দ্রুত বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও লার্ভা ধ্বংসের ওষুধ প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর দাবি, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের কার্যক্রমে কোনো ঘাটতি নেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মেয়র, প্রশাসক এবং স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে আলোচনা করছেন।
তবে সংক্রমণের উচ্চ হার ও মৃত্যুর সংখ্যা বলছে, চলমান কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার পরিবর্তে মশার বংশবিস্তার বন্ধ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে টেকসই ফল পেতে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনায় জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ জোরদার করা না গেলে ডেঙ্গুর বাড়তি চাপ সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।












