মদ্যপানের আসক্তি কাটিয়ে ওঠার পর জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর কথা ছিল সারাহ হেপোলার। কিন্তু মদ ছাড়ার পরও তাঁর জীবনে অন্ধত্ব তৈরি করেছে প্রেম। তীব্র আকর্ষণ, একাকিত্ব আর সম্পর্কের প্রত্যাশা তাঁকে বারবার এমন পুরুষদের দিকে টেনেছে, যাঁরা তাঁকে কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা, স্থিতিশীলতা কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। মার্কিন লেখক হেপোলার নতুন স্মৃতিকথা ‘দ্য অনলি থিং দেয়ার ইজ টু ওয়ান্ট’ এই তিনটি অসমাপ্ত প্রেমের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছে আকাঙ্ক্ষা, আত্মপ্রবঞ্চনা ও সম্পর্কের অসমতার জটিল অভিজ্ঞতা।
বইটি নিয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ১ অক্টোবরের পর্যালোচনায় লেখক লরা কিপনিস দেখিয়েছেন, হেপোলার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শুধু ব্যর্থ প্রেমের বিবরণ নয়; এটি এমন এক মানসিক অবস্থার অনুসন্ধান, যেখানে ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে অন্যের অবহেলা মেনে নিতে এবং নিজের প্রয়োজনকে আড়াল করতে বাধ্য করে।
মদ ছাড়লেও কাটেনি আত্মপ্রবঞ্চনার প্রবণতা
হেপোলার আগের স্মৃতিকথা ‘ব্ল্যাকআউট’-এ উঠে এসেছিল অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে স্মৃতিশূন্যতা, নিজের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো সম্পর্কে অন্ধকারে থাকার অভিজ্ঞতা। ত্রিশের কোঠার শুরুতে এক হোটেলকক্ষে অচেনা এক পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়ানোর পর কীভাবে সেখানে পৌঁছেছিলেন, তা মনে করতে না পারার ঘটনা দিয়ে বইটি শুরু হয়েছিল।

নতুন স্মৃতিকথায় হেপোলা ফিরে গেছেন তাঁর পরবর্তী জীবনে। ৩৫ বছর বয়সে মদ্যপান ছেড়ে দেওয়ার পর শুরু হওয়া প্রেমের সম্পর্কগুলোই বইটির কেন্দ্রবিন্দু। তবে লেখকের পর্যবেক্ষণে, মদের মতো প্রেমও হেপোলার বিচারবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আকর্ষণ তাঁকে আনন্দ দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, যা তাঁর নিজের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিন পুরুষ, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ অধরা
বইটিতে তিনজন পুরুষের সঙ্গে হেপোলার সম্পর্কের কথা এসেছে। তাঁদের একজন নিউ অরলিন্সের একজন পুলিশ গোয়েন্দা, দ্বিতীয়জন বিবাহিত ব্যবসায়ী এবং তৃতীয়জন তাঁর চেয়ে ১৪ বছরের ছোট এক আকর্ষণীয় পুরুষ। সম্পর্কগুলো ভিন্ন সময়ে গড়ে উঠলেও পরিণতি প্রায় একই। কেউই তাঁকে স্বামী, সন্তান ও স্থিতিশীল সংসারের সেই ভবিষ্যৎ দিতে পারেননি, যা তিনি চাইতেন। শেষ পর্যন্ত তিনজনই অন্য নারীর সঙ্গে বিবাহিত থাকেন বা বিবাহিত জীবন বজায় রাখেন। এদিকে হেপোলার সন্তান ধারণের সম্ভাবনাময় বয়সও পেরিয়ে যেতে থাকে।
গল্পটি সরল কালানুক্রমে এগোয় না। অতীতের সম্পর্ক, বিচ্ছেদ এবং পরবর্তী সময়ে অন্যদের সঙ্গে পরিচয়ের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে লেখক নিজের আবেগের পুনরাবৃত্ত ধারা তুলে ধরেছেন। একসময় বিবাহিত ব্যবসায়ীর স্ত্রী তাঁদের সম্পর্কের কথা জানতে পারেন। তাঁদের গোপন সম্পর্কের সমঝোতায় দীর্ঘস্থায়ী পরকীয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল না। স্ত্রী বিষয়টি জানার পর পুরুষটি হেপোলার কাছ থেকে দ্রুত সরে যান।
পুলিশ গোয়েন্দার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল হেপোলা ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর। এক দশক আগে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর পুনরায় যোগাযোগ হলেও তাঁদের সংক্ষিপ্ত সম্পর্কের বড় অংশজুড়ে ছিল ওই পুরুষের মদ্যপ অবস্থায় থাকা। আর সবচেয়ে কমবয়সী পুরুষটির সঙ্গে হেপোলার যোগাযোগের বড় অংশই ছিল খুদে বার্তায়; তিনিও দীর্ঘ সময়ের জন্য উধাও হয়ে যেতেন।

বার্তার অপেক্ষা, অবহেলা আর ভালোবাসার ভ্রম
কিপনিসের পর্যালোচনায় আধুনিক প্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে—মুঠোফোনের পর্দায় আসা সামান্য মনোযোগও কীভাবে গভীর আবেগের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। একটি বার্তার শব্দ তখন স্বীকৃতির অনুভূতি দেয়, আর দীর্ঘ নীরবতা তৈরি করে প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা। এতে সম্পর্কের পারস্পরিকতা কমে গিয়ে অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তাই প্রধান অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
হেপোলা নিজের অনুভূতি প্রকাশে অকপট। তাঁর লেখায় রসবোধ ও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে। কিন্তু পর্যালোচকের মতে, কখনো কখনো তিনি পুরুষদের অবহেলামূলক আচরণকে উচ্চকিত রোমান্টিক ভাষায় ব্যাখ্যা করে সেই আচরণের বাস্তব তাৎপর্য আড়াল করেন। বিবাহিত পুরুষটির জন্য নিজের চাহিদা বিসর্জন দেওয়াকে তিনি সম্পর্কের গভীরতার প্রমাণ হিসেবে দেখেছেন। ছোট পুরুষটির দীর্ঘ অনুপস্থিতিকেও বিরল সংযোগের লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এখানেই বইটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে আসে: ভালোবাসার জন্য কি অবহেলা সহ্য করতেই হবে? সম্পর্কের মধ্যে একজনের চাহিদা বারবার উপেক্ষিত হলে সেটিকে গভীর প্রেম বলে মেনে নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত?
আকাঙ্ক্ষা কি নিজের তৈরি ফাঁদ?

হেপোলা নিজেই নিজের প্রেমজীবন নিয়ে রসিকতা করেছেন—তিনি একাকী, আবার তাঁর প্রত্যাশাও অনেক। তবে পর্যালোচকের মতে, বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগের কথা বললেও বাস্তবে পুরুষদের শারীরিক আকর্ষণ তাঁর সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। পছন্দের পুরুষটির চেহারা তাঁকে মুগ্ধ করার পর তাঁর অনিয়মিত যোগাযোগ ও বারবার হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও যেন গুরুত্ব হারায়।
বইটি তাই শুধু পুরুষদের অবহেলার সমালোচনা নয়; এটি হেপোলার নিজের পছন্দ, প্রত্যাশা ও আত্মপ্রবঞ্চনারও অনুসন্ধান। পর্যালোচক প্রশ্ন তুলেছেন, পারস্পরিক সম্মান ও স্থিতিশীলতা কি তাঁর আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে সত্যিই ছিল, নাকি অনিশ্চিত সম্পর্কের উত্তেজনাই তাঁকে বেশি টেনেছে?
সারাহ হেপোলার এই স্মৃতিকথা শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবে একজন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্যে ব্যবধানকে সামনে আনে। কাঙ্ক্ষিত মানুষকে পাওয়ার কল্পনা অনেক সময় বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই কল্পনা পূরণ হলে আকাঙ্ক্ষার জাদু কি হারিয়ে যায়? বইটির অভিজ্ঞতা সেই প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না; বরং পাঠককে নিজের সম্পর্কের প্রত্যাশা ও আপসের সীমা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।












