দুর্নীতি উন্মোচনের জন্য তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে সহকর্মী সাংবাদিকের হত্যার খবর পেয়েছিলেন জোন অসফ। সেই ঘটনা তাঁর পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়, দুর্নীতি প্রকাশ্যে আনা যেমন ক্ষমতাবানদের চাপে ফেলতে পারে, তেমনি সেই সত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও একধরনের রাজনৈতিক শক্তি। কয়েক বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে অসফ সেই অভিজ্ঞতাকেই রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করছেন।
জর্জিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা এই ডেমোক্র্যাট সিনেটর এখন তাঁর প্রচারে দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলকে লক্ষ্য করে দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্য উপস্থাপনের ধরন, ক্যামেরার দৃষ্টিকোণ এবং সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ বাক্য অনেকের কাছে বারাক ওবামার ২০০৮ সালের নির্বাচনী প্রচারের দৃশ্যভাষার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবেও অসফকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের ২৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অসফের এই রাজনৈতিক যোগাযোগের দক্ষতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত স্বাধীন তথ্যচিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ইনসাইট ফিল্মের নেতৃত্ব দেওয়ার সময়ই তিনি দুর্নীতির অনুসন্ধানকে জনআকর্ষণীয় রাজনৈতিক বয়ানে রূপ দেওয়ার কৌশল আয়ত্ত করেন।
ঘানায় সাংবাদিক হত্যা যে শিক্ষা দিয়েছিল
২০১৮ সালে আফ্রিকার ফুটবলে দুর্নীতি নিয়ে একটি অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র তৈরিতে অসফের প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করেছিল। অনুসন্ধানে ফিফার আফ্রিকাবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজনকে গোপন ক্যামেরায় ঘুষ গ্রহণ করতে দেখা যায়। তথ্যচিত্রটি ঘানায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকিও আসে।
২০১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি ঘানার রাজধানী আক্রার উপকণ্ঠে গাড়ি চালানোর সময় সাংবাদিক আহমেদ হুসেইন-সুয়ালে ডিভেলাকে মোটরসাইকেলে আসা দুই বন্দুকধারী গুলি করে হত্যা করে। এর আগে দেশটির একজন সংসদ সদস্য প্রকাশ্য টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ডিভেলার বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।
সহকর্মীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন অসফ। তাঁর উপলব্ধি হয়, দুর্নীতি প্রকাশ করলে ক্ষমতাবানদের প্রতিশোধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই অনুসন্ধান জনসমক্ষে তুলে ধরলে তা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে চাপ তৈরির সুযোগও দেয়।
তথ্যচিত্র নির্মাতা থেকে রাজনৈতিক প্রচারক
অসফের চলচ্চিত্র নির্মাণের যাত্রা শুরু হয়েছিল কিশোর বয়সে। ২০০৩ সালে ফ্রান্সে এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ তথ্যচিত্র নির্মাতা রন ম্যাককালার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি লন্ডনে ম্যাককালারের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন।
২০১৩ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন অসফ। তখন তাঁর বয়স ২৬ বছর। আর্থিক সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখতে তিনি ও ম্যাককালার প্রত্যেকে আড়াই লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। অসফের বিনিয়োগের বড় অংশ এসেছিল তাঁর দাদার মৃত্যুর পর পাওয়া উত্তরাধিকার থেকে।
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি শক্ত করার পাশাপাশি তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় নতুন অর্থায়নের ব্যবস্থা করেন, কর্মী বাড়ান এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের গবেষণা, সম্পাদনা ও বিতরণে সরাসরি যুক্ত থাকেন। তাঁর সহকর্মীদের মতে, অনুসন্ধানের প্রতিটি ধাপে তাঁর অংশগ্রহণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়নে সতর্কতা ছিল উল্লেখযোগ্য।
সিনেটে একই কৌশলের প্রয়োগ
২০১৭ সালে কংগ্রেসের একটি আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে অসফ সাময়িকভাবে প্রতিষ্ঠানটির দৈনন্দিন দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। ২০১৯ সালে তিনি জর্জিয়া থেকে সিনেট নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দেন। ২০২১ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর ইনসাইটের মালিকানা সহকর্মীদের কাছে হস্তান্তর করেন।
সিনেটে দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে তাঁর অনুসন্ধানী তৎপরতায় আগের অভিজ্ঞতার ছাপ দেখা যায়। ফেডারেল কারাগারে অনিয়ম এবং জর্জিয়ার পালক পরিচর্যা ব্যবস্থার মতো বিষয়ে তদন্তের পাশাপাশি তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের মনোনীত ব্যক্তিদেরও শুনানিতে কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন।
চলতি বছরের গ্রীষ্মে জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক পদে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থী জে ক্লেটনের শুনানিতে অসফ তাঁকে ২০২০ সালের নির্বাচনে কে জিতেছিলেন, তা জিজ্ঞাসা করেন। ক্লেটন সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেলে অসফ বারবার একই প্রশ্ন করেন। শুনানি শেষ হওয়ার আগেই তাঁর দল ওই কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে। ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
অসফের সাবেক সহকর্মীদের কাছে এই দৃশ্য নতুন নয়। তাঁদের মতে, তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় যে দক্ষতা তিনি গড়ে তুলেছিলেন—তথ্য যাচাই, কঠিন প্রশ্ন তোলা, জটিল বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন এবং দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা—সেগুলোই এখন তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ।












