বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব শুধু সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দূরবর্তী দেশগুলোর অর্থনীতি, জনজীবন ও শান্তিও হুমকির মুখে পড়ে। ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে এ সতর্কবার্তা দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, যুদ্ধের বিস্তার ঠেকাতে সংলাপ ও কূটনীতির বিকল্প নেই।
রোববার দিল্লিতে জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত চিন্ময় অমৃত মহোৎসব গ্লোবাল সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের মূল্য দিতে হচ্ছে এমন বহু দেশ ও জনগোষ্ঠীকে, যাদের এসব পরিস্থিতির ওপর খুব সামান্যই প্রভাব রয়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ এবং পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বিশ্বশান্তি রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সংলাপ ও কূটনীতিই সংঘাত নিরসনের পথ
জয়শঙ্করের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। সংঘাতের অবসানে ভারত নিজস্ব উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতেও প্রস্তুত।
তিনি বলেন, সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক জনমতেরই প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে দূরবর্তী দেশগুলোর সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাব যে সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, বক্তব্যে সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা
বিশ্বশান্তির জন্য আরেকটি বড় হুমকি হিসেবে সন্ত্রাসবাদের কথা উল্লেখ করেন জয়শঙ্কর। তাঁর বক্তব্য, রাষ্ট্রীয় কৌশল বা নীতির হাতিয়ার হিসেবে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর পক্ষে যুক্তি দেখানো বা একে বৈধতা দেওয়ারও সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সব দেশ সমানভাবে কঠোর অবস্থান না নেওয়ায় এই হুমকি এখনো টিকে আছে। ইতিহাস থেকে বহু শিক্ষা পাওয়ার পরও কিছু দেশ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে অগ্রাধিকার দেয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সন্ত্রাসবাদের সব ধরনের রূপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সচেতনতা বাড়ানো এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ জোরদার করার আহ্বান জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদকে বৈশ্বিক শান্তির জন্য একটি গুরুতর বিপদ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পরস্পর নির্ভরশীল
বিশ্বশান্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি এবং সংঘাত ও সহিংসতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি যখন জটিল সরবরাহব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাজার এবং অভিন্ন সম্পদের ওপর নির্ভরশীল, তখন এক অংশের সমৃদ্ধি আর অন্য অংশের বঞ্চনা দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্বকে একদিকে সমৃদ্ধ এবং অন্যদিকে বঞ্চিত রেখে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। এমন বৈষম্য ও ভারসাম্যহীনতা অব্যাহত থাকলে অস্থিতিশীলতা বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
ইউক্রেন ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, সন্ত্রাসবাদের হুমকি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরতার প্রসঙ্গ তুলে জয়শঙ্কর মূলত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে সংঘাত নিরসনে সংলাপ, কূটনীতি এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ চলতে থাকলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে—জয়শঙ্করের বক্তব্যের মূল বার্তা এটিই। তাই সংঘাতের সমাধানে নীরব দর্শকের ভূমিকা নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।












