যুক্তরাষ্ট্রে আগাম ফ্লুর সংক্রমণ এ বছর স্বাভাবিক সময়ের অনেক আগেই শুরু হয়েছে। ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তনের কারণে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বেড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে দেশটির পশ্চিম উপকূলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ। ফলে প্রতিবছরের মতো ফ্লুর টিকা নেওয়ার কথা যাঁরা এখনো ভাবেননি, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগার চিকিৎসাবিষয়ক বিভাগের সংক্রামক রোগ নির্ণয় শাখার প্রধান ডা. অ্যালেক্স গ্রেনিঙ্গারের মতে, এ বছর ফ্লুর মৌসুম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় আড়াই মাস আগেই শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে পশ্চিম উপকূলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে সংক্রমণ বাড়তে দেখা গেছে, যা দেশটির প্রচলিত মৌসুমি প্রবণতার তুলনায় অস্বাভাবিক।
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লুর মৌসুম শুরু হয় দক্ষিণাঞ্চলে। প্রায়ই ফ্লোরিডায় প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয়। দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে ভাইরাসটি সেখানে পৌঁছানোর পর শরৎ ও শীতের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সিয়াটলের মতো উত্তরের শহরগুলোতে সাধারণত জানুয়ারিতে ফ্লুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ডিসেম্বরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি থাকে।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের জনস্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে ফ্লু পরীক্ষা করানো প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় একজনের ফল পজিটিভ এসেছে। গ্রেনিঙ্গার বলেন, সংক্রমণের বর্তমান মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণত জানুয়ারিতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ওয়ালগ্রিনসের পর্যবেক্ষণেও ফ্লুর মৌসুম আগেভাগে এগিয়ে আসার ইঙ্গিত মিলেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় এ বছরের ফ্লুর মৌসুম প্রায় চার সপ্তাহ এগিয়ে রয়েছে। একই সময়ে গত বছরের তুলনায় ফ্লুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ভাইরাসবিরোধী ওষুধ এবং কাশি-সর্দির ওষুধের ব্যবস্থাপত্রও বেশি দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গত সপ্তাহে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া মানুষের প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে ফ্লুর মতো উপসর্গ দেখা গেছে। জ্বর, কাশি ও শরীর ব্যথার মতো লক্ষণ কতটা ছড়াচ্ছে, তা বোঝার জন্য এ ধরনের পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়। তবে দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এই হার এখনো জাতীয় স্বাভাবিক মাত্রার নিচে। অর্থাৎ ফ্লুর সংক্রমণ সব অঞ্চলে এখনো ব্যাপক আকার ধারণ করেনি।
জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের মহামারিবিদ ডা. ক্যাটলিন রিভার্স বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে ফ্লুর মৌসুম অনেক আগেই শুরু হয়েছে। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সংক্রমণ পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সব অঞ্চলেই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
অ্যারিজোনা, ক্যালিফোর্নিয়া, হাওয়াই ও নেভাদা নিয়ে গঠিত অঞ্চলে গত সপ্তাহে ফ্লু পরীক্ষায় পজিটিভ ফলের হার অন্তত ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। এটি ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সংক্রমণ ছড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। রিভার্সের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলেও সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং সেখানকার পরিস্থিতি পশ্চিমাঞ্চলের কাছাকাছি পৌঁছানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
এশিয়া থেকে এসেছে সংক্রমণের ঢেউ
গ্রেনিঙ্গারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের অঙ্গরাজ্যগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ফ্লুর এই ঢেউয়ের উৎস এশিয়া। বর্তমানে সেখানে শনাক্ত হওয়া ভাইরাসগুলোর মধ্যে এইচ১এন১ উপধরনের আধিপত্য রয়েছে। ২০০৯ সালে বিশ্বজুড়ে মহামারি সৃষ্টি করেছিল এই ভাইরাসের একটি ধরন।
গ্রেনিঙ্গার জানান, তাঁর পরীক্ষাগারে বর্তমানে যে নমুনাগুলো আসছে, তার প্রায় ৯৮ শতাংশই এইচ১এন১ ভাইরাসের। এসব ভাইরাসের জিনে নতুন একটি পরিবর্তনও দেখা গেছে। বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ, এই পরিবর্তন ভাইরাসটিকে মানুষের শরীরে আগে থেকে তৈরি হওয়া রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এড়িয়ে যেতে কিছুটা বেশি সক্ষম করে তুলতে পারে।
জাপানেও এই ভাইরাসের প্রভাব দেখা গেছে। সেখানে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় কিছু স্কুল ও শিশুযত্নকেন্দ্র বন্ধ করতে হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে টিকাদান কার্যক্রম এগিয়ে আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
টিকার সঙ্গে ভাইরাসের নতুন পরিবর্তনের ব্যবধান
এইচ১এন১ ভাইরাসের নতুন জিনগত পরিবর্তনটির নাম জি১৫৫ই। গ্রেনিঙ্গারের মতে, চলতি বছরের ফ্লুর টিকায় কোন কোন ভাইরাসের ধরন অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এই পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
এ কারণে চলতি বছরের টিকা নতুন পরিবর্তিত ভাইরাসটির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে নাও যেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে টিকা কোনো সুরক্ষাই দেবে না। টিকাটি এইচ১এন১ ভাইরাসের একটি ধরনকে লক্ষ্য করে তৈরি হওয়ায় সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে এটি এখনো সহায়ক হতে পারে। তবে নতুন পরিবর্তনের কারণে টিকার সুরক্ষা আংশিকভাবে এড়িয়ে সংক্রমণ ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে। এসব প্রযুক্তির সাহায্যে এখন অনেক ক্ষেত্রেই ভাইরাসের নতুন ধরন দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। গ্রেনিঙ্গারের মতে, এর ফলে ভাইরাসের পরিবর্তন সম্পর্কে প্রায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো দ্রুত তথ্য পাওয়ার দিকে এগোনো যাচ্ছে। তবে ভাইরাস শনাক্তের গতি বাড়লেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত টিকা তৈরি করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিমের পরিবর্তে এমআরএনএ প্রযুক্তির টিকা
যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের ফ্লুর টিকার জন্য ভাইরাসের ধরন নির্বাচন করা হয়েছিল বসন্তকালে। সে সময় নতুন পরিবর্তিত এইচ১এন১ ভাইরাসটি বর্তমান উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠেনি। ফলে নতুন ধরনটির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টিকা তৈরি করার সুযোগ সীমিত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে এখনো ফ্লুর বেশির ভাগ টিকা মুরগির ডিমে ভাইরাস উৎপাদনের মাধ্যমে তৈরি হয়। এই পদ্ধতি তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ভাইরাসের ধরন নির্বাচন, উৎপাদন ও টিকা প্রস্তুতের পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে। এর ফলে মৌসুমের শেষ দিকে নতুন কোনো ভাইরাসের ধরন ছড়িয়ে পড়লে টিকার উপাদান দ্রুত পরিবর্তন করা কঠিন হতে পারে।
এদিকে এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি একটি নতুন ফ্লুর টিকা অনুমোদন পেয়েছে। গ্রেনিঙ্গারের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও দ্রুত টিকা তৈরির সুযোগ করে দিতে পারে। তবে একসময় এটি ডিমে তৈরি প্রচলিত টিকার সম্পূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠবে কি না, তা শুধু বৈজ্ঞানিক বিষয় নয়। এর সঙ্গে উৎপাদন খরচ ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও জড়িত।
এখনই টিকা নেওয়ার পরামর্শ
সাধারণত বসন্তকাল পর্যন্ত সুরক্ষা বজায় রাখার কথা বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা অক্টোবরের শেষ নাগাদ ফ্লুর টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু এ বছর সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হওয়ায় গ্রেনিঙ্গার যত দ্রুত সম্ভব টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, অনেকেই অক্টোবরের শেষ দিকে টিকা নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এ বছর সংক্রমণের পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েক সপ্তাহ আগেই টিকা নেওয়া ভালো হতো। তাঁর মতে, এখন আর দেরি না করে টিকা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। রিভার্সও টিকা নেওয়ার সময় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ফ্লুর মৌসুম এত আগে শুরু হবে, তা অনেকেই ভাবেননি। ফলে অনেকে এখনো টিকা নেওয়ার প্রস্তুতিই শুরু করেননি। এই বিলম্ব সংক্রমণ ছড়ানোর সময় মানুষের সুরক্ষার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এ বছরের ফ্লুর মৌসুম সামগ্রিকভাবে আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি গুরুতর হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে আগাম ফ্লুর সংক্রমণের বর্তমান গতি এবং ভাইরাসের নতুন বৈশিষ্ট্য পরিস্থিতিকে জটিল করে তুললেও মৌসুমের শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে, তা নির্ভর করবে ভাইরাসের বিস্তার, মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং টিকার কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
গ্রেনিঙ্গার আরও সতর্ক করেছেন, এইচ১এন১ ভাইরাসের সংক্রমণ একবার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরও ফ্লুর আরেকটি ঢেউ দেখা দিতে পারে। তাঁর ধারণা, ২০২৬ সালের শেষ দিকে এইচ১এন১ সংক্রমণ চূড়ায় পৌঁছালেও জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চে অন্য কোনো ভাইরাসের ধরন আবার সংক্রমণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
অর্থাৎ এ বছর ফ্লুর আগাম বিস্তারই শেষ কথা নয়। শীতের পরবর্তী মাসগুলোতে সংক্রমণের গতিপ্রকৃতি কী হয়, নতুন ধরন কতটা ছড়ায় এবং টিকা কতটা সুরক্ষা দেয়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।












