নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, গণঅভ্যুত্থান এবং বারবার ভেঙে পড়া প্রত্যাশার ইতিহাস। রাজতন্ত্রের অবসান, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা কিংবা প্রজাতন্ত্রে উত্তরণ—প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে ছিল একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা: রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শাসকদের জবাবদিহির আওতায় আনা। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরও নেপালের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক রূপান্তর ঘটেনি। শাসক বদলেছে, শাসনব্যবস্থার কাঠামো বদলেছে, সংবিধানও একাধিকবার নতুন রূপ পেয়েছে; অথচ ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ থেকে মুক্তি মেলেনি।
এই বাস্তবতার মধ্যেই নেপালের সাম্প্রতিক জেন-জি অভ্যুত্থানকে দেখতে হবে। অল্প সময়ের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া এই বিদ্রোহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত বাসভবন পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সরকারি সচিবালয়, আদালত, মন্ত্রীদের আবাসন, গণমাধ্যমের ভবন এবং শীর্ষ নেতাদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি জনগণের গভীর অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে।
এটি কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। তবে অভ্যুত্থানের পর যে প্রশ্নটি সামনে আসার কথা ছিল—কেন মানুষ প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এতটা ক্ষুব্ধ হলো—তা আড়াল হয়ে যাচ্ছে অন্য এক বিতর্কে। আবারও শুরু হয়েছে বিদেশি ষড়যন্ত্রের গল্প।
নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার সহজ কৌশল
নেপালের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ নিয়ে সন্দেহ নতুন কিছু নয়। দেশটির প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংকট কিংবা আন্দোলনের পেছনে কোনো না কোনো বিদেশি শক্তির ভূমিকা খোঁজার প্রবণতা রয়েছে। একসময় ভারত ও চীন ছিল এ ধরনের আলোচনার প্রধান বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকেও সেই তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
সমস্যা হলো, এসব ব্যাখ্যা প্রায়ই বাস্তব রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের বিশ্লেষণকে প্রতিস্থাপন করে। শিক্ষিত সমাজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—অনেকেই ঘটনার পেছনে বিদেশি পরিকল্পনা খুঁজতে আগ্রহী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবভিত্তিক আলোচনার বিস্তার এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। সেখানে যাচাই করা তথ্যের চেয়ে চাঞ্চল্যকর ব্যাখ্যা দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়।

বিদেশি রাষ্ট্র নিজেদের স্বার্থে অন্য দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় সেটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং জনগণের ক্ষোভকে উপেক্ষা করে সবকিছুর দায় বাইরের শক্তির ওপর চাপানো আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।
একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি তার অভ্যন্তরীণ ঐক্য, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা। বিদেশি শক্তির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয় তখনই, যখন দেশের ভেতরে বিভাজন, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা গভীর হয়। সুতরাং নেপালের সংকটের ব্যাখ্যা খুঁজতে হলে প্রথমে তার রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে।
বিপ্লব হয়েছে, বদলায়নি রাজনৈতিক সংস্কৃতি
নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি বড় আন্দোলন নতুন ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলা রানা শাসনের অবসানের পর শাহ রাজবংশের বিভিন্ন পর্যায়ের শাসন, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, ১৯৯০ সালের সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং শেষ পর্যন্ত প্রজাতন্ত্র—প্রতিটি পর্যায়েই জনগণ নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা করেছে।
কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই জনগণের প্রত্যাশা দীর্ঘস্থায়ীভাবে পূরণ করতে পারেনি। এর একটি বড় কারণ, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে শাসকদের মানসিকতা ও ক্ষমতা প্রয়োগের সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেনি।
নেপালের মাওবাদী বিদ্রোহের ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০-এর দশকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের তিনটি প্রধান দাবি ছিল প্রজাতন্ত্র, ফেডারেল ব্যবস্থা ও ধর্মনিরপেক্ষতা। দীর্ঘ সংঘাত ও রাজনৈতিক আলোচনার পর এসব দাবি সাংবিধানিক কাঠামোয় স্থান পায়। রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে, নেপাল প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় এবং ফেডারেল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে এসব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সংবিধান প্রণয়নের সময় জনগণের মতামত যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গণপরিষদের সদস্যদের মধ্য থেকেও এমন অভিযোগ এসেছে যে দেশজুড়ে সংগ্রহ করা জনগণের মতামতসংবলিত নথি পর্যন্ত খোলা হয়নি।
তারপরও ওই রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্তত কিছু দৃশ্যমান সাংবিধানিক ফলাফল ছিল। কিন্তু জেন-জি অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি।
রাজতন্ত্রের অবসান, কিন্তু ক্ষমতার নতুন রাজা
প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সময় নেপালের জনগণের প্রত্যাশা ছিল, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী থাকবে না। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং ক্ষমতা হবে জবাবদিহিমূলক। বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।
রাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক অবসান হলেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের মধ্যে রাজতান্ত্রিক মনোভাবের পুনরাবির্ভাব ঘটেছে। দলীয় নেতৃত্ব, ক্ষমতার বণ্টন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্রমে সীমিতসংখ্যক নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। দলীয় আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও জবাবদিহির বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্নীতি, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বিভিন্ন শাসনামলে একইভাবে টিকে থেকেছে। সংবিধান বদলেছে, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি।
জেন-জি প্রজন্মের ক্ষোভের উৎস এখানেই। তাদের আন্দোলনকে শুধু তরুণদের তাৎক্ষণিক অসন্তোষ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এটি এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও দলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া কঠিন।

অভ্যুত্থানের পর কেন ভেঙে গেল পরিবর্তনের আশা
সাম্প্রতিক বিদ্রোহের ব্যাপকতা দেখে মনে হয়েছিল, নেপাল এবার হয়তো কেবল সরকার বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি, রাজনৈতিক আচরণ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং জনসেবার সংস্কৃতিতেও মৌলিক পরিবর্তন আসবে।
কিন্তু সেই প্রত্যাশা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। সংবিধান সংশোধন কিংবা বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান সংবিধানের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে সংস্কারের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। অথচ তাঁর নিজের নিয়োগই সংবিধানের প্রচলিত বিধানের বাইরে হয়েছিল বলে বিতর্ক রয়েছে।
এখানে মূল অসংগতি কেবল সাংবিধানিক ব্যাখ্যার নয়। যে রাজনৈতিক সংকট জনগণকে রাস্তায় নামিয়েছিল, সেই সংকটের সমাধানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছা কতটা ছিল, সেটিই বড় প্রশ্ন। অভ্যুত্থানের পরও যদি পুরোনো দলীয় আধিপত্য, একই ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা এবং অনুগত গোষ্ঠীর প্রভাব বজায় থাকে, তাহলে পরিবর্তনের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত প্রতীকী ঘটনাতেই পরিণত হয়।
একই চক্রে আটকে থাকার বিপদ
নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি একটি মৌলিক রাজনৈতিক সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। দেশটি বারবার নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, কিন্তু সেই ব্যবস্থাকে কার্যকর ও জনমুখী করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে প্রতিটি আন্দোলন নতুন প্রত্যাশা তৈরি করে, কিছুদিন পর সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায় এবং আবারও অসন্তোষ জমতে থাকে।

এই চক্র থেকে বের হওয়ার জন্য বিদেশি ষড়যন্ত্রের ব্যাখ্যা খণ্ডন করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি, দলীয় কর্তৃত্বের সীমা নির্ধারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজকেও আবেগনির্ভর অভিযোগের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক রাজনৈতিক মূল্যায়নে অভ্যস্ত হতে হবে।
বিদেশি শক্তির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনা যেন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতার তদন্তকে থামিয়ে না দেয়। কোনো বিদেশি শক্তি নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্নীতিগ্রস্ত হতে বাধ্য করেনি, দলীয় স্বজনপ্রীতি প্রতিষ্ঠা করেনি কিংবা জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়নি। এসব ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই নিতে হবে।
নেপালের সবচেয়ে বড় সংকট তাই বিদেশি ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা নয়; বরং নিজের রাজনৈতিক অসুস্থতা স্বীকার করতে না পারা। জনগণ বারবার পরিবর্তনের জন্য রাস্তায় নেমেছে, কিন্তু পরিবর্তনের দায়িত্ব যাদের হাতে তুলে দিয়েছে, তারাই পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতা বদলাতে না পারলে নতুন প্রজন্মের আন্দোলনও আগের আন্দোলনগুলোর মতো হতাশায় পর্যবসিত হবে।
একটি দেশের ইতিহাস শুধু কতবার বিপ্লব হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং বিপ্লবের পর রাষ্ট্র ও সমাজ কতটা বদলেছে, সেটিই আসল মাপকাঠি। নেপালের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের ষড়যন্ত্র খুঁজতে গিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করলে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বারবার জাগবে, কিন্তু তার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।












