একসময় আলু ছিল কৃষকের নগদ অর্থের অন্যতম ভরসা। মৌসুম শেষে আলু বিক্রি করে সংসারের খরচ মেটানো, ঋণ পরিশোধ এবং পরের মৌসুমের চাষের পুঁজি জোগাড় করতেন অনেকে। কিন্তু এবার সেই আলুই কৃষকের জন্য বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগারে সংরক্ষণের খরচ মিলিয়ে যে দামে আলু বিক্রি হওয়ার কথা, বাজারে তার অর্ধেক দামও মিলছে না। ফলে হিমাগারে রাখা আলু তুলতেও আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক কৃষক।
রংপুর, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট, বগুড়া ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর—বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি। কোথাও হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকায়, কোথাও ১১ থেকে ১৪ টাকায়। অথচ উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়া মিলিয়ে কেজিপ্রতি খরচ পড়ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে লোকসান ১০ থেকে ১৫ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি।
উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বিক্রি
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার আমরুলবাড়ি গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলামের হিমাগারে ৩০০ বস্তা আলু রয়েছে। প্রতি কেজিতে তাঁর লোকসান হচ্ছে ১২ টাকা। দীর্ঘদিন ধরে আলু চাষ করে একাধিকবার লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনি। এবারও কম দামের কারণে হিমাগার থেকে আলু বের করতে চাইছেন না।
কৃষকদের ক্ষতি কমাতে গত ২৭ আগস্ট সরকার হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই দাম পাওয়া যাচ্ছে না। রংপুর অঞ্চলের হিমাগারগুলোতে বর্তমানে গড়ে ১২ টাকায় আলু বিক্রি হচ্ছে। কোথাও দাম নেমেছে ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকায়।
কৃষি কার্যালয় ও কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ টাকা। বস্তা কেনা ও হিমাগারে পরিবহনে আরও দুই টাকা এবং সংরক্ষণ ভাড়া বাবদ ছয় টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে কেজিপ্রতি ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ টাকা। অন্যান্য খরচ যোগ করলে তা আরও বাড়ে।
হিমাগারে জমে আছে বিপুল মজুত
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি মৌসুমে দেশে আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন। সরকারি-বেসরকারি ৪০২টি হিমাগার এবং ৭০৩টি অহিমায়িত মডেল ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ৩৩ লাখ ৯০ হাজার টন। এটি মোট উৎপাদনের ২৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, তাদের হিমাগারগুলোতে এখনও ১৫ লাখ টনের বেশি আলু মজুত রয়েছে।
রংপুর কৃষি অঞ্চলে চলতি মৌসুমে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদন হয়েছে ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ টন। মৌসুমের শুরুতে বিভাগের ১১৬টি হিমাগারে ১১ লাখ ৯ হাজার ৬৯২ টন আলু রাখা হয়েছিল। মৌসুমের শেষ পর্যায়েও সেখানে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৩ টন আলু মজুত রয়েছে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু জানান, দাম ১৩ টাকায় নেমে যাওয়ায় হিমাগার থেকে আলু বের করার গতি কমেছে। উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫ টাকা হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় কৃষক আলু তুলছেন না। এতে হিমাগার মালিকেরাও ভাড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে আলু পচন থেকে রক্ষা করতে যন্ত্র চালু রাখায় পরিচালন ব্যয় বাড়ছে।
ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও বগুড়ায়ও একই চিত্র
ঠাকুরগাঁওয়ের ১৯টি হিমাগারে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার টন আলু রয়েছে। জেলার কৃষক আব্দুল কুদ্দুস জানান, দাম বাড়ার আশায় আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু হিমাগার ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে কেজিপ্রতি ব্যয় হয়েছে ১৯ থেকে ২০ টাকা। এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ১৪ টাকায়।
জয়পুরহাটের ২২টি হিমাগারে মৌসুমের শুরুতে ২ লাখ ৩৭ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। চলতি মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত খালাস হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টন। অর্থাৎ মোট মজুতের প্রায় ৫৫ শতাংশ আলু বের হয়েছে। সেখানে প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণসহ খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা। অথচ বর্তমানে ৬০ কেজির এক বস্তা বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬৮০ টাকায়।
বগুড়ার ৫১টি হিমাগারে মঙ্গলবার পর্যন্ত ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৩৭ টন আলু মজুত ছিল। গত মৌসুমে এসব হিমাগারে মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৮৪২ টন আলু রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ এখনও প্রায় অর্ধেক আলু অবিক্রীত। হিমাগার থেকে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়, খুচরা বাজারে ১৭ টাকা।
সংরক্ষণকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বগুড়ায় হিমাগারের ভাড়া বস্তাপ্রতি ৫৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ৪০০ টাকা করা হয়েছে। তারপরও লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না। জেলা আলু ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের আশঙ্কা, আগামী ২০ দিন পর নতুন আলু বাজারে আসতে শুরু করলে পুরোনো আলুর দাম আরও কমতে পারে।
নতুন মৌসুমে আবাদ কমানোর উদ্যোগ
আলুর দাম কম থাকায় বগুড়ায় এবার আবাদ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি বিভাগ। গত বছর জেলায় ৫৪ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। এবার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫২ হাজার ৯০১ হেক্টর। জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ জানান, অন্যান্য শাকসবজির উৎপাদন বাড়ায় আলুর চাহিদা কমেছে। এ কারণে আলুর আবাদ কমিয়ে সরিষা চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরেও কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন। সেখানে হিমাগারে রাখা ৫০ কেজির এক বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকায়। হিমাগারের ৩০০ টাকা ভাড়া পরিশোধের পর কৃষকের হাতে থাকছে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। উৎপাদন ও পরিবহনের খরচ ধরলে প্রকৃত লোকসান আরও বেশি।
ভর্তুকি ও পরিকল্পিত উৎপাদনের পরামর্শ
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের পরামর্শ, কৃষকের ক্ষতি কমাতে হিমাগার ভাড়ার ৫০ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দিতে পারে। পাশাপাশি মূল্য সহায়তার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম. এম. আরিফ পাশা বলেছেন, বর্তমান দাম কৃষকদের জন্য সন্তোষজনক নয়। তবে অদূর ভবিষ্যতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা করছেন।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হলে পণ্যের দাম কমে যায়। এ সমস্যা মোকাবিলায় সরকার অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ এবং তথ্যভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। কৃষকেরা যাতে বাজারের চাহিদা বুঝে উৎপাদন করতে পারেন, সে জন্য কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টিসিবির মাধ্যমে আলু বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও খোলাবাজারে দাম কম থাকায় ক্রেতারা সেই আলু কিনতে আগ্রহ দেখাননি।
আলুর বাজারে এই দরপতনে একদিকে কৃষকের লোকসান বাড়ছে, অন্যদিকে হিমাগারে আটকে থাকছে বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য। নতুন আলু বাজারে আসার সময় ঘনিয়ে আসায় পুরোনো মজুত দ্রুত বিক্রি না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।












