ফ্যাশনজগতে মার্গারেট হাওয়েল পরিচিত তাঁর স্বতন্ত্র নকশা, ব্যবহারিক পোশাক এবং ব্রিটিশ ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের প্রতি ভালোবাসার জন্য। ১৯৭০-এর দশক থেকে ফ্যাশনে নিজের অবস্থান তৈরি করা ৮০ বছর বয়সী এই ডিজাইনারের জীবনযাপনেও প্রতিফলিত হয় একই দর্শন—সরলতা, স্বাভাবিকতা, গুণগত মান এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার। লন্ডন ও ইংল্যান্ডের সাফোক উপকূলের মধ্যে জীবন ভাগ করে নেওয়া হাওয়েলের কাছে বাড়ি শুধু থাকার জায়গা নয়, বরং প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার একটি পরিসর।
তাঁর বাড়ির সাজসজ্জা, দৈনন্দিন অভ্যাস, রান্না, সাঁতার ও হাঁটার প্রতি আগ্রহ—সবকিছুতেই রয়েছে ব্যক্তিগত পছন্দের স্পষ্ট ছাপ। সম্প্রতি নিজের বাড়ি ও জীবনযাপন নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে এসব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।
প্রকৃতিই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা
হাওয়েলের জন্ম ইংল্যান্ডের সারেতে। শৈশবে খোলা প্রান্তর পেরিয়ে স্কুলে যাওয়ার স্মৃতি তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আর্ট স্কুলে যাওয়ার আগেই তিনি ঘাসের ছবি আঁকার একটি সিরিজ তৈরি করেছিলেন। প্রকৃতির সঙ্গে এই সংযোগ পরবর্তী জীবনেও তাঁর নকশা ও বাড়ির পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে।
বাড়ির নকশার ক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয় পারিবারিক অভিজ্ঞতা থেকে। তাঁর মামা ছিলেন একজন স্থপতি, যিনি লন্ডনের বারবিকান আবাসন প্রকল্পে কাজ করেছিলেন। ছোটবেলায় দাদা-দাদির বাড়িতে গিয়ে খোলামেলা ও আলোয় ভরা জায়গাগুলো তাঁর ভালো লাগত। পরে স্থাপত্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ে ফ্র্যাঙ্ক লয়েড রাইট ও মিয়েস ভ্যান ডার রোহের কাজ দেখে।
তবে তাঁর নিজের ভাষায়, সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক উপাদানের প্রতি ভালোবাসা। পোশাকের মতো ঘরের আসবাব ও সাজসজ্জাতেও তিনি ব্যবহারিকতা, কার্যকারিতা এবং স্বাভাবিক উপকরণকে গুরুত্ব দেন।
সমুদ্রের কাছে আধুনিক বাড়ি
২০০১ সালে সাফোক উপকূলে নিজের বাড়িটি খুঁজে পান হাওয়েল। সমুদ্রের দিকে চলে যাওয়া একটি নিরিবিলি গ্রামের সড়কের পাশে বাড়িটি। সমুদ্রে সাঁতার কাটার শখ থাকায় জায়গাটি তাঁর বিশেষ পছন্দ হয়।
১৯৬৫ সালে সুইস স্থপতি রুডি মক বাড়িটির নকশা করেছিলেন। আধুনিক স্থাপত্যের এই বাড়িতে রয়েছে খোলামেলা বিন্যাস এবং মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত জানালা। জানালার ওপাশে দেখা যায় বাগান। গ্রামীণ পরিবেশে এমন আধুনিক বাড়ি এবং সমুদ্রের এত কাছে থাকার সুযোগকে তিনি বিশেষ প্রাপ্তি মনে করেন।
বাড়ির নিচতলা প্রায় পুরোপুরি খোলামেলা। বসার ঘরের সঙ্গে যুক্ত রান্নাঘর এবং কংক্রিটের উঁচু অগ্নিকুণ্ড জায়গাটিকে একই সঙ্গে আধুনিক ও আরামদায়ক করেছে। সকালে কফি খাওয়ার জন্য তাঁর পছন্দ বাগানের বাইরের টেবিলটি। বাড়ির সবচেয়ে প্রয়োজনীয় আসবাবের মধ্যে রয়েছে আগের মালিকের কাছ থেকে পাওয়া সবুজ রঙের একটি সোফা, যা প্রয়োজনে বিছানায় রূপান্তর করা যায়।
দৈনন্দিন কাজেও খুঁজে পান প্রশান্তি
হাওয়েলের কাছে ঘরের কাজও একধরনের মানসিক প্রশান্তির উৎস। দীর্ঘ হাতলের ঝাড়ু দিয়ে কাঠের মেঝে পরিষ্কার করতে তাঁর ভালো লাগে। সাফোকের বাড়িতে বাইরে থেকে ধুলা ঢোকার কারণে প্রায়ই মেঝে ঝাড়তে হয়। এই কাজের মধ্যেও তিনি মনোযোগ ধরে রাখার একটি সুযোগ খুঁজে পান।
বাড়িতে ঢুকেই প্রথমে সব জানালা খুলে দেন, যাতে ঘরে বাতাস চলাচল করতে পারে। আর তাঁর একটি কঠোর নিয়ম হলো, কেউ ঘরে না থাকলে বাতি জ্বালিয়ে রাখা যাবে না।
অবসর কাটে সাঁতার, সাইকেল ও হাঁটায়
বয়স বাড়াকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখেন হাওয়েল। নিয়মিত সাঁতার কাটা, সাইকেল চালানো ও হাঁটার অভ্যাস তাঁকে সক্রিয় রেখেছে। লন্ডনে থাকলে সকালে ব্যায়ামের জন্য গ্রিনিচ হিল দুবার সাইকেল চালিয়ে ওঠানামা করেন।
প্রতিদিন হাঁটতে বের হওয়াও তাঁর অভ্যাস। পথে সুন্দর রঙের পাতা চোখে পড়লে সেগুলো কুড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসেন। সমুদ্রসৈকত থেকে সংগ্রহ করেন পাথর ও নুড়ি। বাড়ির বাইরের একটি জায়গায় সেগুলো নিজের মতো করে সাজিয়ে রাখেন।
পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা নিয়েও সচেতন তিনি। সৈকতে পড়ে থাকা অন্যের ফেলে যাওয়া ময়লা কুড়িয়ে নেন। লন্ডনের পছন্দের একটি বেঞ্চের সামনে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ পড়ে থাকতে দেখলেও সেগুলো তুলে ময়লার পাত্রে ফেলেন।
নিজের জন্য রান্না, ছোট পরিসরে জীবন
প্রতিদিন নিজের জন্য রান্না করেন হাওয়েল। একা থাকলেও রান্না বাদ দেওয়ার পক্ষপাতী নন তিনি। ভালো খাবার খেতে পছন্দ করেন এবং কাঠামোবদ্ধ কোনো খাদ্যাভ্যাসের বদলে নিয়মিত রান্নার মধ্যেই নিজের স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পান। তাঁর পছন্দের খাবারের মধ্যে রয়েছে মাংসের চপ। বাড়ির কাছের উডব্রিজ এলাকার একটি ভালো কসাইয়ের দোকান থেকে মাংস কেনেন।
বড় আয়োজনের চেয়ে ছোট পরিসরের আড্ডা তাঁর বেশি পছন্দ। সম্প্রতি ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে একটি আয়োজন হয়েছিল, যার পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁর মেয়ে মিরিয়াম রেনশ। মেয়েটি হাওয়েলের কাজের সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সিং নকশার দায়িত্বও পালন করেন।
বাড়িতে তিনি বব ডিলান ও বিবিসি রেডিও থ্রি শোনেন। রাত ১০টার সংবাদ দেখার পর সাধারণত ঘুমাতে যান। খাবারের পর এক টুকরো চকোলেট তাঁর ছোট্ট ব্যক্তিগত আনন্দ।
হাওয়েলের জীবনযাপনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়িয়ে চলা। তাঁর কাছে ভালো নকশা মানুষের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ, সহজ ও অর্থবহ করে তোলে। পোশাক থেকে বাড়ি—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী গুণমান, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ এবং ব্যবহারিক সৌন্দর্যকে প্রাধান্য দেওয়ার মধ্যেই ফুটে উঠেছে তাঁর এই জীবনদর্শন।
মার্গারেট হাওয়েল, প্রকৃতিপ্রেম, সরল জীবনযাপন ও নান্দনিকতার প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ।












