ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আবারও সরকার গঠনের সম্ভাবনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। নির্বাচনের পর সরকার গঠনের লড়াইয়ে বৃহস্পতিবার তাঁর অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম কোনো প্রার্থীকে সরকার গঠনের জন্য সমর্থন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই দিনে আরব নেতৃত্বাধীন একটি দল নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটকে সমর্থন জানিয়েছে।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে কোনো পক্ষই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে দেশটির রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে এখন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। তিনি নেতানিয়াহু অথবা সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের মধ্যে একজনকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে পারেন।
বৃহস্পতিবার রাতে জেরুজালেমে প্রেসিডেন্টের বাসভবনে দুই নেতার সঙ্গে পৃথক বৈঠকের কথা রয়েছে। ছোট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করে তিনি এই বৈঠক করবেন। আগামী ১১ নভেম্বরের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাঁকে।
নির্বাচনে এগিয়ে থেকেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই নেতানিয়াহুর
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। ১২০ আসনের নেসেটে দলটির আসনসংখ্যা ২৭। তবে তাঁর ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী জোট সব মিলিয়ে পেয়েছে ৫৩টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।
অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন নেতানিয়াহুবিরোধী চারটি ইহুদি দল পেয়েছে ৪৮টি আসন। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দেওয়া হয়েছিল। তবে ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল এবার রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে।
নেতানিয়াহুর জোটের দীর্ঘদিনের শরিক ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম বৃহস্পতিবার কোনো প্রার্থীকে সরকার গঠনের সুপারিশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাঁর হিসাব আরও জটিল হয়েছে। অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন একটি দল আইজেনকোটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। দিনের পরবর্তী সময়ে অপর দলটিও একই অবস্থান নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছিল।
তবে আইজেনকোট ও নেতানিয়াহু, দুজনই এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের আরব নেতৃত্বাধীন দল দুটিকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেবেন প্রেসিডেন্ট
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের পদ মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। সংসদে কার সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি, তা বিবেচনা করে তিনি একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেবেন।
প্রেসিডেন্ট হারজগ নতুন নির্বাচন এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার ছোট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন তিনি। বৃহস্পতিবার বড় দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা।
হারজগ বলেন, দেশের সামনে থাকা নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ, পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনের বিষয়গুলো বিবেচনা করলে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর যে বিশাল দায়িত্ব রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো প্রার্থী সরকার গঠনে সফল না হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রশ্ন, সমালোচনা নেতানিয়াহুকে ঘিরে
ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কার মধ্যে নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগ সামনে এনেছেন নেতানিয়াহু। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের একটি তদন্তকে সামনে রেখে তিনি ফলাফল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ তুলেছেন।
তবে তাঁর সমালোচকদের অভিযোগ, নেতানিয়াহু ও তাঁর রাজনৈতিক মিত্ররা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জনমনে অবিশ্বাস তৈরির চেষ্টা করছেন। নেতানিয়াহু অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বুধবার ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি জানিয়েছে, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কমিটির প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সলবার্গ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রতি জনগণের আস্থা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট হারজগের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর। তাঁর মতে, আরব সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণসহ নির্বাচনে ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি ছিল ইতিবাচক ঘটনা।
এদিকে নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী মিত্রদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির আরব দলগুলোর নেতাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন। নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি এ ধরনের বক্তব্য ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।












