পরিবারে নতুন শিশুর আগমন আনন্দের। তবে নবজাতককে দেখতে হাসপাতালে যাওয়া কিংবা বাড়িতে কোলে নেওয়ার আগে শুধু মা-বাবার নয়, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং শিশুর ঘনিষ্ঠ পরিচর্যাকারীদেরও নিজেদের টিকার বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতকের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না। ফলে আশপাশের মানুষের মাধ্যমে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিশেষ করে জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এ সময়ে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং আশপাশের মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শিশুকে সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ মৌসুম এবং কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবজাতকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হবে এমন পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা ইন্টারনিস্টসের চিকিৎসক ধবল দেশাইয়ের মতে, জন্মের পর শূন্য থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। তাই তাদের সুরক্ষায় পরিবারের সবাইকে সচেতন হতে হবে।
নবজাতকের সুরক্ষায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ টিকা
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) নির্দেশনা অনুযায়ী, নবজাতকের সংস্পর্শে আসবেন এমন ব্যক্তিদের নিয়মিত টিকা হালনাগাদ রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে পাঁচ ধরনের টিকার বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
১. টিটেনাস, ডিপথেরিয়া ও হুপিং কাশির টিকা (টিড্যাপ)
হুপিং কাশি বা পারটুসিস শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। এতে অনিয়ন্ত্রিত কাশির কারণে শিশুর শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। গুরুতর সংক্রমণে নিউমোনিয়া, খিঁচুনি, স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য টিড্যাপের একটি ডোজ নেওয়ার পর প্রতি ১০ বছর অন্তর বুস্টার ডোজ নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। চিকিৎসক ধবল দেশাই নতুন দাদা-দাদি ও নানা-নানিদের জন্য এই টিকাকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।
২. মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা
সাধারণ মানুষের কাছে ফ্লু অনেক সময় সর্দি-জ্বরের মতো মনে হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে এটি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। নিউমোনিয়া, শরীরে পানিশূন্যতা, মস্তিষ্কে প্রদাহ এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। সাধারণভাবে ছয় মাস বা তার বেশি বয়সী প্রত্যেকের প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের শিশু বিশেষজ্ঞ আরি ব্রাউনের মতে, শীতকালীন ফ্লু মৌসুমের আগে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের শুরুতে টিকা নিলে সুরক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হয়।
৩. আরএসভি টিকা
রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস বা আরএসভি শিশুদের শ্বাসতন্ত্রে গুরুতর সংক্রমণ ঘটাতে পারে। শিশুদের শ্বাসনালি ছোট হওয়ায় এ ভাইরাসের সংক্রমণে ঘন শ্লেষ্মা জমে শ্বাস নিতে সমস্যা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির অন্যতম প্রধান কারণ ছিল আরএসভি সংক্রমণ। টিকা চালুর আগে এ ভাইরাসের কারণে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির হার ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির ব্যক্তিদের আরএসভি টিকা প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত ৭৫ বছর বয়স থেকে এ টিকা দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। তবে ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৪. কোভিড-১৯ টিকা
কোভিড-১৯ সংক্রমণ থেকে গুরুতর অসুস্থতা ও হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি কমাতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি এবং নবজাতকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষায় এটি সহায়ক হতে পারে। নিউইয়র্কের এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোন হেলথের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সেলিন গাউন্ডারের মতে, মৌসুমি কোভিড টিকা নেওয়া হলে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কমতে পারে।
৫. হাম, মাম্পস ও রুবেলার টিকা (এমএমআর)
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি স্থান ত্যাগ করার পরও দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বাতাসে সংক্রমণক্ষম থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমএমআর টিকার দুটি ডোজ হাম থেকে প্রায় ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৯৫৭ সালের আগে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের সাধারণত হামের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধক্ষম বলে বিবেচনা করা হয়। ১৯৫৭ সালে বা তার পরে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের টিকার নথি না থাকলে অন্তত একটি ডোজ নেওয়ার পরামর্শ রয়েছে। আগে একটি ডোজ নেওয়া থাকলে দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োজন কি না, তা স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর ৪ হাজার ৫০০টির বেশি নিশ্চিত হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। পেনসিলভানিয়ায় চলমান প্রাদুর্ভাব গত ৩০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী হাম পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বছর হামে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।
শিশুর জন্মের আগেই টিকা নেওয়ার পরিকল্পনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর জন্মের পর হাসপাতালে কিংবা বাড়িতে যাওয়ার আগেই পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের টিকা নেওয়া উচিত। নিউইয়র্ক মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ও পরিবার এবং কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান লরি সলোমনের পরামর্শ, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখের অন্তত ৩০ দিন আগে টিকা নেওয়া ভালো। ধবল দেশাইয়ের মতে, শিশুর জন্মের চার থেকে ছয় সপ্তাহ আগে টিকা নেওয়ার পরিকল্পনা করলে সবচেয়ে ভালো হয়। কারণ অধিকাংশ টিকা নেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হতে শুরু করে।
অনেক ক্ষেত্রে একাধিক টিকা একই দিনে নেওয়া সম্ভব। তবে কোন টিকা একসঙ্গে নেওয়া যাবে, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এমএমআর ও জলবসন্তের মতো জীবিত ভাইরাসযুক্ত টিকা একই দিনে না নিলে সাধারণত অন্তত ২৮ দিনের ব্যবধান রাখতে হয়।
টিকার পাশাপাশি যেসব সতর্কতা জরুরি
নবজাতককে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে শুধু টিকার ওপর নির্ভর করলেই হবে না। পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন আচরণেও সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, অসুস্থ বোধ করলে শিশুর কাছাকাছি যাওয়া যাবে না। শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। শিশুর মুখে চুমু খাওয়াও এড়িয়ে চলতে হবে। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সেলিন গাউন্ডারের পরামর্শ, শিশুকে আদর করার সময় মুখের পরিবর্তে পায়ে চুমু দেওয়া যেতে পারে।
নিজেদের সুরক্ষার জন্যও প্রয়োজন বাড়তি টিকা
নবজাতককে সুরক্ষার পাশাপাশি বয়স্ক পরিবারের সদস্যদের নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের শিংলসের টিকা নেওয়া উচিত। এ টিকা সুস্থ রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন বয়স্কদের শিংলস এবং এর কিছু জটিলতা প্রতিরোধে ৯০ শতাংশের বেশি কার্যকর। সাধারণত দুটি ডোজ নিতে হয়। প্রথম ডোজের দুই থেকে ছয় মাস পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের নিউমোকক্কাল টিকা নেওয়ার পরামর্শ রয়েছে। এ টিকা নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিসের মতো নিউমোকক্কাল সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় সহায়তা করে। বিশেষজ্ঞদের মূল বক্তব্য, নতুন শিশুকে দেখতে যাওয়ার আগে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের নিজেদের টিকার ইতিহাস পর্যালোচনা করা এবং বয়স ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া উচিত। এতে একদিকে তাঁরা নিজেরা সুস্থ থাকতে পারবেন, অন্যদিকে নবজাতকের সংক্রমণের ঝুঁকিও কমবে।
তবে এখানে উল্লেখিত বয়স, ডোজ ও টিকাদানের সময়সূচি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য নির্দেশনা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টিকার প্রাপ্যতা, জাতীয় নির্দেশনা এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।












