মিসরের মানুষের কাছে কোশারি কেবল একটি জনপ্রিয় খাবার নয়, এটি দেশটির দৈনন্দিন জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। চাল, ডাল, পাস্তা, ছোলা, টমেটোর সস, রসুন, পেঁয়াজ ও ঝাল মরিচের সস দিয়ে তৈরি এই খাবার বাড়িতে রান্না করা হয়, রাস্তার দোকান থেকে কেনা হয়, আবার রেস্তোরাঁয় বসেও খাওয়া হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিশে থাকা কোশারি এখন মিসরের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে।
ঐতিহ্য বলতে একসময় মূলত প্রাচীন স্থাপনা, মন্দির, স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা শতবর্ষী ভবনকেই বোঝানো হতো। অর্থাৎ, মানুষের চোখে দেখা যায় এমন বস্তুগত নিদর্শনই ছিল ঐতিহ্যের প্রধান পরিচয়। তবে সময়ের সঙ্গে এই ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষের মুখে মুখে টিকে থাকা গল্প, সংগীত, নাচ, সামাজিক রীতিনীতি, উৎসব, ধর্মীয় আচার, কারুশিল্প, বিশেষ খাবার এবং প্রকৃতি সম্পর্কে প্রজন্মান্তরে চলে আসা জ্ঞানকেও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এসব চর্চা কোনো জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, পরিচয় ও ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা শুধু অতীতকে ধরে রাখা নয়, বরং একটি সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষারও উপায়।
অমূর্ত ঐতিহ্য সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ
২০০৩ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ গ্রহণ করে। এর লক্ষ্য ছিল বস্তুগত নিদর্শনের বাইরে মানুষের জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চাগুলোকেও ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেগুলো রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ইউনেসকোর ৪২তম সাধারণ সম্মেলনে ১৭ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জীবন্ত ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উৎসাহিত করা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঐতিহ্য বহন করে চলা জনগোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের সহায়তা করাই এ দিবসের উদ্দেশ্য।
২০২৬ সালে তৃতীয়বারের মতো দিবসটি পালিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে জীবন্ত ঐতিহ্যের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
ইউনেসকোর তালিকায় মিসরের সাংস্কৃতিক সম্পদ
মিসরের মোট ১১টি ঐতিহ্য ইউনেসকোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে নয়টি উপাদান স্বীকৃত ঐতিহ্যের তালিকায় এবং দুটি জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে—এমন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
স্বীকৃত ঐতিহ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে আল-সিরা আল-হিলালিয়া মহাকাব্য। ২০০৮ সালে তালিকাভুক্ত এই মৌখিক কাব্যগাথায় বনি হিলাল বেদুইন গোত্রের আরব উপদ্বীপ থেকে উত্তর আফ্রিকায় অভিবাসনের কাহিনি তুলে ধরা হয়। সংগীতের সঙ্গে গেয়ে এই মহাকাব্য পরিবেশন করা হয়।
২০১৬ সালে স্বীকৃতি পায় তাহতিব বা লাঠিখেলা। উচ্চ মিসরের এই ঐতিহ্যবাহী লাঠিযুদ্ধ ও নৃত্যধর্মী চর্চায় দক্ষতা, ছন্দ এবং অহিংস আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২১ সালে তালিকায় যুক্ত হয় আরবি ক্যালিগ্রাফি, যেখানে অক্ষর ও শব্দের মাধ্যমে সৌন্দর্য, সামঞ্জস্য ও শৈল্পিক প্রকাশ ফুটে ওঠে।
২০২২ সালে স্বীকৃতি পায় মিসরের মধ্য দিয়ে যিশু, মেরি ও যোসেফের যাত্রাকে ঘিরে আয়োজিত ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব এবং খেজুরগাছকেন্দ্রিক কৃষি, কারুশিল্প ও খাদ্যসংস্কৃতি। ২০২৩ সালে যুক্ত হয় সোনা, রুপা ও তামার ওপর হাতে নকশা খোদাইয়ের ঐতিহ্য।
২০২৪ সালে তালিকাভুক্ত হয় মেহেদি ব্যবহারের সামাজিক ও নান্দনিক রীতি এবং সুয়েজ খাল অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তারের বাদ্যযন্ত্র সেমসেমিয়ার নির্মাণ ও পরিবেশনা। ২০২৫ সালে স্বীকৃতি পায় মিসরের কোশারি—দেশটির মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত জনপ্রিয় খাবারটি।
জরুরি সংরক্ষণের তালিকায় দুই ঐতিহ্য
মিসরের দুটি ঐতিহ্যকে জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে চিহ্নিত করেছে ইউনেসকো। এর একটি আল-আরাগোজ বা ঐতিহ্যবাহী হাতপুতুলনাচ। এই লোকনাট্যে পুতুলের মাধ্যমে মিসরের দৈনন্দিন সামাজিক জীবন নিয়ে ব্যঙ্গ ও সমালোচনা তুলে ধরা হয়। ২০১৮ সালে এটি জরুরি সংরক্ষণের তালিকায় যুক্ত হয়।
অন্যটি উচ্চ মিসরের হাতে বোনা কাপড় তৈরির ঐতিহ্য। ২০২০ সালে তালিকাভুক্ত এই কারুশিল্প আধুনিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তবে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগও চলছে।
কোশারি, সংগীত, উৎসব কিংবা হাতে তৈরি কাপড়—মিসরের এসব চর্চা দেখায়, ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্থাপনা বা স্মৃতিচিহ্নে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রতিদিনের জীবন, অভ্যাস ও সৃজনশীলতার মধ্যেও একটি জাতির ইতিহাস ও পরিচয় বেঁচে থাকে।












