ভিয়েতনাম অর্থনীতিকে আরও উচ্চস্তরে নিতে চায়। কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সংস্কার ও শিল্পায়নের পর দেশটি এখন কম মজুরির উৎপাদননির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিপণ্য তৈরির দিকে যেতে চাইছে। কিন্তু সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা।
বিশ্বব্যাংক জুলাইয়ে ভিয়েতনামকে ‘উচ্চ-মধ্যম আয়ের’ দেশের মর্যাদা দেওয়াকে দেশটির প্রায় ৪০ বছরের ‘দই মোই’ বা অর্থনৈতিক সংস্কারের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান তো লাম মনে করেন, শুধু পুরোনো পদ্ধতিতে এগিয়ে গেলে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যাবে না।
ভিয়েতনামের শ্রমিকদের মজুরি দ্রুত বাড়ছে। ফলে পোশাক, ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য উৎপাদন খাতে লাভের ব্যবধানও সংকুচিত হচ্ছে। তাই শ্রমনির্ভর শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশটি সেমিকন্ডাক্টরসহ উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য তৈরিতে যেতে চাইছে।

কিন্তু সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। একটি চিপ কারখানায় সামান্য সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাটও উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। ভিয়েতনাম সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ ঘাটতি ও ব্ল্যাকআউটের সমস্যা অনেকটা কাটিয়ে উঠলেও নতুন শিল্পায়নের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা আরও দ্রুত বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভিয়েতনাম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উৎস করতে চেয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ১০ শতাংশ এলএনজিভিত্তিক করার লক্ষ্য রয়েছে। আমদানি করা গ্যাস থেকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ পাওয়া যায় এবং বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পাঞ্চলের জন্য এটি বিশেষভাবে উপযোগী।
কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে উঠছে। দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ভিনগ্রুপ চলতি বছরের মার্চে ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাতিল করেছে। উচ্চ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করেই প্রকল্পটি থেকে সরে যায় প্রতিষ্ঠানটি।
দেশজুড়ে নতুন এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনেক প্রকল্পও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। যেসব প্রকল্প এগোচ্ছে, তার বড় অংশের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জড়িত। রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা ভিয়েতনাম ইলেকট্রিসিটি বা ইভিএনও এ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজির অংশ মাত্র প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ।
এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপও রয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে এশিয়ায় আসা এলএনজির বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষের তুলনায় আমদানি করা এলএনজির দাম ১৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে ভিয়েতনামের জন্য ব্যাপক পরিমাণে এলএনজি আমদানি করা এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিআরজির পরিচালক ফিলিপ সলোমনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান দামে ২০৩০ সালের পরিকল্পনা অনুযায়ী এলএনজি আমদানি করতে গেলে ভিয়েতনামকে বছরে প্রায় ১২ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হতে পারে। এই অর্থ দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ১৪ থেকে ১৮ শতাংশের সমান। অবশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ভবিষ্যতে কমে এলে এই চাপ কিছুটা কমতে পারে।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দামই ভিয়েতনামের সমস্যার মূল কারণ নয়। দেশটির বিদ্যুৎ খাতের অভ্যন্তরীণ কাঠামোও বড় বাধা তৈরি করছে।
ভিয়েতনামে বিদ্যুতের দাম দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপকভাবে ভর্তুকিনির্ভর। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে বলা হয়। এর ফলে সরকার তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ মূল্য ধরে রাখতে পারে এবং ভোক্তাদের ওপর বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির চাপ পড়ে না।
কিন্তু এলএনজির ক্ষেত্রে এই মডেল কার্যকর করা কঠিন। এলএনজিভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল মূলধন, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা প্রয়োজন। ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এককভাবে এত বড় বিনিয়োগ করা কঠিন। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর করতে হবে।
সমস্যা হলো, বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা সাধারণত সরকারের নির্ধারিত কম দামের চেয়ে বেশি হারে বিদ্যুৎ বিক্রির নিশ্চয়তা চাইবে। ফলে ভিয়েতনামকে এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে—এলএনজি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে ভর্তুকির ব্যয় বাড়বে, আর এলএনজি আমদানি থেকে সরে গেলে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
ভিয়েতনাম এর আগেও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৭ সালে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সরকার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে আকর্ষণীয় ‘ফিড-ইন ট্যারিফ’ চালু করেছিল। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট হারে বিদ্যুৎ কেনার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল।
এই নীতির ফলে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসে। কিন্তু পরে সরকার মনে করে, এই হারে বিদ্যুৎ কেনা দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল। ২০২৫ সালে ইভিএন সেই সুবিধার শর্ত পরিবর্তন করে এবং আগের বিনিয়োগের ওপরও তার প্রভাব পড়ে। এতে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রত্যাশিত আয় কমে যায়।
এর ফলে বিদেশি বিদ্যুৎ উন্নয়নকারীদের একটি অংশ ভিয়েতনামের জ্বালানি খাতে নতুন বিনিয়োগের আগে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এখন শুধু বিদ্যুতের চাহিদা বা সম্ভাব্য বাজার নয়, সরকারের মূল্যনীতি, চুক্তির স্থায়িত্ব এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভিয়েতনামের সামনে তাই সমস্যাটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর নয়। দেশটিকে এমন একটি বিদ্যুৎ বাজার তৈরি করতে হবে, যেখানে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বিদ্যুতের দাম সহনীয় থাকবে, আবার বড় শিল্প ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক নিশ্চয়তাও থাকবে।
উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদন বাড়াতে হলে ভিয়েতনামের প্রয়োজন হবে সস্তা নয়, বরং নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহ। সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টার ও উন্নত ইলেকট্রনিকসের মতো শিল্পে বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা থাকলে বিদেশি কোম্পানিগুলো অন্য দেশ বেছে নিতে পারে।
অর্থাৎ ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ অনেকটাই নির্ভর করছে দেশটি তার বিদ্যুৎ খাতের পুরোনো ভর্তুকিনির্ভর কাঠামো কতটা সফলভাবে সংস্কার করতে পারে তার ওপর। শিল্পকে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তির দিকে নেওয়ার পরিকল্পনা যতই উচ্চাভিলাষী হোক, তার ভিত্তিতে যদি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ না থাকে, তাহলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।












