কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের ঢল নামার মধ্যেই ক্রিপ্টোকারেন্সি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের ঝুঁকি। ক্রিপ্টোকার্ডের দ্রুত বিস্তার এখন শুধু ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনের বিষয় নয়; একই সঙ্গে এটি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে অর্থ লেনদেন, পরিচয় গোপন করা এবং কিছু ক্ষেত্রে বিদেশি এআই সেবায় প্রবেশের পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ক্রিপ্টো-ভিত্তিক নতুন উদ্যোগগুলো প্রায় ৭৫০টি চুক্তির মাধ্যমে ১০ বিলিয়ন ডলার ভেঞ্চার মূলধন পেয়েছে। একই সময়ে ক্রিপ্টোকার্ডের ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। এসব কার্ড ক্রিপ্টো ওয়ালেটকে প্রচলিত দোকানের কার্ড পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে। ফলে ক্রিপ্টো সম্পদকে সাধারণ মুদ্রায় রূপান্তর করে ভিসা ও মাস্টারকার্ডের টার্মিনালে অর্থ পরিশোধ করা যায়।
বিশেষ করে দুর্বল মুদ্রার দেশগুলোতে ডলারের সঙ্গে মূল্য স্থির রাখা স্টেবলকয়েন এ ধরনের কার্ডের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণগত দুর্বলতা। অনেক কার্ড প্রদানকারী গ্রাহকের পরিচয় যাচাই বা ‘আপনার গ্রাহককে জানুন’ বা কেওয়াইসি প্রক্রিয়া যথেষ্ট কঠোরভাবে অনুসরণ করছে না। ফলে অপরাধী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তি এবং পরিচয় গোপন করতে চাওয়া ব্যবহারকারীদের জন্য এসব কার্ড আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
স্টেবলকয়েনের বাজারও দ্রুত বড় হচ্ছে। গত দুই বছরে এসব ডিজিটাল মুদ্রার মোট বাজারমূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। আগস্টে স্টেবলকয়েন-ভিত্তিক কার্ডে ১.১ বিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন হয়েছে, যা এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। প্রকৃত লেনদেনের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক কার্ড প্রদানকারী তাদের লেনদেনের পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে না।
ক্রিপ্টোকার্ডের বিস্তারে নিয়ন্ত্রকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও হংকং গত কয়েক বছরে ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার জন্য তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার নিয়ম তৈরি করেছে। এতে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বিশেষ করে স্টেবলকয়েন মূলধারার আর্থিক ব্যবস্থায় কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
একই সময়ে ভিসা ও মাস্টারকার্ডও লাইসেন্সধারী নতুন কার্ড প্রদানকারীদের নিজেদের পেমেন্ট নেটওয়ার্কে যুক্ত করার সুযোগ বাড়িয়েছে। রেইন, রিয়াপ ও ওয়্যারএক্সের মতো প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জানুয়ারিতে রেইন ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ সংগ্রহ করে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে শনাক্ত করা ক্রিপ্টোকার্ড প্রদানকারীর সংখ্যা প্রায় ১০০ থেকে বেড়ে ২৫০ হয়েছে।
সমস্যার বড় জায়গা হলো গ্রাহক যাচাই। একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ ক্রিপ্টোকার্ড প্রদানকারীর কেওয়াইসি ব্যবস্থা দুর্বল অথবা কার্যত নেই। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আবার দুর্বল পরিচয় যাচাইকেই তাদের ব্যবসার আকর্ষণ হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে কার্ডের প্রকৃত ব্যবহারকারী কে, তিনি কোথায় অবস্থান করছেন এবং কার অর্থ ব্যবহার করছেন—এসব তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাশিয়া ও ইরানের মতো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশের ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করেও বিভিন্ন ভাষার ওয়েবসাইটে ক্রিপ্টোকার্ডের প্রচার দেখা যাচ্ছে। এসব কার্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সেবা, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য অনলাইন পরিষেবায় অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার দাবি করা হচ্ছে।
একটি পরীক্ষায় এমন একটি কার্ডের আবেদন করা হয়, যেখানে কোনো নথি বা দীর্ঘ পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন নেই বলে প্রচার করা হয়েছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেটি অ্যাপল পে ওয়ালেটের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়। কার্ডটির মাসিক লেনদেনসীমা ছিল ৫ লাখ ডলার। এমন ব্যবস্থা অর্থ পাচার বা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
এই সমস্যার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে এআই। বিশেষ করে চীনে মার্কিন এআই মডেল ব্যবহারের জন্য ক্রিপ্টোকার্ডের ব্যবহার বাড়ছে বলে বিভিন্ন অনলাইন নির্দেশনায় দেখা যাচ্ছে।
চীনে বিদেশি এআই সেবার ব্যবহারে নানা ধরনের বিধিনিষেধ থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অসংখ্য নির্দেশনা ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে কীভাবে এসব সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো সেবা ব্যবহার করা যায় তা দেখানো হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এআই টোকেন কিনছেন। আবার কেউ কেউ বিদেশি পরিচয় বা অবস্থান দেখিয়ে সরাসরি এআই সেবার সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
একটি চীনা ভাষার নির্দেশনায় দুবাইভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাস্টারকার্ড নেওয়ার পদ্ধতি দেখানো হয়েছে। সেখানে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অন্য দেশে অবস্থান দেখানো এবং গুগল ম্যাপে সেই দেশের একটি ঠিকানা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কেওয়াইসি করার দাবি করে, নির্দেশনার ভিডিওতে বলা হয়েছে যে ঠিকানাটি বাস্তব কি না তা যথেষ্টভাবে যাচাই করা হয় না।
এ ধরনের ব্যবস্থার অপব্যবহারের উদাহরণও পাওয়া গেছে। একটি মার্কিন ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানের সূত্রের দাবি, প্রতি মাসে শত শত ব্যবহারকারী চীনা পরিচয়পত্র দিয়ে কিন্তু চীনের বাইরে কোনো ঠিকানা ব্যবহার করে কার্ডের জন্য আবেদন করছেন। একটি ঘটনায় চীনের শেনঝেন শহর থেকে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহারকারী একজন ব্যক্তি চীনা পরিচয়পত্র দিয়ে বিদেশি ঠিকানা দেখিয়ে কার্ড নেন এবং বলিভিয়ার অ্যাপল অ্যাপ স্টোরের মাধ্যমে চ্যাটজিপিটির সাবস্ক্রিপশনে প্রায় ৫০ হাজার ডলার ব্যয় করেন।
রেইনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদেশে বসবাসকারী চীনা নাগরিকদের বৈধ প্রয়োজন থাকতে পারে বলে চীনা পরিচয়পত্র গ্রহণ করা হয়। তবে চীনা ঠিকানা দিয়ে আবেদন করা হলে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা তারা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি মেনে চলে।
তবে কিছু কার্ড প্রদানকারীর দুর্বল যাচাইয়ের কারণে একই ব্যক্তি বারবার আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীনা ঠিকানা দিয়ে আবেদন ব্যর্থ হলে অন্য ঠিকানা ব্যবহার করে আবার চেষ্টা করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ক্রিপ্টোকার্ডের মাধ্যমে এআই অর্থনীতিতে কত টাকা ঢুকছে, তার সঠিক হিসাব নেই। তবে একটি হংকংভিত্তিক ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানের কার্ড-সংযুক্ত ওয়ালেটে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে ৩৫৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি স্টেবলকয়েন প্রবাহিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪ হাজার লেনদেন প্রক্রিয়া করেছে। পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এসব অর্থের একটি অংশ এআই টোকেনের বড় পরিমাণের কেনাকাটায় ব্যবহার হচ্ছে।
এ নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে এআই মডেল তৈরিতে প্রতিযোগিতার কারণে। গত ১০ সেপ্টেম্বর মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক অভিযোগ করে, চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলিবাবা মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ১৫ কোটি ১০ লাখ বার ক্লড মডেলে প্রবেশাধিকার নিয়ে নিজেদের এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করেছে। অ্যানথ্রপিকের অভিযোগ, এই কাজে প্রায় ৫ হাজার ক্লড অ্যাকাউন্টের একটি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এর কিছু অ্যাকাউন্টের অর্থ পরিশোধে ভার্চুয়াল কার্ড ব্যবহার করা হয়, যাতে প্রকৃত ব্যবহারকারীদের আড়াল করা যায়।
আলিবাবা এ অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ক্রিপ্টোকার্ডের বিস্তার একদিকে যেমন সীমিত ব্যাংকিং সুবিধার মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করছে, অন্যদিকে দুর্বল পরিচয় যাচাইয়ের কারণে এটি অবৈধ অর্থপ্রবাহের নতুন মাধ্যমও হয়ে উঠতে পারে। অর্থনীতিবিদ এসওয়ার প্রসাদের মতে, স্টেবলকয়েন বিভিন্ন দেশের ভেতরে এবং দেশের সীমানা পেরিয়ে অবৈধ অর্থ লেনদেনের অতিরিক্ত পথ তৈরি করতে পারে।
ক্রিপ্টো বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের হিসাবে, গত বছর অবৈধ ক্রিপ্টো লেনদেনের প্রবাহ ১৫৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—ডিজিটাল মুদ্রা ও ক্রিপ্টোকার্ডকে বৈধ আর্থিক উদ্ভাবন হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এর অপব্যবহার ঠেকানো। বিশেষ করে এআই মডেল, অনলাইন সেবা এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে ক্রিপ্টোকার্ডের সংযোগ যত বাড়বে, পরিচয় যাচাই ও অর্থের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা তত শক্তিশালী করা প্রয়োজন হবে।
কারণ এআই ও ক্রিপ্টো—দুটি প্রযুক্তির উদ্দেশ্য ও কাঠামো আলাদা হলেও, অর্থের সহজ প্রবাহ এবং সীমান্ত পেরিয়ে ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের সংযোগ এখন একটি নতুন ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি করছে।












