ভিয়েতনামের অর্থনীতি চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। চার বছরের মধ্যে এটি দেশটির সবচেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ। শিল্প ও নির্মাণ খাতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের সংশোধিত ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে জুলাই-সেপ্টেম্বরে অর্থনীতির গতি আরও বেড়েছে।
দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের (এনএসও) তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম নয় মাসে ভিয়েতনামের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বেড়েছে ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। ফলে সরকার নির্ধারিত পুরো বছরের ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বছরের শেষ প্রান্তিকে অর্থনীতিকে অন্তত ১২ শতাংশের বেশি হারে বাড়তে হবে।
এনএসওর ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস সিস্টেম বিভাগের পরিচালক নগুয়েন থি মাই হান বলেন, পুরো বছরের ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করতে চতুর্থ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ দশমিক ৫ শতাংশে নিতে হবে। তার ভাষায়, এটি অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং একটি লক্ষ্য।
বিশ্ব বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন, জ্বালানি ও উৎপাদন উপকরণের বাড়তি ব্যয় এবং সরকারি বিনিয়োগ দ্রুত বাস্তবায়নের চাপ—এসব বিষয়কে সামনে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এসএসআই সিকিউরিটিজের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা বিভাগের প্রধান ফাম লু হুংও মনে করেন, ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হলেও তা সহজ হবে না। তার মতে, চতুর্থ প্রান্তিকে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছাতে হবে। তৃতীয় প্রান্তিকে এসএসআই সিকিউরিটিজ ৮ দশমিক ৭ থেকে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। বাস্তবে প্রবৃদ্ধি সেই পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে।
ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এখন শিল্প ও নির্মাণ খাত। উৎপাদন কার্যক্রম বাড়ার পাশাপাশি অবকাঠামো ও অন্যান্য নির্মাণকাজে গতি অর্থনীতির সামগ্রিক সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে। তবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বাণিজ্য ভারসাম্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন চাপও তৈরি হয়েছে।
তৃতীয় প্রান্তিকে ভিয়েতনামের রপ্তানি বছরওয়ারি ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১৬৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একই সময়ে আমদানি আরও দ্রুত, ৪২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ১৭০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি হয়েছে।
প্রথম নয় মাস মিলিয়ে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে ভিয়েতনামের রপ্তানি হয়েছে প্রায় ১৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অন্যদিকে আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল চীন, যেখান থেকে নয় মাসে ভিয়েতনাম প্রায় ১৮৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
তবে সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। মাসটিতে ভিয়েতনাম ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত করেছে। চলতি বছরের মধ্যে এটিই দেশটির প্রথম মাসিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত।
অন্যদিকে অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ছে। সেপ্টেম্বরে ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়েছে। গত চার মাসের মধ্যে এটি ছিল সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি।
চলতি বছরের মে মাসে ভিয়েতনামের মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে উঠেছিল, যা ২০২০ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং গরম আবহাওয়ার ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতিতে চাপ তৈরি হয়েছিল।
জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভিয়েতনামে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত পুরো বছরের সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সীমায় ইতোমধ্যেই পৌঁছে গেছে দেশটি। বছরের শেষ প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা তাই সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ ভিয়েতনামের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক তৈরি করছে। জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটিতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের প্রবাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ শতাংশ বেড়ে ২১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে নয় মাসের হিসাবে এটি সর্বোচ্চ এফডিআই প্রবাহ।
সব মিলিয়ে ভিয়েতনামের অর্থনীতি বর্তমানে শক্তিশালী গতিতে এগোলেও বছরের শেষ প্রান্তিকে সেই গতি আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সহজ হবে না। রপ্তানি ও শিল্প উৎপাদনের শক্তিশালী অবস্থান, বিদেশি বিনিয়োগের বৃদ্ধি এবং নির্মাণ খাতের সম্প্রসারণ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। বিপরীতে বাণিজ্য ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার অনিশ্চয়তা ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে কঠিন করে তুলছে।












